kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

শামুক

দিনে ৫ লাখ নিধন

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দিনে ৫ লাখ নিধন

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ফলতিতা বটতলায় বিভিন্ন স্থান থেকে শামুক এনে জড়ো করা হয়েছে। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, শামুক ধরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় দিনে গড়ে পাঁচ লাখ শামুক ধরা হয়। কেউ শাস্তি পায় না। এ নিয়ে দুই পর্বের প্রথম পর্ব আজ। লিখেছেন কপিল ঘোষ

শামুক নিধনযজ্ঞ ফের শুরু হয়েছে। শিশুরাও যুক্ত হচ্ছে এ কাজে। এই শামুক নিধন প্রতিরোধ করা না গেলে পরিবেশ বিপর্যয় হতে পারে।

কালের কণ্ঠে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর শামুক নিধনের খবর প্রকাশের পর কিছুদিন এ কাজ বন্ধ ছিল। স্থানীয় শামুক আড়তদাররা তাঁদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এ বছর তা চলছে জোরেশোরে। পাশের ফকিরহাট উপজেলার ফলতিতা বটতলা থেকে ব্যবসায়ীরা শামুক সরবরাহ করেন বলে ঘের মালিকরা জানান। আর বটতলায় ট্রাকভর্তি শামুক আসে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল থেকে।

বিল অঞ্চল থেকে শামুক সংগ্রহ, ঘের মালিকদের কাছে পৌঁছানো, শামুক ভাঙা, শামুকের শক্ত খোসা সংগ্রহ করা, খোসা পুড়িয়ে পান খাওয়ার চুন তৈরির কাজে নিয়োজিত রয়েছে হাজার হাজার মানুষ।

রায়গ্রামের ঘের মালিক তাপস বাড়ৈ জানান, প্রতিদিন তাঁদের ঘেরে চার-পাঁচ বস্তা শামুক লাগে। ৫০ কেজি ওজনের প্রতিটি বস্তায় প্রায় এক হাজার শামুক থাকে। প্রতি বস্তা শামুক ৫০০ টাকা দরে তাঁরা কেনেন। ঘেরে শামুক দিলে পানি যেমন পরিষ্কার থাকে, তেমনি মাছের ওজন বাড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী বাবলু মণ্ডল বলেন, প্রকৃতির ক্ষতির কথা বিবেচনা না করে, ব্যক্তিস্বার্থে এলাকার মৎস্য ঘের মালিকরা প্রতিদিন লাখ লাখ শামুক মেরে মাছের খাবারে রূপান্তরিত করছেন। এরই মধ্যে চিতলমারী এলাকায় শামুক বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। রায়গ্রামের চিত্ত মৃধার স্ত্রী শামুক ভাঙা শ্রমিক কদম মৃধা (৭০) বলেন, ‘চিতলমারী ঘেরের সঙ্গে নদীর কোনো যোগাযোগ নেই। বছরের পর বছর বদ্ধ জল বিষাক্ত। প্রায় ১০ বছর এখানে শামুক জন্মায় না।’

চিতলমারীর শ্যামপাড়া গ্রামের গাউস ফকিরের স্ত্রী রেক্সোনা জানান, তাঁর স্বামী ভ্যান চালান। দুই সন্তানসহ পরিবারে চারজন। সংসার চলে না। তাই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে শামুক ভাঙতে হয়। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শামুক ভাঙেন। মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, ছেলের বয়স ছয়। যেদিন ১২টার আগে দুই বস্তা শামুক ভাঙা হয়ে যায়, সেদিন মেয়ে স্কুলে যায়। ৫০ কেজির প্রতি বস্তা শামুক ভেঙে মজুরি পান ৬০ টাকা। মা-মেয়ে দিনে দুই বস্তা শামুক ভাঙতে পারেন।

চিতলমারীর জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, এ উপজেলায় সাড়ে ১৮ হাজার মাছের ঘের আছে। প্রায় ১০ ভাগ ঘেরে শামুক ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ একটি ঘেরে কমপক্ষে ৩০০ শামুক (ছোট এক বস্তা) হিসাবে প্রতিদিন পাঁচ লক্ষাধিক শামুক নিধন হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, শামুকের খোলস ভেঙে তার ভেতরের নরম অংশ মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা নিষেধ। কারণ শামুককে প্রাকৃতিক ছাঁকনি বলা হয়। সে জলজ ময়লা ছেঁকে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চিতলমারী শেরে বাংলা ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেখ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, গাছের পাতাসহ পানি-মাটির আবর্জনা খেয়ে একধরনের নিঃসরণ ছাড়ে শামুক। যা পানি পরিশোধন করে ঠাণ্ডা রাখে এবং মাটির শক্তি বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া কচুসহ জলজ উদ্ভিদের পরাগায়ণ, পানিদূষণ রোধ, মাটির পরিশোধন, জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে শামুকের অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে চার প্রকার শামুক দেখা যায়। যার মধ্যে আপেল শামুক সবচেয়ে বেশি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঋতুরাজ সরকার বলেন, শামুক প্রতিনিয়ত মাটি কামড়ে চলার ফলে মাটিতে অক্সিজেন চলাচল সহজ হয়। এতে ফসল ভালো হয়। জলজ কৃষিক্ষেতের পোকামাকড়ের ডিম ও ছোট বাচ্চা খেয়ে উপকার করে। তাই শামুককে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

বাগেরহাট সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তা চিন্ময় মধু বলেন, ২০১২ সালের ১০ জুলাই সরকারি প্রজ্ঞাপনে শামুককে বন্য প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বন্য প্রাণী বিনষ্ট ও ধ্বংসের অপরাধে জড়িত ব্যক্তির এক বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফুল আলম বলেন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২ অনুযায়ী হরিণ, কচ্ছপ ও শামুক মারা বা হত্যা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের এ বিষয়টি সবাইকে জানানোর ব্যবস্থা করব। এর পরও কেউ শামুক নিধনে জড়িত হলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।

(কাল পড়ুন, বায়ু দূষণ, ত্বকে ক্ষত)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা