kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

দুর্নীতিতে ভোগাচ্ছেন কর্তা বদলির আদেশও উপেক্ষা

ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ

টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুর্নীতিতে ভোগাচ্ছেন কর্তা বদলির আদেশও উপেক্ষা

নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় তাত্ক্ষণিক বদলি করা হয়েছে উপজেলা সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এস এম হুমায়ুন কবীরকে। গত বুধবার তাঁর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের কথা ছিল। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত সেখানে যোগদান করেননি তিনি। এদিকে টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি।

জানা গেছে, উপজেলা সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এস এম হুমায়ুন কবীর প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার পাশাপাশি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। গভীর নলকূপ কেনা, আপ্যায়ন খরচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামত খরচের ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎসহ কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার কুশলী, গোপালপুর, ডুমুরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নলকূপ স্থাপনের জন্য তিন লাখ তিন হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে শুধু কুশলী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নলকূপ স্থাপন করে বাকি দুটির টাকা আত্মসাৎ করেন হুমায়ুন কবীর।

এ ঘটনায় ডুমুরিয়া ও গোপালপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সরেজমিনে গেলে কোনো টিউবওয়েল দেখা যায়নি। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের কেন্দ্রে কোনো টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়নি।

তবে টিউবওয়েল বরাদ্দের ব্যাপারে জানেন কি না তা জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, তিনটি টিউবওয়েল বরাদ্দের কথা তাঁরা শুনেছিলেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, শুধু কুশলী পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে একটি টিউবওয়েল দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, হুমায়ুন কবীর ২০১৭ সালের নভেম্বরে টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকে তিনি নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় নৌকায় করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য পরিবার কল্যাণ সহকারীদের নৌকা ভাড়া বাবদ ৯৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি কর্মীদের টাকা না দিয়ে পুরোটাই আত্মসাৎ করেছেন।

সূত্রে আরো জানা গেছে, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা (এফডাব্লিউভি) ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারদের (এসএসিএমও) বরাদ্দের পণ্যের ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বাবদ ৪০ হাজার টাকা না দিয়ে পুরোটাই নিজের পকেটে পুরেছেন উপজেলা সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। এ ছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাঁদের জন্য বিপি স্টেথোস্কোপ বাবদ ১০ হাজার টাকা বিল করা হয়। কিন্তু বরাদ্দের বিপি স্টেথোস্কোপ তাঁরা কেউ পাননি। হুমায়ুন কবীর কোথাও পরিদর্শন করতে না গিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এক লাখ ৭৫ হাজার ৩৯০ টাকা ভ্রমণ ভাতা উত্তোলন করেছেন। একই অর্থবছরে নিজের কক্ষের ফার্নিচার বাবদ ৬৫ হাজার টাকা বিল করা হলেও কোনো ফার্নিচার কেনেননি। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প করার সময় ডাক্তারি সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার জন্য একটি গ্যাস সিলিন্ডার ও একটি গ্যাসের চুলা দেওয়া হলেও তা তিনি নিজের বাসায় ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ইউনিয়ন কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসাররা অভিযোগ করে বলেন, গত ২৬ আগস্ট প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য ৪০০টি করে গ্যাসের ওষুধ প্যান্টোপ্রাজল বরাদ্দ হলেও তিনি দিয়েছেন ২০০টি করে। এভাবেই উপজেলা সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর ওষুধ কম সরবরাহ করেছেন।

সম্প্রতি আপ্যায়ন বাবদ ৩০ হাজার, মনিহারি বাবদ ৪০ হাজার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামত বাবদ ২৫ হাজার টাকা বিল করে সেই টাকা নিজের পকেটে পুরেছেন হুমায়ুন কবীর।

এসব অনিয়মের অভিযোগে গত ৫ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর হুমায়ুন কবীরকে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় তাত্ক্ষণিকভাবে বদলি করে। অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তাঁকে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। তা না করলে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে তাত্ক্ষণিক অব্যাহতি বলে গণ্য হবেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হুমায়ুন কবীর তাঁর নতুন কর্মস্থলে ১১ সেপ্টেম্বর উপস্থিত হননি। এ ছাড়া টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় নতুন কর্মকর্তাকেও তাঁর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি।

এ ব্যাপারে জানতে অভিযুক্ত সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। গোপালগঞ্জ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মাজাহুরুল হক চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা