kalerkantho

ভাঙ্গুড়া

কাজ আংশিক, বিল পুরো

ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঝি-কলকতি গ্রামে টিআর প্রকল্পের একটি রাস্তা সংস্কারের আংশিক কাজ করে বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন খান ও সংরক্ষিত নারী সদস্য আমেনা খাতুন উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে এই অর্থ উত্তোলন করেন। এলাকাবাসী রাস্তা সংস্কারকাজ শেষ করার জন্য চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে বারবার তাগিদ দিলেও তাঁরা কর্ণপাত করছেন না। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে টিআর প্রকল্পের আওতায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ে উপজেলার ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের ঝি-কলকতি গ্রামের আবুল হোসেনের বাড়ি থেকে আছাব প্রফেসরের বাড়ি পর্যন্ত ৪০০ মিটার কাঁচা সড়ক সংস্কারের অনুমোদন দেয় উপজেলা প্রশাসন। তৎকালীন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ এই প্রকল্পের দেখভাল করেন। প্রকল্পের পিআইসির দায়িত্ব দেওয়া হয় ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য আমেনা খাতুনকে। তবে কাজটি মূলত ইউপি চেয়ারম্যান নিজেই দেখাশোনা করেন।

২০১৮ সালের মে মাসে কাজ শুরু হয়। সে সময় মাটি সংকটের কারণ দেখিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ১০০ মিটার সড়ক সংস্কার করে কাজ বন্ধ করে দেন।

অভিযোগ আছে, সে সময় সড়ক সংস্কারের কথা বলে জোর করে সড়কসংলগ্ন বাসিন্দাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা হাতিয়ে নেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এরপর কাজ বন্ধ রাখলে স্থানীয় বাসিন্দারা চেয়ারম্যানকে কাজ শেষ করার তাগিদ দেয়। তখন চেয়ারম্যান মাটির প্রাপ্যতা সাপেক্ষে পরে সংস্কারকাজ করার আশ্বাস দেন স্থানীয়দের। তবে কাজ শেষ না করেও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বরাদ্দের দুই লাখ টাকা তুলে নেন চেয়ারম্যান ও মেম্বার। কিন্তু এরপর ১৪ মাস পার হয়ে গেলেও আর মাটি ফেলেননি ওই চেয়ারম্যান ও মেম্বার। গত মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝি-কলকতি গ্রামের প্রধান পাকা সড়কের পাশের আবুল হোসেনের বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ মিটার কাঁচা সড়ক মাটি ফেলে সংস্কার করা হয়েছে। প্রকল্পের অবশিষ্ট ৩০০ মিটার সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। এতে সামান্য বৃষ্টি হলেই ওই কাঁচা সড়কে কাদায় একাকার হয়ে যায়। এতে লোকজন চলাচলে চরম ভোগান্তির শিকার হয়। এ ছাড়া মাটি না ফেলায় ওই ৩০০ মিটার সড়ক গত তিন মাস বন্যার পানিতে তলিয়ে ছিল।

এলাকাবাসী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আংশিক কাজ করেই পুরো টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। তা ছাড়া যেটুকু কাজ করেছেন তার জন্যও এলাকাবাসীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। এক বছর ধরে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে অসংখ্যবার রাস্তাটি সংস্কার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা কাউকেই তোয়াক্কা করছেন না। ঝি-কলকতি গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘আমরা আর সড়ক সংস্কারের কথা বলতে চাই না। কারণ সংস্কারকাজ শুরু হলেই চেয়ারম্যানের লোকজন আবার আমাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলবে। গত বছর সংস্কারের সময় চেয়ারম্যানের লোকজন আমার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। টাকা না দিতে চাইলে আমার বাড়ি থেকে মাটি কেটে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল তারা। এতে বাধ্য হয়েই আমি তাদের টাকা দিই।’

একই গ্রামের বাসিন্দা ও ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কটি সংস্কার না করেই প্রভাব খাটিয়ে অর্থ উত্তোলন করে নিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান ও নারী মেম্বার। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে। কিন্তু কাজ না করে উল্টো চেয়ারম্যানই গ্রামবাসীকে ভয় দেখান।’

কাজ না করে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য ও প্রকল্পের পিআইসি আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমি শুধু নামমাত্র পিআইসি ছিলাম। সব কাজই করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান। আমার কাছ থেকে শুধু স্বাক্ষর করে নিয়েছেন চেয়ারম্যান। আমরা মেম্বাররা ইউনিয়ন পরিষদের পুতুলের মতো। আমাদের নিজস্ব কোনো মতামত সেখানে নেই।’

অভিযোগের ব্যাপারে ভাঙ্গুড়া ইউপি চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন খান বলেন, ‘গত বছরের একটি টিআর প্রকল্পের রাস্তা সংস্কারের অসম্পূর্ণ কাজের বিষয়টা আমার মনে আছে। আগামীতে যেকোনো সময় ২০ জন শ্রমিক নিয়ে রাস্তায় মাটি ফেলে দেব।’ রাস্তা সংস্কারে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এ ব্যাপারে ভাঙ্গুড়া উপজেলার বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শামীম আহমেদ বলেন, ‘টিআর প্রকল্পের একটি রাস্তা সংস্কারকাজ না করে বিল তুলে নেওয়ার বিষয়টি শুনেছি। দেখি অন্য কোনো প্রকল্প দিয়ে কাজটি করে দেওয়া যায় কি না।’ ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘আমি চার মাস হলো এই উপজেলায় যোগ দিয়েছি। অথচ এ ঘটনা গত বছরের। তার পরও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

মন্তব্য