kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঝালকাঠি বিআরটিএ

ঘুষ ছাড়া মেলে না লাইসেন্স

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঘুষ ছাড়া মেলে না লাইসেন্স

মো. আইয়ুব আনছারী

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ঝালকাঠি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘুষ নিয়ে মোটরযান নিবন্ধন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ উঠছে নিয়মিতই। দালালের মাধ্যমে ঘুষ নিয়ে ঝালকাঠি জেলার বাইরের লোকজনকেও গাড়ির লাইসেন্স দিচ্ছেন তিনি। সরকার নির্ধারিত ফির দ্বিগুণ টাকা না দিলে লাইসেন্স দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জনকে ঝালকাঠি বিআরটিএ কার্যালয় থেকে লাইসেন্স প্রদানের জন্য আঙুলের ছাপ নেওয়ার সময় আটক করে পুলিশ। এ সময় দুই দালালকে সাজা দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আটক ১১ জনকে জরিমানা করা হয়।

জানা যায়, বিআরটিএ ঝালকাঠির সহকারী পরিচালক মো. আইয়ুব আনছারী ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে চাকরি করতেন। ওই সময় তাঁর কার্যালয়ে মোটরযান নিবন্ধন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য দালাল নিয়োগ করেন সাতকানিয়া উপজেলার বারকোনা গ্রামের আবদুল হককে। আবদুল হকের মাধ্যমে তিনি ঘুষ নিয়ে লাইসেন্স দিতেন। ঘুষের টাকা দিয়ে তিনি অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন। ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলাও করে। ওই মামলায় বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরে তিনি চাকরি ফিরে পেলে তাঁকে ভোলায় বদলি করা হয়। সেখানেও দালাল আবদুল হকের মাধ্যমে ঘুষ নেন তিনি। চার মাস আগে তাঁকে ঝালকাঠিতে বদলি করা হয়। ঝালকাঠিতে যোগদানের পর এখানেও গড়ে তোলেন দালাল সিন্ডিকেট। সরকার নির্ধারিত ফি তিন হাজার ৬০ টাকা থাকলেও দালালের মাধ্যমে লাইসেন্সপ্রতি ছয় থেকে আট হাজার টাকা নেন তিনি। ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স করলে তাকে মোটরযান চালানোর পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় না। শুধু টাকা দিয়ে আঙুলের ছাপ দিলেই পাওয়া যায় লাইনেন্স। ঘুষের টাকা না দিলে কাউকে লাইসেন্স দেওয়া হয় না। তিনি ঝালকাঠিতে আসার পর বরিশালের কাউনিয়া এলাকার হৃদয় মৃধা নামে একজনকে দালাল হিসেবে নিয়োগ করেন। তিনি ফরম পূরণ করে দেন, এ জন্য তাঁকে ৫০ টাকা এবং প্রতিদিন ৫০০ টাকা খরচ দেন ওই কর্মকর্তা। এমনকি বরিশাল থেকে ওই কর্মকর্তার গাড়িতে করে ঝালকাঠি আসা-যাওয়া করেন দালাল হৃদয়। ঝালকাঠি বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আইয়ুব আনছারীর গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ডেবরা গ্রামে। তিনি বর্তমানে বরিশালে বসবাস করছেন।

শহরের ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘আমি বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে লাইসেন্স করার নিয়ম জানতে যাই। আমাকে নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে, সারা জীবনেও লাইসেন্স পাওয়া যাবে না বলে জানান দালাল হৃদয়।’

এদিকে চট্টগ্রামে চাকরি করার সময় ঝালকাঠি বিআরটিএ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আইয়ুব আনছারীর গড়ে তোলা দালাল সিন্ডিকেটের মধ্যে অন্যতম আবদুল হক এখনো সক্রিয়। আবদুল হকের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের লোকজনেরও মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করেন। এ জন্য তিনি জনপ্রতি আট হাজার টাকা নেন। গত আগস্টেও আবদুল হক চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার ১১ জন যুবককে লাইসেন্স করানোর জন্য ঝালকাঠি নিয়ে আসেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের তিন তলায় ওই ১১ জনকে সন্দেজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে এনডিসি মো. বশির গাজী তাদের ডেকে কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে তারা আবদুল হকের মাধ্যমে লাইসেন্স করার জন্য এখানে এসেছে বলে স্বীকার করে। তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা হয়। সব শেষ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরিশালের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল গত ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঝালকাঠি বিআরটিএ কার্যালয়ে অভিযান চালায়। এ সময় বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. আইয়ুব আনছারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আইয়ুব আনছারী বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তার সবই ভিত্তিহীন। আমি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। অনেক সময় অফিসের দালাল তাড়াতে গিয়ে, নিজেই তাদের তাড়া খাচ্ছি। অফিসের লোকজনের সঙ্গে দালালদের একটা সম্পর্ক থাকে, এটা ভাঙতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছি। আমার অফিস থেকে লাইসেন্স পেতে হলে ব্যক্তিকে অবশ্যই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। আমি এখানে আসার আগে কী হয়েছে সেগুলো বলতে পারব না।’ দুদকের অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে দুদকের একটি দল আমার অফিসে আসে। তারা আমাকে অনেক প্রশ্ন করেছে, আমি জবাব দিয়েছি। তারা এখানে যা দেখে গেছে, সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দেবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা