kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অবৈধ ঘাট বানিয়ে নদ দখল

অভয়নগরের ভৈরব

মাসুদ তাজ, অভয়নগর (যশোর)   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অবৈধ ঘাট বানিয়ে নদ দখল

যশোরের অভয়নগর উপজেলায় ভৈরব নদ দখল করে অ্যাগ্রো মিল কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম চর বানিয়েছে। নদের আগের অবস্থান ছিল গুদামঘরগুলোর সঙ্গে। ছবি : কালের কণ্ঠ

যশোরের অভয়নগর উপজেলায় ভৈরব নদ দখলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। কৃত্রিম চর বানিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় অর্ধশত অবৈধ ঘাট। নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার মুরটি গ্রামে পদ্মার শাখা জলঙ্গি থেকে বেরিয়ে ভৈরব নদ মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এরপর চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর এবং যশোরের তাহিরপুর ও আফ্রা হয়ে ভৈরব নদ খুলনার পশুর নদীতে গিয়ে মিশেছে। তাহিরপুর থেকে খুলনার পশুর-ভৈরবের মিলনস্থল পর্যন্ত ভৈরবের দৈর্ঘ্য ১৩৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশুর-ভৈরবের সঙ্গমস্থল থেকে যশোরের আফ্রা পর্যন্ত ভৈরবের ৩৭ কিলোমিটার প্রবহমান আছে। যার মধ্যে প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ রয়েছে অভয়নগরজুড়ে।

দেশের অন্যতম ব্যবসায়ী মোকাম হিসেবে অভয়নগরের নওয়াপাড়ার পরিচিতি দেশব্যাপী। এখানে নৌ, সড়ক ও রেলপথ থাকায় ব্যবসাসমৃদ্ধ শহর হিসেবে গড়ে উঠেছে। যে কারণে নওয়াপাড়া নদীবন্দরের গুরুত্ব বিবেচনা করে বর্তমান সরকার এটিকে প্রথম শ্রেণির বন্দর হিসেবে ঘোষণা দিতে যাচ্ছে।

উপজেলার রাজঘাট থেকে বসুন্দিয়া ইউনিয়নের আফ্রা ঘাট পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত নওয়াপাড়া নদীবন্দর। এই অংশজুড়ে চলছে অবৈধ স্থাপনা ও নদী দখলের প্রতিযোগিতা।

নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, ২০০৭ সাল থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু। বর্তমানে ৯টি সরকারি জেটি আছে। এ ছাড়া ব্যক্তিমালিকায় রয়েছে প্রায় ১০০ ঘাট। ২০১৯-২০ অর্থবছরে নওয়াপাড়া নদীবন্দরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার (রাজঘাট থেকে ভাঙ্গাগেট) গাইডওয়াল নির্মাণ, স্থায়ী জেটি ও কাস্টম ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনার অনুমোদন দিলে সরকারি রাজস্ব অনেকাংশে বেড়ে যাবে।

সরেজিমনে নওয়াপাড়া নদীবন্দরের ভাঙ্গাগেট মশরহাটি গ্রামে ভৈরব সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীরবর্তী পরশ আটা, ময়দা, সুজি মিল নদের প্রায় ১০০ ফুটের মতো দখল করেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে কৃত্রিম চর বানিয়ে তার মধ্যে এক্সকাভেটর লাগিয়ে মাটি ভরাট করছে।

পাশেই আক্তার অ্যাগ্রো নামের একটি বন্ধ কারখানাও নদীর অর্ধেক প্রায় দখল করেছে। তারা বাঁশের খুঁটি গেড়ে পুরনো টিন দিয়ে নদীর মধ্যে বাঁধ দিয়েছে। পরে ইট, বালু, পাথর ও মাটি দিয়ে ভরাট করে চর উঠেছে বলে দখল করেছে। এরপর সেই স্থানে ঘাট নির্মাণ করার চেষ্টা করছে। তাদের এই নদী দখলের ফলে ওই স্থানে নদীর বাঁক পাল্টে গেছে। যে কারণে নদীর অন্য পারে ব্যাপক ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে, যা এখনো অব্যাহত।

কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিকে কাছে পেয়ে ভাঙনকবলিত দিয়াপাড়া গ্রামবাসী অভিযোগ করে, পরশ এবং আক্তার মিল কর্তৃপক্ষের নদী দখলের কারণে তাদের শত শত বিঘা জমি আজ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার হয়েছে নিঃস্ব। ভৈরব নদের এই স্থান এখন খালে পরিণত হয়েছে। নিঃস্ব পরিবারের পক্ষ থেকে নদীখেকোদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, ‘আমার মতো গরিব পরিবার আজ ভূমিহীন হয়ে পড়েছে। আক্তার অ্যাগ্রো, পরশ মিলসহ নওয়াপাড়া বাজারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ভৈরব নদ দখল করে নদীর বাঁক পাল্টে ফেলেছে। ফলে জোয়ারের পানি আমাদের জমিতে আঘাত হেনে ভাঙন সৃষ্টি করছে।’ এ ব্যাপারে তিনি বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনাসহ ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

কথা হয় পরশ আটা, ময়দা ও সুজি মিলের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমানের সঙ্গে। তিনি নদীর নাব্যতা সংকটের অজুহাত দেখিয়ে বলেন, ‘পণ্যবাহী জাহাজ বা কার্গো ঘাটে ভেড়ানো যায় না। নদীতে নতুন চর জেগেছে। যে কারণে একটু মাটি ভরাট করে পন্টুন করা হচ্ছে। সমস্যা হলে তা অপসারণ করা হবে।’ বারবার চেষ্টা করেও আক্তার মিলের পরিচালক আব্দুল কুদ্দুসের মোবাইল ফোনটি খোলা পাওয়া যায়নি।

নওয়াপাড়া নদীবন্দরের উপপরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ঘাট মালিকরা অহেতুক নদীর নাব্যতা সংকটের অজুহাত দেখাচ্ছেন। ভৈরব সেতুসংলগ্ন এলাকায় নদী

খননের কাজ চলছে। আর এই খননকাজ সারা বছর ধরে চলবে। যারা কৃত্রিম পন্থায় চর বানিয়ে নদী দখল করছে, তাদের তালিকা করে নোটিশ করা হয়েছে। প্রায় ৯০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। বাকিগুলোর বিরুদ্ধে অচিরেই কাজ শুরু করা হবে।’

অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি নদী রক্ষা ও তার আগের রূপ ফিরিয়ে আনতে অভিযান শুরু করেছে। দখল করা স্থানে প্রথমে মাটি কাটা হবে, পরে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ভৈরব নদকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। অবৈধ দখল করা জমি ফিরিয়ে আনাসহ নদী আইন মোতাবেক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ভৈরব সেতুসংলগ্ন নদীর মধ্যে যারা দখলপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চলবে।’

 

ভৈরব নদ দখল করে পরশ আটা, ময়দা ও সুজি মিল কর্তৃপক্ষ এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি ভরাট করে দখল করছে। নদের আগের অবস্থান ছিল মিলের দেয়ালের ১০ ফুট ভেতরে। ছবি : কালের কণ্ঠ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা