kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পিআইওর ‘সম্পদের পাহাড়’

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পিআইওর ‘সম্পদের পাহাড়’

এমপি, ইউএনও কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা—কাউকেই গ্রাহ্য করেন না গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নুরুন্নবী সরকার। উেকাচ না পেলে কোনো প্রকল্পের চেক ছাড়েন না তিনি। গত সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত অর্ধশত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

অভিযোগ আছে, সম্প্রতি উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে হুমকিধমকি দিয়ে ১৪টি প্রকল্পের ছয় কোটি টাকার ভাউচারে স্বাক্ষর নিয়েছেন পিআইও নুরুন্নবী সরকার। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তিনটি ও দুটি ফৌজদারি মামলার আসামি পিআইও। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারি প্রকল্প নয়ছয়, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের নানা অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আর এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে একাধিক তদন্তে প্রমাণও পেয়েছে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি।

পিআইও নুরুন্নবী সরকার গত সাড়ে চার বছরে অবৈধভাবে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। রংপুর শহরে তাঁর তিনটি বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি ও কয়েক কোটি টাকার জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। এত সব অভিযোগের পাহাড় মাথায় নিয়ে এখনো বহাল তবিয়তেই আছেন এই কর্মকর্তা।

পিআইও নুরুন্নবী সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় হালিম আকন্দের নাম। যদিও তিনি ওই অফিসের কোনো কর্মচারী নন, তবুও আলাদা একটি কক্ষে বসে অন্যসব কর্মচারীর মতোই প্রতিদিন অফিস করেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গত চার বছরে শূন্য থেকে কোটিপতি বনে গেছেন তিনি। কোটি টাকার সম্পদ, তিনটি বাড়ি ও অর্ধকোটি টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন হালিম।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করেন পিআইও নুরুন্নবী। ওই সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নেন তিনি। এরপর গোটা উপজেলায় নিজের প্রভাব খাটাতে শুরু করেন। চলতে থাকে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নামে লুটপাট। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া প্রকল্প করে আত্মসাৎ করেন লাখ লাখ টাকা। তাঁর লুটপাটে বাধা দেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এরপর তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ান পিআইও। তাঁকে বদলি করতে এমপির পক্ষ থেকে সুপারিশ পাঠানো হয় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে। সংসদ সদস্যের সুপারিশ পেয়ে তাঁর বদলির আদেশ দেয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর। এরপর শুরু হয় পিআইওর ক্ষমতা প্রদর্শন। দাপট খাটিয়ে এমপির বদলি ঠেকিয়ে পুনরায় সেই চেয়ারে বসেন। এরপর সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন মারা গেলে প্রকল্প হরিলুটের মহা উৎসব চালান। পরে তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ না থাকায় ক্ষমতার দাপটে দপ্তর চালাতে থাকেন তিনি। তখন থেকেই এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। তাঁর দাপটে কোণঠাসা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক নেতারাও। ফলে দাপটের সঙ্গে নিজের নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করেন তিনি।

কোনো ঠিকাদার তাঁর দেওয়া নিয়ম মানতে না চাইলে বিলের চেক ছাড়ে না পিআইও নুরুন্নবী সরকার। এ ছাড়াও ত্রাণের সেতু, কালভার্ট ও রাস্তার পাইলিং নির্মাণ, মসজিদ-মন্দির ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ বিতরণ, রাস্তাঘাট উন্নয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও সীমাহীন দুর্নীতি করে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধি। এমনকি স্মারকলিপি পাঠিয়েও কোনো ফল পাননি তাঁরা। স্থানীয়দের অভিযোগ—এত অনিয়ম ও সীমাহীন দুর্নীতি করেও কিভাবে দাপটের সঙ্গে বহাল তবিয়তে আছেন পিআইও। তাঁর খুঁটির জোর কোথায়—তা জানতে চায় এলাকাবাসী।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ঠিকাদার রানু মিয়া বলেন, ‘পিআইও নুরুন্নবী সরকারের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ সবাই। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয় তাঁর বেঁধে দেওয়া নিয়মেই। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করলেও প্রকল্পের চেক আটকে দেন তিনি। চেক নিতে তাঁকে দিতে হয় মাত্রাতিরিক্ত ঘুষ। এসব কারণে আমরা অনেকে ওই দপ্তরের দরপত্রে অংশগ্রহণ করি না।’

সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘তাঁর সীমাহীন দুর্নীতিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারের নানা উন্নয়ন কার্যক্রম। তাঁর লুটপাটে প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজও বাস্তবায়ন হয় না। আমরা সবাই মিলে তাঁর অপসারণ দাবিতে সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছি। অভিযোগও করেছি বিভিন্ন দপ্তরে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।’

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোলেমান আলী বলেন, ‘তিনি যেহেতু আমার দপ্তরের কেউ নন, তাই আমি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে পিআইওর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানানো হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা