kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাতক্ষীরা

খালে বাঁধ, সড়কে পানি

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খালে বাঁধ, সড়কে পানি

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ইটাগাছা সড়ক পানির নিচে তলিয়ে আছে। পানি ঢুকে পড়েছে বাসাবাড়িতে। দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কয়েক দিনের জমা বৃষ্টির পানিতে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদরের বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ওই সব এলাকার কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।  স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, চিংড়ি চাষ করতে গিয়ে খালে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে রাখায় পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করেছে।

গত মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের রথখোলা বিল, বদ্দিপুর কলোনী, ডেয়ের বিল, কাটিয়া মাঠপাড়া, পলাশপোল, ইটাগাছা ও  লাবসা ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাগুরা দাসপাড়া, নলকুড়া, কৈখালী এলাকায় কোমর সমান পানি। এসব এলাকার রাস্তার ওপর রয়েছে হাঁটুপানি। কোথাও বাড়ির উঠানে আবার কোথাও বারান্দায় উঠেছে পানি। ফলে ওই সব পরিবারের সদস্যদের ভোগান্তির শেষ নেই। একই অবস্থা কামাননগর, ইটাগাছা, মাছখোলা বিলসহ সদরের বিস্তীর্ণ এলাকার।

রথখোলা বিলের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা বিমল সানা জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিগত কয়েক দিনের সামান্য বৃষ্টিতে তাঁর বাড়িসহ বিলের মধ্যকার সরকারবাড়ির উঠানে কোমর সমান পানি। হাঁটুপানি জমেছে রাস্তার ওপরেও। পৌরসভার পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই বৃষ্টির পানিতে তাঁদের এলাকা তলিয়ে যায়। বাড়ি থেকে ছেলে-মেয়েদের বাইরে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। চারদিকে পানির কারণে তাঁরা বন্দিজীবন যাপন করছেন।

একই এলাকার চাকরিজীবী প্রদীপ মণ্ডল জানান, উপজেলার সামনে দিয়ে যে কালভার্ট রয়েছে সেখান থেকে আর পানি নিষ্কাশন হয় না। এ অবস্থা নিরসনে ড্রেন কেটে একাডেমি মসজিদের সামনে মিশিয়ে দিয়ে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের পাশ দিয়ে প্রাণসায়র খালে পানি ফেলতে হবে। অথবা টিঅ্যান্ডটির পাশ দিয়ে ড্রেন তৈরি করে প্রাণসায়র খালে পানি সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এর মাধ্যমে রথখোলা বিলের পানি সরানো সম্ভব। এ ছাড়া যে কালভার্ট দিয়ে আগে পানি নিষ্কাশন করা হতো, তা পরিষ্কার করতে হবে। সুলতানপুরের মধ্যকার কালভার্টটিও পরিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি।

পশ্চিম কামাননগরের বাসিন্দা ফজলুর রহমান জানান, এবার বৃষ্টির পরিমাণ যথেষ্ট কম হলেও তাঁদের এলাকায় হাঁটুপানি জমেছে। একই কথা বলেন ইটাগাছার আবু সাঈদ বিশ্বাস। ১০ দিন ধরে তাঁদের বাড়ির উঠানে হাঁটুপানি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রভাবশালীরা যত্রতত্র অপরিকল্পিত চিংড়িঘের করায় এবং খালে নেট পাটা দেওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আর কিছুদিন বৃষ্টি হলে পানি সরতে না পেরে এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে।’

বদ্দীপুর কলোনির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুকুমার দাস বলেন, ‘এলাকার পানি সরছে না। মাছ চাষের নামে প্রভাবশালীরা ছোট ছোট খাল দখল করে নেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

লাবসা নলকুড়া গ্রামের আমিনুর রহমান ও শহীদুল ইসলাম জানান, পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় তাঁরা খুব কষ্টে আছেন। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘একমাত্র প্রশাসনই ইচ্ছা করলে উদ্যোগ নিয়ে এ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে পারে।’

এদিকে সদর উপাজেলার লাবসা ইউনিয়নের মাগুরা, দাসপাড়া, কৈখালী ও খেজুরডাঙ্গি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের বাড়িঘর, চিংড়িঘের ও ফসলি ক্ষেত এখন পানির নিচে। তাঁদের বাড়িতে পানি। পানির কারণে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। জেলা প্রশাসন পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নিলেও তার সফলতা এলাকার মানুষ পায়নি। ফলে প্রতিদিনের বৃষ্টিতে পানির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জনজীবন আরো বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে সন্ধ্যায় পানি অপসারণের দাবিতে মাগুরা পশ্চিমপাড়া মসজিদের পাশে সড়কের ধারে কয়েক শ মানুষ সমবেত হয়ে মানববন্ধন করেছে। বক্তারা এক সপ্তাহ সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলেন, এই সময়ের মধ্যে খাল ও নদী থেকে নেট পাটা তুলে দিয়ে অবৈধ বেড়িবাঁধ কেটে দিতে হবে। অবিলম্বে পানি নিষ্কাশন করা না গেলে জনগণ বৈধ ও অবৈধ বেড়িবাঁধ কেটে দিতে বাধ্য হবে।

সাতক্ষীরা নাগরিক আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, ‘বেতনা, মরিচ্চাপ, লাবণ্যবর্তীসহ বিভিন্ন নদীর সংযোগ খালগুলো এখন প্রভাবশালীরা দখল করে মাছ চাষ করছে। স্লুইস গেটের মুখগুলোও এখন পলি জমে অকেজো হয়ে গেছে। এ ছাড়া বিল ও নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় পানি সরতে না পেরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। একটি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে সমস্যাবহুল খাল ও নদীগুলো চিহ্নিত করে নকশা তৈরি করলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব।’

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি খালের ইজারা বাতিল করা হয়েছে। কয়েকটি টিম গঠন করে প্রতিদিন কোনো না কোনো এলাকার খালের মধ্যকার নেট পাটা অপসারণ করার পাশাপাশি স্লুইস গেটের সামনের জায়গা পরিষ্কার করে পানি সরানোর কাজ চালানো হচ্ছে। আমরা রথখোলার বিল ও মাছ খোলা বিল পরিদর্শন করে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা