kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গাইবান্ধায় পাঠদান চলে গাছের তলে

নদীতে বিলীন ১২ বিদ্যালয়

বিরূপ পরিবেশের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতি অনেক কম। ফলে চলতি বছর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষকরা

অমিতাভ দাশ হিমুন, গাইবান্ধা   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



নদীতে বিলীন ১২ বিদ্যালয়

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কেতকিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবন নদীতে ভেঙে গেছে। টিনের চালার নিচে চলছে শিক্ষার্থীদের একাংশের পাঠদান। (ইনসেটে) বাকি অংশে পাঠদান আকাশের নিচে ত্রিপল বিছিয়ে। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাইবান্ধায় এবারের দুই দফা বন্যায় ফুলছড়ি, সাঘাটা, সদর,  সুন্দরগঞ্জ উপজেলাসহ অন্যান্য এলাকার ২২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। তবে পানি নেমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০৮টিতে ক্লাস শুরু হয়। বাকি ১২টি বিদ্যালয় বন্যার সময় তীব্র নদীভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন গাছের নিচে পাঠগ্রহণে বাধ্য হচ্ছে। সামনে সমাপনী পরীক্ষা। কিন্তু বিরূপ পরিবেশের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতি অনেক কম। ফলে চলতি বছর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষকসহ অন্যরা।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, স্মরণকালের ভয়াবহ এই বন্যায় ভাঙনের তোড়ে ফুলছড়ির হারোডাঙ্গা, ধলিপাটাধোয়া, কেতকীরহাট, জামিরা, আঙ্গারীদহ, গাইবান্ধা সদরের চিথুলিয়ার চর, চিথুলিয়া দিগর নতুন পাড়া, বাজে চিথুলিয়া, মৌলভীর চর, কেবলাগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জের উজানবুড়াইল, চরপূর্ব লাল চামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এসব বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখন ঘর হারিয়ে গাছের নিচে বা বাড়ির উঠানে লেখাপড়া করছে।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুলছড়ির কেতকীর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল ভবনের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে ভাঙনের চিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে দুই-তিনটি পিলার। অথচ বন্যার কয়েক দিন আগেই বিদ্যালয়টির ছাত্রছাত্রীরা নতুন দ্বিতল ভবনে শিক্ষকদের কাছে পাঠগ্রহণ করত, দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করত। পাশের একতলা পুরনো ভবনটিতেও ছিল তাদের ক্লাসরুম। প্রশস্ত আঙিনায় ছিল খেলার সুযোগ। কিন্তু ভাঙনের তোড়ে ভবন দুটির সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে হারিয়ে গেছে তাদের আসবাব, বেঞ্চ, টেবিলসহ সব জিনিস। হারিয়ে যাওয়া বিদ্যালয় ভবনের পাশে গাছতলা ও ছাপরাঘরে বসে তারা এখন হতাশ চোখে স্মৃতি হাতড়ায়। পাঠ নিতে গিয়ে তাদের শুধুই মন খারাপ হয়।

চতুর্থ শ্রেণির মেরাজুল করুণ মুখে বলল, ‘এই স্কুল দেখিয়া সগল্যে খুশি হইত। ফ্যানের হাওয়াত থাকিয়্যা কম্পিউটার শ্যাখা আর হয় না। এখন বালুত বসিয়্যা পড়ি। মাইনস্যে রাস্তা দিয়্যা যায়, কথা কয়, তামানে কানোত আসে। পড়াত মন দিব্যার পাই ন্যা।’ একই ক্লাসের দিলারা বলে, ‘হামার বান্ধবীরা ম্যালাগুল্যা ইসকুলোত আসা বন্ধ কচ্চে। গাছের তলায় পড়ব্যার মন চায় না!’

কেতকীর হাটে সাত শিক্ষকের মধ্যে ছয়জনই নারী। খোলা জায়গায় ক্লাস নিতে গিয়ে তাঁদের নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। সামনে সমাপনী পরীক্ষা। একই সঙ্গে শিশুশ্রেণিসহ ছয়টি ক্লাস নিতে গিয়ে কোলাহলপূর্ণ খোলা জায়গায় মনসংযোগ হারিয়ে ফেলেন শিক্ষকরা। রোদ-বৃষ্টিতে সংকট বাড়ে।

প্রধান শিক্ষক রেজিয়া খাতুন বলেন, ‘ভেঙে যাওয়া স্কুলের পাশে তাঁরা নিজেরা একটি ছাপরাঘর তুলেছেন। জেলা প্রশাসন টিন ও অর্থ সহায়তা দিয়েছে। শিশুদের মতোই তাঁরও দুঃখ, বাঁধ ভেঙে স্কুলের দ্বিতল ভবনটি নদীগর্ভে চলে গেল। ফ্যান, কম্পিউটারসহ অনেক দামের শিক্ষা উপকরণ খেয়ে ফেলেছে নদী। ভাঙনে ভবনসহ এই স্কুলেই অন্তত এক কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এদিকে স্কুল ভবন না থাকায় এবার চর এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সংখ্যা বাড়তে পারে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসেন আলী বলেন, নদীভাঙনে বিলীন ১২টি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বাধ্য হয়েই গাছের নিচে পাঠদান করতে হচ্ছে। স্কুল কমিটির সভাপতিরা অনেকে তাঁদের বাড়ির গাছের নিচে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তবে দানশীল ব্যক্তিরা জায়গা দিলে কিংবা অন্য কোনোভাবে স্থান পেলে দ্রুত স্কুল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা