kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পঞ্চগড়ে শতভাগ বিদ্যুতায়ন

৫০০ কোটি টাকা ব্যয় শত কোটি টাকা ঘুষ

লুত্ফর রহমান, পঞ্চগড়   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পঞ্চগড়ে শতভাগ বিদ্যুতায়ন প্রকল্পে নতুন করে সংযোগ পেয়েছে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার গ্রাহক। সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। অথচ গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটারপ্রতি চার থেকে সাত হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকদের দেওয়া তথ্য মতে, অনিয়ম হচ্ছে প্রায় শত কোটি টাকার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শতভাগ পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় পঞ্চগড়ের পাঁচ উপজেলায় কাজ শুরু হয়। পাঁচ হাজার ৬৮৪ কিলোমিটার নতুন লাইন নির্মাণের কাজ হচ্ছে ঠিকাদারদের মাধ্যমে। জামানত বাবদ ৪০০ টাকা আর সদস্য ফি ৫০ টাকা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তি, দালালচক্র, বিদ্যুৎ বিভাগের নিবন্ধিত ইলেকট্রিশিয়ানরা সিন্ডিকেট তৈরি করে বাড়তি টাকা নিচ্ছে।

পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, আটোয়ারী ও তেঁতুলিয়া উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ঘোষণা করা হয়েছে। দুই উপজেলায় বিদ্যুৎ পৌঁছেছে ৮৭১ কিলোমিটার। এ ছাড়া সদর, বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলায় নতুন লাইন নির্মিত হয়েছে তিন হাজার ৬০২ কিলোমিটার। আরো এক হাজার ২১১ কিলোমিটার লাইন নির্মিত হলে শতভাগের আওতায় আসবে এই তিন উপজেলাও।

সদর উপজেলার নরদেবপাড়ার বাসিন্দা দুলাল আহম্মেদ সরকার ও এনামুল হক জানান, বিদ্যুৎ অফিসের দালাল মোস্তফার কাছে ৮০টি পরিবার পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা করে দিয়েছে। মিটার বরাদ্দ হয়েছে। পাঁচটি পরিবার চার হাজার ৫০০ টাকা করে দিয়েছে বলে মিটার দেওয়া হয়নি।

দেবীগঞ্জ উপজেলা বন্দিরামে বৃদ্ধ হেরামোহন রায় বলেন, ‘চোখে কম দেখি। বিদ্যুতের জন্য টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য নাই। তাই ওরা আমার নাম কেটে দিয়েছে।’

আছিয়া খাতুন বলেন, ‘বাড়ির বাঁশ ও মুরগি বিক্রি করে এবং সুদে ঋণ নিয়ে চার হাজার টাকা দিয়েছি। এরপর তারা মিটার দিয়েছে, এখনো সংযোগ দেয়নি। সুদের টাকা শোধ করব কিভাবে ভেবে পাই না।’

সন্তোষ রায় বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগের কথা বলে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার অবিনাশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান দুই শ পরিবারের কাছ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা করে নিয়েছে। যারা টাকা দিতে পারেনি তাদের নাম বাদ দিয়েছে।’

সদর উপজেলার কুচিয়ারমোড়ের জরিনা বেগম জানান, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হাকিমের হাতে তাঁরা বিদ্যুতের জন্য ধাপে ধাপে চার হাজার ২০০ টাকা করে দিয়েছেন।

সোলেমান আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হাকিম ১৮০টি পরিবারের কাছ থেকে চার হাজার ২০০ টাকা করে নিয়েছে।’

দেবীগঞ্জের খোঁচাবাড়ির আবুল কাশেম বলেন, ‘পাঁচ হাজার টাকা করে দিয়েছি। বাকি ছিল মাত্র পাঁচ শ টাকা। সে জন্য ছয় মাস ঘুরিয়েছে। আলোর ফেরিওয়ালা এখানে নেই। আছে দুর্নীতির ফেরিওয়ালা।’

স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা, বন্দিরাম, কলোনিপাড়া, হাতিপুকুরি, ফুলপুকুরি, বানুরহাট, পামুলি, টেপ্রিগঞ্জ, ভাউলাগঞ্জ, সদর উপজেলার হাঁড়িভাসা, টুনিরহাট, চাকলা, কুচিয়ারমোড়, নরদেবপাড়া, মীরগড়, গড়িনাবাড়ি, আমলাহার, মাগুড়া, তেঁতুলিয়ার তীরনইহাট, বাংলাবান্ধা ও বোদা উপজেলার মাড়েয়া, বেংহাড়ি, তেপুকুরিয়াসহ অর্ধশত গ্রামে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ঘুষ না দেওয়ায় মিটারও মিলছে না।

দেবীগঞ্জ উপজেলার বন্দিরাম ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার অবিনাশ চন্দ্র রায় ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান বিদ্যুতের জন্য টাকা উত্তোলনের কথা অস্বীকার করেছেন। অস্বীকার করেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার নরদেবপাড়ার মোস্তফাও। তবে সদর উপজেলার কুচিয়ারমোড়ের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমি কোনো টাকা তুলিনি।’

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু জেকের বলেন, ‘টাকা ছাড়া পল্লী বিদ্যুতের একটি সংযোগও মিলছে না। সীমাহীন অনিয়ম হলেও কেউ অভিযোগ করতে চায় না। অভিযোগ না করায় এর প্রতিকার মিলছে না।’

ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নতুন লাইন নির্মাণের যেসব কাজ হচ্ছে তা প্রকল্পের অধীন। আমাদের কাজ শুধু মিটার সরবরাহ করা। বাকি সব কাজ তাদের। তাই এ বিষয়টি ওই প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেখে থাকেন। গ্রাহকরা ৪৫০ টাকা জমা দিলেই মিটার ও বিদ্যুৎ পাবে।’

শতভাগ পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘অনিয়ম হলেও কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করে না। অভিযোগ পেলেই আমরা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। মেসার্স মানিক অ্যান্ড কম্পানি, টিএসএল কনস্ট্রাকশন, জিএম ট্রেডার্স কনস্ট্রাকশন, মেসার্স নিপা কনস্ট্রাকশন, মেসার্স দি পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন, মেসার্স এমএইচ এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে অনিয়ম হওয়ায় কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।’

ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আবু আশরাফ মো. সালেহ বলেন, ‘এসব কাজে কোনো অনিয়ম হলে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করুন। আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বিদ্যুতের মতো সরকারি সেবা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাড়তি কোনো টাকা নেওয়ার বিধান নেই। আমার কাছে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা