kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চিনিতে রং মিশিয়ে গুড়

মামুন-উর-রশিদ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চিনিতে রং মিশিয়ে গুড়

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সাতগীরি গ্রামে ভেজাল গুড় তৈরির কারখানা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাজারে চিনির দাম ৫৫ টাকা কেজি; আর গুড়ের দাম ৮০ টাকা কেজি। এক কেজি চিনিতে প্রায় দেড় কেজি গুড় তৈরি হয়। বেশি লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা চিনিতে কাপড়ের রং মিশিয়ে এই গুড় তৈরি করছে। এটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সম্প্রতি সাতগীরি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, প্রথমে চিটাগুড়ভর্তি (গোখাদ্য) কড়াইয়ে ঢালা হলো এক বস্তা চিনি। এরপর লাকড়ি দিয়ে বেশ কিছু সময় নাড়ানো হলো। নাড়াচাড়া করার পর আখের রসের আকার ধারণ করল। পরে কড়াইটি চুল্লিতে রেখে দেয়া হলো তাপ। বেশ কিছু সময় তাপ দেওয়ার পর যখন কালো বর্ণ ধারণ করে ঠিক তখনই মিশ্রণে দেওয়া হলো হাইড্রোজ ও ফিটকিরি। এভাবে প্রায় ৩০ মিনিট চুল্লির আগুনে তাপ দেওয়া শেষে কিছুটা লালচে রং ধারণ করে মিশ্রণটি। কিন্তু আখের রসের যে আকৃতি, তা না পাওয়ায় তাতে মেশানো হলো ক্ষতিকারক কাপড়ের লাল রং। ব্যস এভাবে প্রায় ৪০ মিনিটে তৈরি হলো আখের রসের মতো ভেজাল গুড়ের উপাদান। এরপর চুল্লি থেকে নামিয়ে ঠাণ্ডা জায়গায় রাখা হলো কড়াইটি। আবারও লাকড়ি দিয়ে নাড়ানোর পর শীতল করে তৈরি করা হলো পাটালি। এরপর কয়েকজন শ্রমিক পাল্লায় মেপে গুড়ের মোট বাঁধল।

স্থানীয় লোকজন জানায়, এখন আখ না থাকায় ভেজাল উপাদানেই একমাত্র ভরসা তাদের। আখের রসবিহীন এসব ভেজাল গুড় জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রামসহ সারা দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে।

গ্রামের লোকজন জানায়, কফিল উদ্দিন, লিটন, আলম, লতিফ মুন্সী, আশিকুর ও শাহানুরের বাড়িতে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-সাত মণ করে গুড় তৈরি হচ্ছে। এতে চিনি, চিটাগুড় (গোখাদ্য), হাইড্রোজ, ফিটকিরি, ইউরিয়া ও ক্ষতিকারক কাপড়ের লাল রং মেশানো হয়। এ ভেজাল গুড়ে সয়লাব এখন হাট-বাজার। বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে মালামাল জব্দ ও জেল-জরিমানা করলেও বন্ধ হয়নি কার্যক্রম। ফলে নির্বিঘ্নে ভেজাল গুড়ের কারখানা বহাল।

ব্যবসায়ীরা জানায়, এখন আখের রস না থাকলেও বাজারে গুড়ের চাহিদা অনেক। তবে অনেকে আগের কিছু আখের রস জমা রেখেছে। এর সঙ্গে চিনি, চিটাগুড় ও হালকা রং মিশিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘একটু লাভের আশায় সামান্য ভেজাল মেশানো হচ্ছে। তবে এটা অনৈতিক। আমরা বাধ্য হয়েই এগুলো করছি।’

এ ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার রানু মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামের বেশ কিছু বাড়িতে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় প্রশাসন অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করলেও বন্ধ হয়নি গুড় তৈরি।’ তিনি এসব ভেজাল গুড় উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। ওই গ্রামের যুবক আনারুল হক বলেন, ‘আমরা জানতাম আখের রস দিয়ে গুড় তৈরি হয়। কিন্তু এখন দেখছি চিটাগুড় আর চিনির সঙ্গে রং মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি করা হচ্ছে। এসব গুড় আমাদের স্বাস্থ্যর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আমার দাবি, দ্রুত এসব ভেজাল গুড় তৈরির কারখানা বন্ধ করা হোক।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইয়াকুব আলী মোড়ল বলেন, ‘চিনি, চিটাগুড় ও রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হলে তা একটি বিষক্রিয়া তৈরি হয়। ফলে রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি এসব গুড় মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, যা পেটের পীড়াজনিত নানা রোগ সৃষ্টির উপাদান। বিশেষ করে লিভার ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এ ছাড়া শিশু ও বয়স্কদের জন্য আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভেজাল গুড়।’ তিনি সবাইকে এসব ভেজাল গুড় পরিহার করার আহ্বান জানান।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোলেমান আলী বলেন, ‘এসব ভেজাল গুড়ের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ভেজাল গুড় উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা