kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঘুষ ছাড়া নড়েন না সাবরেজিস্ট্রার

শাহজাদপুরে জিম্মি দলিল লেখক ও সেবাগ্রহীতারা
ঘুষ নেওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড়

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঘুষ ছাড়া নড়েন না সাবরেজিস্ট্রার

সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস (মাঝে) । তিনি (বাঁয়ে) এবং নকলনবিশ সুমন (ডানে) ঘুষের টাকা গুণছেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘুষ ছাড়া কোনো দলিলে স্বাক্ষর করেন না সাবরেজিস্ট্রার। প্রতিটি দলিলের জন্য সেবাগ্রহীতাদের অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিয়ম করে এলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেউ। অদৃশ্য ক্ষমতাবলে সব ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বিঘ্নে। তাই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাসের কাছে সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে দলিল লেখকরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে যোগদানের পর থেকেই দলিলপ্রতি এক হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা উেকাচ নিয়ে থাকেন সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় তুমুল আলোচনায় এসেছেন তিনি।

গত ১৫ আগস্ট রাতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি সোহেল রানা তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে সাবরেজিস্ট্রারের ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও পোস্ট করেন। এর পর থেকে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডিতে শেয়ারের মাধ্যমে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে সমালোচনার ঝড় উঠতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শাহজাদপুরে যোগদানের পর থেকেই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে শাহজাদপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিস। হেবার ঘোষণাপত্র দলিলের জন্য সরকারি ফি ছাড়া এক হাজার ৫০০ থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে থাকেন তিনি।

এ ব্যাপারে দলিল লেখকদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, দলিলপ্রতি কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। না দিলে নানা সমস্যা সৃষ্টি করেন সাবরেজিস্ট্রার। আর এসব টাকা সাবরেজিস্ট্রারের পক্ষে সুমন নামের এক নকলনবিশ গ্রহণ করেন।

ভুক্তভোগী কায়েমপুর ইউনিয়নের ব্রজবালা গ্রামের মো. মানিক বলেন, ‘আমি একটি হেবার ঘোষণাপত্র দলিল রেজিস্ট্রি করতে এলে প্রথম দিন আমাকে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমি পরে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা উেকাচ দিতে রাজি হলে আমার দলিলটি রেজিস্ট্রি করে দেন।’

সম্প্রতি শাহজাদপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস ও সুমনের অবৈধ উেকাচ বিনিময়ের ভিডিও হাতে আসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস নিজেই একজন দলিল লেখকের কাছ থেকে উেকাচ হিসাবে এক হাজার ৫০০ টাকা নিচ্ছেন। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি দলিলের উেকাচ বাবদ আনিস নামের এক ব্যক্তিকে প্রথমে তিন হাজার টাকা দিলে তিনি দলিল লেখককে বলেন, স্যার তিন হাজার ৫০০ টাকা দিতে বলেছেন। পরে দলিল লেখক টাকা না দিয়ে সাবরেজিস্ট্রারকে ফোন দিতে বলেন। আনিস সঙ্গে সঙ্গে সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাসকে ফোন দিয়ে কথা বলে তিন হাজার টাকা ফেরত দিয়ে বলেন, তিন হাজার ৫০০ টাকার কমে হবে না। বাধ্য হয়ে ওই দলিল লেখক তাঁকে তিন হাজার ৫০০ টাকাই দেন।

শাহজাদপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি সোহেল রানা বলেন, ‘আমি নিজে তাঁকে দলিল সম্পাদনের জন্য কয়েক দফা উেকাচ দিয়েছি। আমি বিষয়টি প্রকাশ করায় আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমি এখন জীবনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাস বলেন, ‘আমি বা আমার অফিসে কোনো প্রকার ঘুষ নেওয়া হয় না। যে ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়েছে সেগুলো আমাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানোর জন্য করা হয়েছে।’

সিরাজগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার আবুল কালাম মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘শাহজাদপুরের সাবরেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার দাসের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি আমার নজরে আসার পর গত বুধবার গিয়ে তদন্ত করেছি। ভাইরাল হওয়া যেসব ভিডিও ও ছবি হাতে এসেছে তার কিছু অংশের সত্যতা মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদনটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা