kalerkantho

টাঙ্গাইলে দখলবাজরা বেপরোয়া

আ. লীগ নেত্রীর জমিও বেদখল

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টাঙ্গাইলে দখলবাজরা বেপরোয়া

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ভাল্লুককান্দিতে লৌহজং নদীর পারে খাসজমি দখল করে ঘর তুলেছে প্রভাবশালীরা। (ইনসেটে) ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিও দখল করা হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা মহানগর ২০ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা লীগের সভানেত্রী রোমেছা আক্তার রুমা। ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে সান্নিধ্য পেয়েছেন প্রয়াত আইভি রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের মতো রাজনীতিকের। অথচ প্রভাবশালীদের কবলে পড়ে মায়ের ওয়ারিশের জায়গা হারাতে বসেছেন তিনি।

তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। এ সুযোগে তাঁর গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল শহরের ভাল্লুককান্দিতে প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে সেই জায়গা। এটি উদ্ধার করতে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়িয়েও কোনো কাজ হয়নি। সাহারা খাতুনের সুপারিশসহ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এখন তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। জমি উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

রোমেছা জানান, ২০১৩ সালের ২৬ জুলাই একদল ভূমিদস্যু দা, কুড়াল, লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের ভাল্লুককান্দির বাড়িতে আক্রমণ করে। তারা কারো কথা না শুনে সেখানকার গাছ কাটতে শুরু করে। বাধা দিতে গেলে তারা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এ অবস্থায় তাঁর মামা ইয়াকুব আলী বাজার থেকে বাড়ি এসে দেখেন সন্ত্রাসীরা গাছ কাটছে। তিনি বাধা দিতে গেলে সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর আক্রমণ করে তাঁকে মারধর করে। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। সন্ত্রাসীরা সেদিন প্রায় পাঁচ লাখ টাকার গাছ কেটে নিয়ে যায়। পরে ভূমিদস্যুরা তাঁর মামা ইয়াকুব আলীর জায়গা দখল করে। ইয়াকুব আলীর মৃত্যুর পর ওই জমির ওয়ারিশ হিসেবে তাঁর মা ২৪ শতাংশ জায়গা পান। কিন্তু প্রভাবশালীরা সে জায়গা তাঁকে বুঝিয়ে দেয়নি। একসময় তাঁর মা মারা যান। সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে ইয়াকুব আলীর স্ত্রী সামর্থ বেওয়াও জায়গা ছেড়ে মেয়ের বাড়িতে উঠেছেন। সন্ত্রাসীরা তাঁদের পরিবারের লোকজনকে জীবননাশের হুমকি দিচ্ছে। জমি রক্ষা করতে না পেরে সামর্থ বেওয়া তাঁর ভাগ্নি রোমেছার নামে ২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর ওয়ারিশের ২৪ শতাংশসহ তাঁদের ৪১ শতাংশ জায়গা আমমোক্তারনামা (লিখে) করে দেন।

রোমেছা আরো জানান, তিনি জমি উদ্ধারের জন্য টাঙ্গাইলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কাছে গেছেন; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে দেখা করেছেন টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনিও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘জমিসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে একজন এসেছিল। তাকে পুলিশ সুপারের কাছে পাঠিয়েছিলাম।’ এদিকে জমি পরিদর্শনে থানা থেকে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তাতেও কোনো কাজ হয়নি।

রোমেছা বলেন, ‘একমাত্র সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকি। টাঙ্গাইলে আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। এই সুযোগে দখলবাজরা জমি ছাড়ছে না। স্থানীয় শবদুল মিয়া নেপথ্যে থেকে এসব কাজ করছেন।’

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ভাল্লুককান্দি গেলে আরো কয়েকজন জমি দখলের অভিযোগ করেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাইজুল ইসলাম জানান, ভাল্লুককান্দি মৌজায় তাঁর বাপ-চাচাদের ১২ শতাংশ জায়গা ছিল। সেখান থেকে চার শতাংশ বিক্রি করা হয়। পরে ২০১২ সালের দিকে অন্য এক হিন্দু ব্যক্তিকে ওই জমির মালিক সাজিয়ে ৬ শতাংশ বিক্রি করা হয়। যিনি জায়গা কেনেন তিনি বাকি দুই শতাংশসহ মোট আট শতাংশ দখল করে নেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান রেকর্ডেও বাপ-চাচাদের নামেই জমি রয়েছে। অথচ সেই জমি কিভাবে বিক্রি করা হলো?’ তাইজুলের বাবা নেফাজ উদ্দিন বলেন, ‘যারা জমি বেচছে তাদের জায়গা অন্য খতিয়ানে। শবদুলের কারসাজিতে আমার খতিয়ান থেকে কৌশলে জায়গা বেচা হয়। প্রথমে বুঝতে পারি নাই। তারা আমাদের হুমকি দিয়ে জায়গা থেকে তাড়িয়ে দেয়। পরে ঘটনা বুঝতে পারি।’

তাইজুলের চাচা আব্দুর রহিম বলেন, ‘প্রভাবশালীরা হুমকি দিয়েছে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য। ইয়াকুব আলীর জায়গাও একইভাবে দখল করা হয়।’

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক স্থানীয় আজিজুল হক জানান, এলাকার প্রভাবশালীরা সরকারি খাসজমিও দখল করছে। তাঁর বাড়ির পাশে লৌহজং নদীর পারের খাস জায়গা দখল করে সেখানে টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

রোমেছা আক্তারের মামি সামর্থ বেওয়া বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। তারা অন্য জায়গায় থাকে। আমার কোনো খোঁজ তারা নেয় না। ভাত-কাপড়ও দেয় না। আমি মেয়ের কাছে থাকি। আমরা জায়গা রক্ষা করতে পারছিলাম না। তাই ভাগ্নিকে দলিলের মাধ্যমে লিখে দিই। তাও যদি জমি রক্ষা হয়। সন্ত্রাসীদের হুমকিতে অনেক সময় পালিয়ে থাকছি।’

রোমেছা আক্তার রুমা বলেন, ‘রাজপথের নেত্রী হয়েও আমি আমার জমিটা সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছি না। জমি উদ্ধারের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তিনি যেন আমার জমি বিক্রি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কারণ ওই জমিতে আমি বাড়ি করে থাকতে পারব না। সন্ত্রাসীরা আমাকে সেখানে নিরাপদে থাকতে দেবে না।’

অভিযুক্ত শবদুল মিয়া বলেন, ‘রোমেছা বেগম ইয়াকুবের স্ত্রীকে উসকে দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দিয়েছে। টাঙ্গাইল থানায় এ নিয়ে বসা হয়েছে; কিন্তু তিনি অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। জাল দলিলের ব্যাপার যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে তাহলে যেকোনো শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। আসলে আমাদের হয়রানি করার জন্য এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

টাঙ্গাইল পৌরসভার কাউন্সিলর আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘শবদুল মিয়ার সঙ্গে আরো কয়েকজনের একটি চক্র রয়েছে। তারা ইয়াকুব আলীর জায়গা দখল করেছে। তা ছাড়া জাল দলিলের মাধ্যমে অন্যের জমি লিখে নেওয়ার একাধিক ঘটনা আছে। দস্যু হিসেবে তাদের পরিচয় রয়েছে এলাকায়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা