kalerkantho

রংপুরে পশুর হাট

ক্রেতার চেয়ে গরু বেশি

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্রেতার চেয়ে গরু বেশি

কোরবানির ঈদ ঘিরে রংপুরের পশুর হাটে দেশিয় গরুর সরবরাহ রয়েছে প্রচুর, কিন্তু ক্রেতা মিলছে না। ছবিটি গত বৃহস্পতিবার নগরীর বুড়িরহাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

আর কয়েক দিন পরেই কোরবানির ঈদ। এরই মধ্যে রংপুরের হাটগুলোতে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুরু হয়েছে। তবে বন্যার কারণে এখনো জমে ওঠেনি হাট। তা ছাড়া ঘরে থাকা বোরো ধানের দাম না থাকাসহ ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে বন্যা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন হাট ইজারাদাররা। এ অবস্থায় হাত গুটিয়ে বসে আছে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দালাল, ফড়িয়া, ছোট-বড় ব্যবসায়ীসহ শ্রমিকরা।

সংশিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত বছরগুলোতে কোরবানি ঈদের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার গরুর হাটে ২৫ লাখেরও বেশি গরু বিক্রি হতো। এই গরুর ৮০ শতাংশ ক্রেতা ছিল উত্তরাঞ্চলের বাইরে থেকে আসা বৃহত্তর ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল এলাকার গরু ব্যবসায়ীরা। ট্রাকে করে এগুলো নিয়ে যাওয়া হতো বাইরে। আর স্থানীয় পর্যায়ে গরু বিক্রি শুরু হতো ঈদের ঠিক সপ্তাহখানেক আগে থেকে।

রংপুরের বৃহত্তম লালবাগ হাটে গত বুধবার গরু বিক্রি করতে আসা রংপুর মহানগরের বড়বাড়ি এলাকার আহাদুল ইসলাম বলেন, গত বছর কোরবানির ঈদের পর ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে চারটি দেশি গরু কিনেছি। এরপর বছরব্যাপী ধানের গুঁড়া, ভুসি, নালিসহ বিভিন্ন উপাদান ক্রয় এবং শ্রমিক দিয়ে গরুর পরিচর্যা করতে গিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে চারটি গরু হাটে আনা পর্যন্ত খরচ হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। তিনি জানান, তিন হাট ঘুরে এখন পর্যন্ত চারটি গরুর দাম উঠেছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। যেখানে এক বছর পর এসব গরুতে ৫০ হাজার লাভ হওয়ার কথা সেখানে খরচই উঠছে না। বড় কথা গ্রাহকই মিলছে না।

লালবাগ হাটে দেশি গরু বিক্রি করতে আসেন মাহিগঞ্জ এলাকার রুহুল আমিন। তিনি জানান, মাসখানেক আগে বাড়িতে তাঁর গরুটির দাম উঠেছিল ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু হাটে এনে ৬০ হাজার টাকার বেশি বলছে না। এ পর্যন্ত বুড়িরহাট, লালবাগ, তারাগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি হাটে গরুটি উঠিয়েছিলেন তিনি।

হাটের পাশের মডার্ন এলাকা থেকে দুটি গরু বিক্রি করতে হাটে আনেন লিয়াকত আলী। তিনিও জানালেন আক্ষেপের কথা। বাড়িতে দুটি গরু ৬৪ হাজার টাকা দাম বলেছিল; কিন্তু পরে আর তারা আসেনি। এখন হাটে নিয়ে এসে গরু দুটির দাম ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলেছে ক্রেতারা।

হাটে গরু কিনতে আসা চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সাহেব আলী জানান, গত সপ্তাহে রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন হাট থেকে তিনি ২৫টি গরু প্রায় সাত লাখ টাকায় কিনে নিয়ে যান। চট্টগ্রামে প্রতিটি গরুতে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে। ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী ওসমান গণি বলেন, ‘গত বছর প্রতি হাটে পাঁচ থেকে সাত ট্রাক করে গরু ক্রয় করে নিয়ে গেছি। কিন্তু এ বছর গরু কেনারও সাহস পাচ্ছি না। কারণ এখান থেকে গরু কিনে নিয়ে গিয়ে ওইখানে গ্রাহক পাই না।’

বর্তমানে রংপুরের প্রসিদ্ধ হাটগুলোতে স্থানীয় খামারি ও ক্ষুদ্র গরু ব্যবসায়ীরা কোরবানির পশু তোলা শুরু করেছে। এসব হাটে গরু-ছাগলের পাশাপাশি মহিষ ও ভেড়া রয়েছে। তবে আশানুরূপ বেচাকেনা শুরু না হওয়ায় হতাশায় আছে ব্যবসায়ীরা। হাটগুলোতে এখন ক্রেতার চেয়ে পশুর সংখ্যাই বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবছরের মতো এবারও রংপুরে কোরবানির পশু বিক্রির জন্য তারাগঞ্জ হাট, বদরগঞ্জ হাট, বড়াইবাড়ী হাট, লালবাগ হাট, বুড়িরহাট, চৌধুরানী হাট, নজিরের হাট, নিসবেতগঞ্জ হাট, পাওটানা হাট, কান্দির হাট, দেউতি হাট, টেপামধুপুর হাট, মিঠাপুকুর হাট, বৈরাতি হাট, জায়গীর হাট, শঠিবাড়ী হাট, বালুয়া হাট, মাদারগঞ্জ হাট, ভোবাড়ী হাটসহ রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার পশুর হাটগুলোতে গরু-ছাগল বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে এসব হাটে স্বাভাবিকভাবে যে গরুর আমদানি হয়, তার চেয়ে এবার কিছুটা বেশি রয়েছে। কিন্তু এখনো ক্রেতারা হাটে সেভাবে ভেড়েনি।

হাট ইজারাদার বলছেন, বন্যাকবলিত পাশের এলাকার খামারিরা পশুখাদ্যের সংকটে দ্রুত তাদের পশু বিক্রি করতে হাটে তুলছে। তাই পশুর আমদানি তুলনামূলক বেশি হলেও ক্রেতার উপস্থিতিতে এখনো সরব হয়ে ওঠেনি হাটগুলো। ক্রেতারা বলছে, হাট জমে ওঠার আগে গরু কিনলে দামে কিছুটা লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু এবার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনো অনেক এলাকায় পানি রয়েছে। এ কারণে আগেভাগে গরু কিনে কোথায় রাখবে, এ নিয়ে চিন্তিত তারা। অন্যদিকে পশুর মালিকরা বেশি দাম পাওয়ার আশায় বসে আছে। তাদের মতে, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সামনে আরো অনেক হাট পাওয়া যাবে। তখন বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে। তবে বিক্রেতাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছে, ঈদের আগে পশুর দাম কমেও যেতে পারে।

রংপুর নগরের আরেকটি পশুর হাট বুড়িরহাটে বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, ঈদ ঘনিয়ে এলেও কোরবানির পশু তেমন একটা কেনাবেচা হয়নি। এলাকার গরু ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমান জানান, এ বছর ১৫ দিন আগে ৬৭ হাজার টাকা লগ্নি করে দুটি গরু কিনেছিলেন লাভের আশায়। কিন্তু তিন হাট ঘুরে ১০ হাজার টাকা লোকসান দিয়ে বিক্রি করেছেন। তিনি জানান, গত বছরের চেয়ে হাটে পশুর আমদানি বেশি।

মন্তব্য