kalerkantho

ভূমিহীন সেলিমের ভূমি গবেষণা

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি   

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভূমিহীন সেলিমের ভূমি গবেষণা

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ভূমি সমস্যা সমাধানে ভূমি কার্ড আবশ্যক। তাই দীর্ঘদিন ধরে ভূমি সমস্যা সমাধানে নিজ বাড়িতে গবেষণা করছেন ভূমিহীন সেলিম মিয়া। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে গত সাত বছরে খুন হয়েছে প্রায় এক হাজার ১৫০ জন। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। দৈনিক পত্রিকা পড়ে এ হিসাব সংগ্রহ করেছেন সেলিম মিয়া (৫১) নামের এক ব্যক্তি। প্রতিনিয়ত সেই সব পত্রিকার কাটিং সংরক্ষণ করে গড়ে তুলেছেন সংগ্রহশালা। ভূমি নিয়ে কেন এত সহিংসতা, তা গবেষণা করে তৈরি করেছেন একটি প্রস্তাবনা। এ প্রসঙ্গে সেলিম মিয়া মনে করেন, ‘ভূমি নিয়ে বিষয়ভিত্তিক কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা চালু ও ভূমি মালিকদের মধ্যে ডিজিটাল ভূমি কার্ড বিতরণ করলে এসব সমস্যা থাকবে না।’

সেলিম মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার মাস্টারপাড়া এলাকায়। তাঁর জন্ম কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের সাতালস্কর গ্রামে। ১৯৯৫ সালে তিস্তা নদীর করালগ্রাসে বসতভিটা হারিয়ে সুন্দরগঞ্জে এসে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন তিনি। এখানে এসে সামান্য বেতনে একটি এনজিওতে চাকরি নেন। একসময় সংসারে আয় বলতে ছিল জমির ফসল। সেই জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন এইচএসসি পাস সেলিম মিয়া। সামান্য বেতনে সংসার চলে না। তাই এনজিওর চাকরি ছেড়ে দেন। বেছে নেন মামলার এজাহার লেখার কাজ। ২০০৬ সাল থেকে অদ্যাবধি মামলা লেখার কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

এজাহার লিখতে গিয়ে দেখেন, ভুক্তভোগীদের মামলার বেশির ভাগই ভূমি সমস্যা নিয়ে। একই ব্যক্তি একই জমি বারবার বিক্রি করছে। কিন্তু তা ধরতে না পারায় নতুন করে আরেক ব্যক্তি কিনে নিচ্ছে। ফলে ভূমির মালিকানা নিয়ে খুন ও সংঘর্ষের ঘটনা এবং তা মামলা পর্যন্ত গড়াচ্ছে। আর এসব মামলার বেশির ভাগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের ভোগান্তির শেষ থাকে না! তাই এসব জটিলতা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে থাকেন তিনি। শুরু করেন ভূমি সমস্যা সমাধানে গবেষণা। ভাড়া বাসার একটি কক্ষের নাম দেন ‘গবেষণাগার’। তিনি পত্রিকার একজন নিয়মিত পাঠক। প্রতিদিন কাজের ফাঁকে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সাপ্তাহিক, মাসিক ও দৈনিক পত্রিকা খুঁটে খুঁটে পাঠ করেন। খুঁজতে থাকেন সারা দেশে ভূমি নিয়ে বিরোধসংক্রান্ত খবর। ভূমি নিয়ে বিরোধে পত্রিকায় প্রকাশিত আহত ও নিহতের খবরগুলোর তারিখসহ কাটিং রাখেন। এভাবে ২০১৩ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রিকার ১০০ কাটিং সংরক্ষণ করেন। এতে দেখা যায়, ভূমি নিয়ে বিরোধের জেরে খুন হয়েছে প্রায় এক হাজার ১৫০ জন মানুষ, আহত হয়েছে কয়েক হাজার।

সেলিম মিয়া বলেন, ‘নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জায়গা-জমি পরবর্তীকালে চর আকারে জেগে উঠলে এবং ভাসমানরা এলাকায় ফিরে এলেও জমির সীমানাসংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা সমস্যায় পড়ে। এরপর শুরু হয় মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ, হাঙ্গামা ও খুনের মতো নৃশংস ঘটনা। এ যেন ‘জোর যার মুল্লুক তার’, ‘লাঠি যার মাটি তার’। এসব থেকে বাঁচতে অবশ্যই ডিজিটাল ভূমি কার্ড ব্যবহার করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি নিজের জন্য এ কাজটি করছি না, করছি দেশের মানুষের কল্যাণে। সরকার বিষয়ভিত্তিক কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা চালু ও ভূমি মালিকদের মধ্যে ডিজিটাল ভূমি কার্ড বিতরণের ব্যবস্থা চালু করলেই ভূমি নিয়ে বিরোধ থাকবে না। ভূমির জন্য কাউকে জীবন দিতে হবে না। দাবি বাস্তবায়িত হলে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।

মন্তব্য