kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

উচ্ছেদ অভিযান শুরু

দখলে প্রাণহীন সন্ধ্যা

ওমর আলী সানি, আগৈলঝাড়া (বরিশাল)   

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দখলে প্রাণহীন সন্ধ্যা

বরিশালের আগৈলঝাড়ার পয়সারহাটের পশ্চিমপারে সন্ধ্যা নদী দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে ভবন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরিশালের একসময়ের খরস্রোতা সন্ধ্যা নদী দখলে-দূষণে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আগৈলঝাড়া উপজেলার পয়সারহাট এলাকায় তা ভয়াবাহ রূপ নিয়েছে। নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় তিন বছর ধরে ঢাকা-পয়সারহাট লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। সন্ধ্যা নদীর পয়সারহাট বন্দর ও পয়সারহাট সেতুর দুই পাশেই অবৈধ দখলদাররা নির্মাণ করেছে পাকা স্থাপনাসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

এদিকে এ এলাকায় গতকাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলেও টনক নড়ছে না প্রভাবশালী দখলদারদের। তারা আগের মতোই স্বাভাবিক। তাদের কাছে এটি কোনো বিষয়ই নয়। প্রশাসন দু-চারজনকে জরিমানা করেই ক্ষান্ত হবে বলে মনে করে তারা। তবে এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল চন্দ্র দাস বলেন, উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে মাত্র। সম্পূর্ণ দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।

জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিপুল চন্দ্র দাস বুধবার বিকেলে পয়সারহাট এলাকায় সন্ধ্যা নদীর পূর্ব পারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে যুবলীগ নেতা অবৈধ দখলদার জেবারুল খান ও জুয়েল তালুকদারকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। পাশাপাশি তিনি চিহ্নিত অবৈধ দখলদার স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী বখতিয়ার এন্টারপ্রাইজের মালিক বাদশা বখতিয়ারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেন। অভিযুক্তরা নদী ভরাট করে বরিশালের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এম খান এন্টারপ্রাইজকে ভাড়া দিয়ে আসছিল। আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে ভরাট করা নদীর জায়গায় রাখা বালু ও পাথর সরিয়ে নিজ খরচে নদী খনন করে দেবে বলে আদালতে মুচলেকা দেন তারা। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রইচ সেরনিয়াবাত, বাকাল ইউপি চেয়ারম্যান বিপুল দাস প্রমুখ।

স্থানীয় লোকজন, দখলদার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যা নদীর আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট এলাকায় শত বছর পূর্বে গড়ে ওঠে ব্যবসায়ী বন্দর। নদীর তীর ঘেঁষে দুই পারে সহস্রাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে পয়সারহাট-ঢাকা চারটি বড় লঞ্চ চলাচল করে আসছিল। কিন্তু দখলে-দূষণে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় তিন বছর ধরে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। 

পয়সারহাট বন্দরের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন সিকদার, মেহেদী হাসান, ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নদীটি খনন ও অবৈধ দখলদারদের পুরোপুরি উচ্ছেদের দাবি জানান তাঁরা।

পয়সারহাট বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল খালেক চকিদার বলেন, ‘নদীটি মরে যাওয়ায় আমরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ঘাটে লঞ্চ না আসায় ট্রলারে করে বৈঠাঘাটা থেকে মালপত্র পরিবহনে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হচ্ছে।’

স্থানীয়রা জানান, একসময় নদীটি ১২০০-১৪০০ ফুট প্রশস্ত ছিল। বর্তমানে আছে মাত্র ২০০-২৫০ ফুট।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর দুই পাশে বাঁধ দিয়ে দখল করায় দিন দিন নদীটি ছোট হয়ে আসছে। সেতুর গোড়ায় পশ্চিম পাশে বিশাল চর জেগেছে। নদীটি সংকুচিত হয়ে প্রশস্ততা কমে গেছে।

প্রভাবশালী দখলদারদের মধ্যে রয়েছেন বাগধা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাউস বক্তিয়ার, বাগধা ইউনিয়ন ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর জব্বার, পয়সারহাট গ্রামের আবুল সিকদার প্রমুখ। তা ছাড়া পুরান খেয়াঘাটের পূর্ব পাশে নদী দখল করে ঘর তুলে হোটেল ব্যবসা করছেন পয়সারহাট গ্রামের বি এম সালাউদ্দিন। পশ্চিম পারে পয়সারহাট বন্দরের লঞ্চ টার্মিনালের পেছনে নদীর মধ্যে বহুতল পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার ওরফে বাদশা হাওলাদার। সন্ধ্যা নদীর বাগধা বাজার এলাকায় নদীর মধ্যে পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন একাধিক প্রভাবশালী। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো মাথাব্যথা নেই।

এ ব্যাপারে বাগধা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাউস বক্তিয়ার বলেন, ‘আমি নদীর জায়গা দখল করিনি। আমার জমি ভেঙে নদীতে বিলীন হওয়ায় তা ভরাট করেছি।’ কাওছার হোসেন ও মোনাসেফ হোসেন নদী দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তাঁরা নদীর জমি দখল করেননি। ক্রয়সূত্রে জমি ভোগদখল করছেন।

বহুতল ভবন নির্মাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আবুল বাশার বলেন, ‘নদীর জায়গা নয়, নিজস্ব জমিতে ভবন নির্মাণ করেছি।’ তবে বি এম সালাউদ্দিন দখলের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এখানে দীর্ঘদিন ধরে দোকানঘর নির্মাণ করে ব্যবসা করছি। এতে নদীর কোনো ক্ষতি হয়নি।’ 

এদিকে নদী কমিশন গত ১ মার্চের মধ্যে দখলদারদের তালিকা তৈরির জন্য নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সময়ে পেরিয়ে গেলেও সন্ধ্যা নদী দখলের তালিকা সম্পন্ন করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন। এ ব্যাপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল চন্দ্র দাস বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা হাতে পেয়েছি। তবে যেকোনো নদী পরিমাপ করে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দখলদারদের তালিকা করা সঠিক হবে না। নদী পরিমাপ করা খুবই কঠিন একটি ব্যাপার। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা ভূমি অফিসের সমন্বয় দরকার। তবে শিগগিরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে সন্ধ্যা নদী পরিমাপ করে দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন করা হবে। আর পর্যায়ক্রমে দখলদারদের উচ্ছেদ করে নদী দখলমুক্ত করা হবে।’

 

 

মন্তব্য