kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

খননের মাটি ফেলা হচ্ছে নদীতেই কমছে আত্রাইয়ের প্রশস্ততা

রেজাউল করিম রেজা, নাটোর   

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খননের মাটি ফেলা হচ্ছে নদীতেই কমছে আত্রাইয়ের প্রশস্ততা

নাটোরের গুরুদাসপুরে আত্রাই নদের খনন করা মাটি আবার নদের মধ্যেই ফেলা হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

নাটোরের গুরুদাসপুরে আত্রাই নদ খননের নামে চলছে এলাহী কাণ্ড। নাব্যতা সৃষ্টির নামে নদী কেটে খালে পরিণত করা হচ্ছে। নদীর কাটা মাটি আবার নদীতেই রাখা হচ্ছে। ফলে বৃষ্টি অথবা বর্ষা মৌসুমে সেই মাটিতে আবার নদী ভরাট হয়ে যাবে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খননের পুরো টাকাটাই গচ্চা যাবে।

জানা যায়, আত্রাই ও গুমানী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) গুরুদাসপুর উপজেলার যোগেন্দ্রনগর রাবার ড্যাম থেকে পাবনার এরশাদনগর পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার নদী খননের উদ্যোগ নেয়। এ কাজে ব্যয় ধরা হয় ৪২ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ওয়েস্টার্ন ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে।

সম্প্রতি নদীতীরের বিল বিয়াস এবং বিলকাটরী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আত্রাই নদে এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে মাটি খনন করছে শ্রমিকরা। খননকৃত মাটি নদের কাটা অংশের দুই পাশে স্তূপাকারে রাখা হচ্ছে। সেখানে কথা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাবকন্ট্রাক্টর আলম খানের সঙ্গে। তিনি জানান, ঢাকা থেকে মেশিনপত্র এনে তিনি মাটি কাটছেন। ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৮০ ফিট প্রশস্ত এবং ১২-১৩ ফুট গভীর করে মাটি কাটা হচ্ছে। খনন করা মাটি নদীর মধ্যে রাখা হচ্ছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদার যেভাবে বলছেন, সেভাবেই কাজ করছি। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, এভাবে মাটি থাকলে বৃষ্টি বা বর্ষায় আবার নদী ভরাট হয়ে যাবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একাংশের সাইড ম্যানেজার মফিজুল ইসলাম দাবি করেন, দরপত্রে খননের জায়গা থেকে ৩৮-৪০ ফিট দূরত্বে মাটি ফেলার নির্দেশ রয়েছে।

বিলকাটর গ্রামের জাহেদ আলী বলেন, ‘নদীর মধ্যে মাটি কেটে নদীতেই রাখা হচ্ছে—এমন কাণ্ড কখনোই দেখিনি।’ বিল বিয়াস গ্রামের ময়নাল হোসেন বলেন, ‘আমরা নদী কাটার কথা শুনে আনন্দিত হয়েছিলাম। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকবে, আমাদের সেচকাজসহ নদীতে নৌকা চলবে। কিন্তু মাটি কাটার ধরন দেখে বুঝতে পারছি আমাদের কোনো আশাই পূরণ হবে না। নদী কেটে খালে পরিণত করা হচ্ছে।’ একই গ্রামের আল আমিন বলেন, ‘নদী কেটে এমনভাবে মাটি রাখা হচ্ছে যে আমরা নদীতেই নামতে পারছি না। বতর্মানে নদী ১৮০ থেকে ২২০ ফুট প্রশস্ত। অথচ কাটা হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ ফুট মাত্র। এমন কাজ আমরা আশা করিনি।’ মামুন হোসেন নামের এক যুবক বলেন, ‘সরকারের উন্নয়নের অংশ হিসেবে নদী খনন করা হচ্ছে। অথচ নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা হরিলুট হচ্ছে।’ তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন।

এ ব্যাপারে নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘মাটি কেটে খাল বানানোর কথা শুনে আমি সরজমিনে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাই। আমি নিজের চোখে দেখেছি নদী কেটে খাল বানানো হচ্ছে। ফলে আমি নদী কাটা বন্ধের নির্দেশ দিই। পরে বিআইডাব্লিউটিএর প্রকল্প পরিচালক এবং অতিরিক্ত সচিব আমাকে ফোনে জানান তাঁরা নদী ৮০ থেকে ১২০ ফুট প্রশস্ত করে খনন করবেন এবং নদীর মাটি তুলে অন্যত্র সরিয়ে বা নদীর পাড়ে রাখা হবে। তাই তাঁদের কাজ করার বিষয়ে মত দিয়েছি।’

নদী রক্ষা কমিটির গুরুদাসপুর উপজেলা সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, তিনি এলজিইডির প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে নদী খননকাজ পরিদর্শন করেছেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে খননকাজ যথাযথভাবে করা হচ্ছে না।

এলজিইডির উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, সাধারণ দৃষ্টিতেই বোঝা যায় মাটি সরিয়ে না নিলে এর সুফল কেউ পাবে না। নদীর ভেতর থেকে মাটি অপসারণ করতেই হবে।

চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়কারী ও বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব মিজানুর রহমান বলেন, ‘নদী খননে অনিয়ম হলে কোনো সুফল আসবে না। নদীর মাটি পারের ওপর না ফেললে গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়বে না। এতে বরং দখলদারদের সুবিধা হবে। আর প্রকল্পের প্রকৌশলীদের পকেট ভারী হবে।’

বিআইডাব্লিউটিএর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সাইদুর রহমান জানান, নদী খননের কোনো মাটি নদীর মধ্যে থাকবে না। সব সরিয়ে নেওয়া হবে। এতে নদী প্রশস্ত হবে এবং গভীরতাও বাড়বে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা