kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

মির্জাপুরে নদীর চর দখল করে ইটভাটা

মো. এরশাদ মিঞা, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)   

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মির্জাপুরে নদীর চর দখল করে ইটভাটা

মির্জাপুরের আজাগানা ইউনিয়নের বংশাই নদের চর দখল করে অবৈধভাবে ইটভাটা স্থাপন করে চলছে রমরমা ব্যবসা। এতে নদের গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ার পাশাপাশি প্রশস্ততাও কমে আসছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় একটি প্রভাবশালী মহল নদী দখল করে অবৈধভাবে পাঁচটি ইটভাটা গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ার পাশাপাশি প্রশস্ততাও কমে আসছে। এভাবে বছরের পর বছর ভাটা চললেও প্রশাসন নির্বিকার বলে জানা গেছে।

এলাকাবাসী জানায়, এ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলের আজাগানা ইউনিয়নের বংশাই নদীর বেলতৈল ও চিতেশ্বরী এলাকায় চর জেগে উঠলে এক যুগ আগে পাঁচটি ইটভাটা স্থাপনের মাধ্যমে বহাল তবিয়তে ব্যবসা করে চলছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এর মধ্যে বংশাই নদীর চরে নির্মিত হাঁটুভাঙা সেতুর পশ্চিম পাশে দুটি, পূবর্ পাশে তিনটি ভাটা স্থাপন করা হয়েছে। ভাটাগুলো হলো এসবিএম-১, এইচবিএম-১, কেইউবি, হাজী ব্রিকস ও এবিএম।

নদীর চর দখল করে ইটভাটা চালিয়ে গেলেও সরকারকে কোনো রাজস্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। হাঁটুভাঙ্গা সেতুর পশ্চিম পাশে স্থাপিত হাজী ব্রিকস ও এবিএম ভাটা দুটির চিমনি মালিকাধীন জমিতে নির্মিত হলেও ইট তৈরি, শুকানো, মাটির স্তূপ ও পোড়া ইট নদীর চর দখল করে রাখা হচ্ছে। এতে ভাটা দুটি আনুমানিক ছয় একর নদীর চর দখল করেছে। অন্যদিকে সেতুর পূর্ব পাশে নদীর দক্ষিণ পারে গড়ে ওঠা এসবিএম-১, এইচবিএম-১, কেইউবি ভাটা তিনটি পুরোপুরি চর দখল করে গড়ে উঠেছে বলে এলাকাবাসী জানায়। এতে ঐতিহ্যবাহী বংশাই নদীর প্রশস্ততা কমে আসছে।

এইচবিএম ইটভাটা মালিকের মেয়ের জামাই ও ভাটার ম্যানেজার বাবু জানান, গোড়াই ও আজগানা ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তির জমি ভাড়া নিয়ে ভাটা চালানো হচ্ছে। তবে ভাটার উত্তর পাশে নদীর কিছু জমি থাকতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি।

মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজগর হোসেন ছুটিতে থাকায় এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের সার্ভেয়ার সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, উপজেলার গোড়াই ও আজগানা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বংশাই নদীর দুই পাশে জেগে ওঠা চর দখল করে কয়েকজন ব্যক্তি ভাটা স্থাপন করে ব্যবসা করছে। তবে ওইসব ভাটা থেকে সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মালেক বলেন, নদ-নদী দেশের জাতীয় সম্পদ। যারা নদী ও তার আশপাশ দখল করে অবৈধভাবে ইটভাটা গড়ে তুলেছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ভাটা মালিকদের জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে নদীর চর দখল ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১০৫০ একর জমিতে গড়ে উঠেছে শতাধিক  ইটভাটা। ভাটা মালিকদের বেপরোয়া আগ্রাসনে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে উপজেলার উর্বর কৃষিজমি। এতে ভাটার আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় আবাদি জমিতে ফসল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে কৃষকরা জানিয়েছে।

উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলের সরকারি বনসংলগ্ন এলাকায় টিলা (উঁচু স্থান) কেটে প্রায় ১০৫টি ভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব ভাটায় ৮-১৬ একর পর্যন্ত জমি নেওয়া হয়েছে। সে হিসেবে প্রায় ১০৫০ একর জমি ভাটার দখলে রয়েছে। তা ছাড়া ওই সব ভাটায় ইট প্রস্তুত করতে যে পরিমাণ মাটি প্রয়োজন তা পাশের আবাদি জমি থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে। এসব ভাটা প্রত্যক্ষভাবে কৃষিজমি ধ্বংস ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে। এ ছাড়া এসব ভাটার দূষণ ও বিরূপ প্রভাবে আরও চার গুণ জমির ফসলহানি হচ্ছে। ভাটা স্থাপনে কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের কদিম দেওহাটা গ্রামের কৃষক আজম খান (৫৬), আমজাদ হোসেন (৬০) ও ইফনুস আলী (৫৮) জানান, আবাদি জমিতে যত্রতত্র ইটভাটা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ভাটার আশপাশের জমিতে ফসলের ফলন কমে এসেছে।

মির্জাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে আমাদের অফিস থেকে শুধু জমির শ্রেণির প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। আমাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় এর বাইরে কিছুই করতে পারি না।’

পরিবেশ অধিদপ্তর টাঙ্গাইলের উপপরিচালক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলায় কৃষিজমিতে ১০৫টি ভাটার মধ্যে মাত্র ৬৭টি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে। অন্যদের কোনো ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তবুও কিভাবে এসব ভাটা চলছে, তা ভেবে অবাক হচ্ছি।’ বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আনবেন বলেও জানান তিনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা