kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পানির দরে নদী ইজারা

‘জাল যার, জলা তার’ নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে প্রশাসন

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজশাহীর দুর্গাপুরে ঐতিহ্যবাহী হোজা নদীতে জেলেদের মাছ শিকার করতে দিচ্ছেন না একদল প্রভাবশালী। জীবিকার প্রয়োজনে সেখানে মাছ শিকার করতে নামলেই তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৫ জন জেলের নামে মামলা করা হয়েছে। রাজশাহী নগরীর ফরিদুল্লাহ ওরফে ফরিদুল নামের এক ব্যক্তি এ মামলা করেন। তাঁর দাবি, জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে নদী ইজারা নিয়েছেন তিনি। তাই সেখানে অন্য কারোর মাছ ধরার অধিকার নেই।

এ নিয়ে স্থানীয় জেলেদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁরা দ্রুত হোজা নদীর ইজারা বাতিল করে সাধারণ জেলেদের মাছ শিকারের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আর তা না হলে দুর্গাপুরের অন্তত ২৫টি গ্রামের জেলে ও সাধারণ মানুষ তীব্র আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন।

দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্র মতে, প্রায় চার বছর আগে হোজা নদীটি ইজারা দেওয়া হয় রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে। নদীর পলাশবাড়ী থেকে হরিপুর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা পানির দরে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে নদীতে বাঁশের ফালি দিয়ে ঘের করে মাছ শিকার করছেন ইজারাদার ফরিদুল ও তাঁর লোকজন। আর নদীতে মাছ শিকারে নামতে গেলেই জেলেদের নামে দেওয়া হচ্ছে মামলা।

উপজেলার পলাশবাড়ী গ্রামের জেলে মাহাবুব রহমান বলেন, ‘গত চার বছর ধরে নদীতে আমরা নামতে পারছি না। নামতে গেলেই ফরিদুলের লোকজন নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।’

একই গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একদিন নদীতে মাছ ধরার কারণে অন্তত ১৫ জনের নামে মামলা করেছে ফরিদুল। এরপর আর মামলার ভয়ে কেউ নদীতে নামতে সাহস পাচ্ছে না। মামলায় আমাকেও আসামি করা হয়েছে। কিন্তু আমরা এখন কী করে খাব?’

দুর্গাপুরের সিংড়া গ্রামের বাহার আলী বলেন, ‘নদী লিজ দিয়ে জেলেদের সঙ্গে তামাশা করছে প্রশাসন। তারা ‘জাল যার, জলা তার’ নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। আমরা লিজ বাতিলের আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু তার পরেও লিজ বাতিল করা হয়নি। নদী লিজ দিয়ে জেলেদের মারার পাশাপাশি নদীকেও মেরে ফেলা হচ্ছে।’

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র মতে, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী উন্মুক্ত জলাশয় ইজারা দেওয়া যাবে না। উন্মুক্ত জলাশয়ে কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে মাছ চাষও করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতি ব্যবহার হবে। কিন্তু সেই নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে রাজশাহী জেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ২০১৫ সালে হোজা নদী ইজারা নেওয়া হয়েছে। এরপর প্রতিবছর ইজারার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে সেখানে মাছ ধরা থেকে প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। দুর্গাপুর উপজেলা সদরের মাঝ দিয়ে প্রবহমান এ নদীতে মাছ শিকার করতে না পেরে কয়েক শ দুস্থ, অসহায়, হতদরিদ্র মৎস্যজীবী কষ্টে দিন যাপন করছেন।

জনশ্রুতি রয়েছে হোজা নদীর উজান খরসি অংশে ব্রিটিশ আমলে একদল সেনা নদী পার হতে গিয়ে কয়েকটি ঘোড়াসহ ডুবে মারা যান। এর পর থেকে প্রতিবছরের পহেলা কার্তিক এখানে ঘোড়াদহ মেলা বসে। অথচ ঐতিহ্যবাহী এ নদীটি ইজারা নেওয়ার পর কোথাও কোথাও বাঁধ দিয়ে পুকুরের মতো তৈরি করে মাছ চাষ করছেন প্রভাবশালী সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা।

দুর্গাপুর উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে আরো জানা গেছে, হোজা নদীর বিশাল একটি অংশ ইজারা নেওয়ার জন্য ২০১৪ সালে দুর্গাপুর উপজেলার মৎস্যজীবী সমিতির পক্ষ থেকে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে নদীর প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নামমাত্র টাকায় ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজশাহী নগরীর ফরিদুল ইজারা পান। পরে তিনি সাবলিজ দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগকর্মী আব্দুর রহমান, ছিদ্দিক হোসেন, আব্দুল হান্নানসহ আরো কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে। এরপর তাঁরা নিজেদের অংশে বাঁশের বেড়া, বাঁধ কিংবা জাল দিয়ে ঘিরে রেখে নদীর মাঝে পুকুরের মতো তৈরি করে মাছ চাষ করে আসছেন।

সাবলিজ গ্রহণকারী আবদুর রহমান বলেন, ‘সরকারকে টাকা দিয়ে লিজ নিয়েই নদীতে মাছ চাষ করছি। তাই এখানে অন্য কেউ আর মাছ ধরতে পারবে না।’ এ ব্যাপারে ইজারাদার ফরিদুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নদীটি কিভাবে লিজ দেওয়া হয়েছে—তা আমার জানা নাই। তবে যেভাবেই হোক, জেলেদের নদীতে নামতে দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে নদীপারের জেলেরা মানবেতর জীবন যাপন করবেন। এখানে জেলেদেরই তো মাছ ধরার কথা। কাজেই জেলেদের নদী, জেলেদের কাছেই ফিরে দেওয়া প্রয়োজন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন সরকার বলেন, ‘নদীটি লিজ দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি। তবে জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দেওয়া হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা