kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

রাঙামাটি আওয়ামী লীগ ও জনসংহতির সম্পর্ক

ভালোবাসা থেকে ক্রোধ

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভালোবাসা থেকে ক্রোধ

এ ধরনের পোস্টার শোভা পাচ্ছে রাঙামাটি শহরের দেয়ালে দেয়ালে। ছবি : কালের কণ্ঠ

আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে সৌহার্দ্য সম্পর্কের ওপর ভর করে ১৯৯৭ সালে অস্ত্র সমর্পণ করেছিল শান্তি বাহিনী, ২০১৭ সালে তার সব শেষ হয়ে গেছে। যে চুক্তির মাধ্যমে শান্তি বাহিনী থেকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র নামে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নেমেছিল গেরিলারা, সেটি নতুন বছরে দুই দলের সম্পর্কের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চুক্তি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, এ নিয়ে দুই দলের পরস্পরবিরোধী দাবি আর কর্মসূচির জেরে ধীরে ধীরে ভালোবাসার সম্পর্ক জিঘাংসায় রূপ নিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং দলত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে এর প্রকাশ ঘটেছে।

শান্তিচুক্তি

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তিচুক্তি নামে পরিচিত) স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্যবাসীর পক্ষে জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও শান্তি বাহিনীর কমান্ডার জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা সন্তু এবং সরকারের পক্ষে তৎকালীন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মাধ্যমে ২৪ বছরের গেরিলাজীবনের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে এক হাজার ৯০০ গেরিলা। ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয় দেড় লাখ উদ্বাস্তুকে। যাদের সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসন করা হয়, দেওয়া হচ্ছে রেশন সুবিধা। গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, যার চেয়ারম্যান সন্তু। পুনর্গঠিত হয় পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ, পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্স। বাস্তবায়ন শুরু হয় চুক্তির বিভিন্ন ধারা-উপধারা।

ক্রমে বিষফোড়া

চুক্তি স্বাক্ষরের তিন বছর পর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়নি জনসংহতি সমিতি। প্রকাশ্যে নির্বাচন বর্জন করে নীরবে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয় বিএনপির প্রার্থী মনি স্বপন দেওয়ানের পক্ষে। নির্বাচনে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ। এই অসহযোগিতা দুই দলের সম্পর্কে প্রথম বিষফোড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া অনেকটা ঢিমেতালে চলে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সরাসরি অংশ নেয় জনসংহতি সমিতি এবং পরাজিত হয়। কিন্তু জয়ী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শুরু করে চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ। পুরো প্রক্রিয়াটি চলে ধীরলয়ে। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন শুরু করে জনসংহতি সমিতি। দুই দলের পুরনো সম্পর্ক আর আগের মতো এগোয়নি। ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারও পৃথকভাবে মুখোমুখি হয় দুই দল। বিএনপিহীন নির্বাচনে জনসংহতির হাতির কাছে পরাজিত হয় নৌকা। এই পরাজয়ে জনসংহতির সশস্ত্র তত্পরতা ও ভোটারদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। দূরত্ব বাড়তে শুরু করে পুরনো দুই বন্ধুর।

প্রীতি হারাল বিবাদে

২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ও জনসংহতি সমিতির সম্পর্ক স্বাভাবিক লয়ে এগোয়নি। আওয়ামী লীগ চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি পূর্ণ, ১৫টি আংশিক বাস্তবায়ন এবং বাকিগুলো বাস্তবায়নাধীন বলে দাবি করে। তবে জনসংহতি সমিতির দাবি, মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে মৌলিক ধারা একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এমন অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্যে ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তির দুই দশক পূর্তিতে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ‘পাহাড়ে আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ার করেন সন্তু। এর দুই দিন পর থেকে রাঙামাটির জুরাছড়িতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যা, বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাসেল মারমাকে হত্যাচেষ্টা, রাঙামাটি শহরে মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ঝর্ণা খীসাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের পাহাড়ি নেতাকর্মীদের মারধর, হুমকি এবং দলত্যাগে বাধ্য করা হয়। ডিসেম্বরে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগ ছাড়তে বাধ্য হয় প্রায় পাঁচ শতাধিক পাহাড়ি। প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের কথা বললেও হুমকির কারণে দল ছাড়ছে বলে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে স্বীকার করে। যদিও জনসংহতি সমিতি এই দাবি বরাবর অস্বীকার করে আসছে।

তত্পর আওয়ামী লীগ

একের পর এক নেতাকর্মীকে হত্যার প্রতিবাদে হঠাৎ করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় দীর্ঘদিন কার্যত চুপচাপ থাকা আওয়ামী লীগ। জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সন্ত্রাসের প্রতিবাদে রাঙামাটি জেলাজুড়ে হরতাল পালন এবং নিয়মিত কর্মসূচি দিতে শুরু করে। সমিতির নৃশংসতার ছবিসহ বের করা হয় রঙিন পোস্টার। এসব পোস্টারে সমিতির বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র ধারণের অভিযোগ আনা হয়। এ পোস্টারের কারণে জেলাজুড়ে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। হতাহতদের রক্তাক্ত ছবিও আছে পোস্টারে। সাধারণ মানুষ পোস্টার দেখে জনসংহতির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায় সমিতি। এরই মধ্যে এই পোস্টারের বিরুদ্ধে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে সংগঠনটি।

গত রবিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা পাঠান এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘জেএসএস সন্ত্রাসীদের এ কেমন নৃশংসতা! শিরোনামে একটি পোস্টার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পোস্টারে গত ৫ ডিসেম্বর বিলাইছড়িতে রাসেল মারমাকে পাশবিক ও নিষ্ঠুর নির্যাতন। জুরাছড়িতে অরবিন্দু চাকমাকে খুন এবং ৬ ডিসেম্বর ঝর্ণা চাকমাকে পাশবিক হামলার ঘটনায় জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করা হয়।’ এর প্রতিবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগ এনে জনমতকে বিভ্রান্ত ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রমূলক পোস্টার প্রচার ও প্রকাশে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।’ বিবৃতিতে ‘এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক পোস্টার প্রত্যাহার করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগকে আহ্বান’ জানিয়েছে।

এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুছা মাতব্বর বলেন, ‘জেএসএসের ব্যাপক অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির পরও আমরা দীর্ঘদিন সব সহ্য করে গেছি। একের পর এক নেতাকর্মীকে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও দলত্যাগে বাধ্য করার পর স্বাভাবিকভাবে আমরা চুপ করে থাকতে পারি না। আমরাও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবিতে কর্মসূচি নিয়েছি। জনমত গঠন করতে পোস্টারিংসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

 

 

মন্তব্য