kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

ট্রেনের দুই রূপ

একটা ‘রাজকীয়’ অন্যটা ‘মফিজ’

পার্বতীপুর

আবদুল কাদির, পার্বতীপুর (দিনাজপুর)   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একটা ‘রাজকীয়’ অন্যটা ‘মফিজ’

দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন। ব্রড গেজ লাইনে চলছে নতুন ট্রেন (বাঁয়ে)। মিটার গেজ লাইনে এখনো চলছে লক্কড়-ঝক্কড় ট্রেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘একটি ট্রেন ঝকঝকে নতুন, এটা রাজকীয়। কিছুুটা দূরে আরেকটি পুরনো কচুপাতা রঙের, এটা মফিজ ট্রেন। এক স্টেশনে দুই রূপ।’ দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলস্টেশনে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সম্প্রতি এ কথাগুলো বলেন মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হোসেন। তিনি আইনজীবী ওমর ফারুকের সহকারী। তোজা মুহুরি নামে সবাই তাঁকে চেনে। পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর শহরে সপ্তাহের পাঁচ দিন ট্রেনে যাতায়াত করেন তিনি।

স্থানীয়রা জানায়, একসময় পার্বতীপুর রেলজংশন দেখার জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন আসত। তারা স্টেশনের মূল ভবন বা অপারেশনাল ভবন ঘুরে ঘুরে দেখত। কিভাবে তারবার্তার সাহায্যে সংবাদ আদানপ্রদান করা হতো, কিভাবে সংকেত পাঠিয়ে লাইন ক্লিয়ার দিয়ে ট্রেন আনা নেওয়া করা হতো। পুরো স্টেশনে তখন চলত নানা কাজ। দেখা যেত ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে ইয়ার্ডে শত শত মালবাহী বগি, যাত্রীবাহী কোচ। আরো দেখা যেত, স্টেশনে প্রবেশকালীন ট্রেন, লাল শার্ট পরা কুলিদের দৌড়ঝাঁপ। স্টেশনের নানা স্থাপনা, যাত্রী ওঠানামা দেখে বাড়ি ফিরে গিয়ে স্বজন আর পরিচিতজনদের কাছে সেসব মন খুলে বলত মানুষ।

ঐতিহ্যবাহী পার্বতীপুর রেলস্টেশনটি স্থাপিত হয় ব্রিটিশ আমলে, ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে। ১৩৯ বছর আগের এ জংশনে আছে পাঁচটি প্ল্যাটফর্ম। এর মধ্যে ১ ও ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আছে তিনটি রেললাইন। তিনটিই ব্রড গেজ। সম্প্র্রতি এর একটি লাইনকে ডুয়াল গেজে রূপান্তর করা হয়েছে। তিনটি লাইনে চিলাহাটি-পার্বতীপুর-রাজশাহী, চিলাহাটি-পার্বতীপুর-খুলনা, চিলাহাটি-পার্বতীপুর-ঢাকা ও দিনাজপুর-পার্বতীপুর-ঢাকার মধ্যে যাত্রীবাহী আন্তনগর ট্রেনগুলো চলাচল করে থাকে। এর মধ্যে পার্বতীপুর-রাজশাহীর মধ্যে চলাচল করে আন্তনগর তিতুমীর ও আন্তনগর বরেন্দ্র এক্সপ্রেস। চিলাহাটি-পার্বতীপুর-খুলনার মধ্যে যাতায়াত করে আন্তনগর সীমান্ত ও আন্তনগর রূপসা এক্সপ্রেস। চিলাহাটি-পার্বতীপুর ও ঢাকার মধ্যে চলাচল করে আন্তনগর নীলসাগর ট্রেন। আর দিনাজপুর-পার্বতীপুর ও ঢাকার মধ্যে চলাচল করে আন্তনগর একতা ও দ্রুতযান। আন্তনগর এ ট্রেনগুলোর মধ্যে দ্রুতযান, একতা ও নীলসাগরের কোচ লাল-সবুজের। রূপসা ও সীমান্ত এক্সপ্রেস কোচ সাদার মধ্যে লাল বর্ডার দেওয়া। বরেন্দ্র ও তিতুমীর এ দুটি ট্রেন প্রথম সংস্করণের। আন্তনগর এ ট্রেনগুলো বাদে আরো কয়েকটি ট্রেন চলাচল করে ব্রড গেজ পথে। এর মধ্যে ২৩ আপ ও ২৪ ডাউন রকেট মেইল দুটি চলে পার্বতীপুর-খুলনার মধ্যে। ৩১ আপ ও ৩২ ডাউন নামে উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেনটি চলে পার্বতীপুর-রাজশাহীর মধ্যে। উল্লেখিত ট্রেনগুলো সাবেকি কচুপাতা রঙের। পার্বতীপুর-চিলাহাটি রেলপথে মিশ্র ট্রেন চলে।

এ ছাড়া পার্বতীপুর রেলজংশনের ৩, ৪, ও ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মসংলগ্ন মিটার গেজ পথে যে ট্রেনগুলো চলাচল করে তার মধ্যে দোলনচাঁপার কোচগুলো প্রথম সংস্করণের। এ ট্রেনটি চলে দিনাজপুর-পার্বতীপুর-কাউনিয়া সান্তাহার স্টেশনের মধ্যে। পার্বতীপুর-লালমনিরহাট এবং পার্বতীপুর-ঠাকুরগাঁওয়ের মধ্যে ডেমু নামে দুটি ট্রেন চলাচল করে। এ দুটি ট্রেনকে স্থানীয়রা খেলনা ট্রেনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘কোনো গাছের গুঁড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগলে এর কোচগুলো দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ ওপরে উল্লিখিত ট্রেনগুলোর বাইরে পার্বতীপুর-তিস্তা-কুড়িগ্রাম-রমনা বাজার, পার্বতীপুর-রংপুর-লালমনিরহাট, বিরল-পার্বতীপুর-লালমনিরহাট-বুড়িমারী, পার্বতীপুর-কাউনিয়া গাইবান্ধা-বগুড়া সান্তাহার এবং পার্বতীপুর-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ের মধ্যে চলাচলকারী মেইল ও লোকাল ট্রেনের রং সাবেকি আমলের কচুপাতা রঙের। যাত্রীরা এই ট্রেনগুলোকে মফিজ বলে ডাকে।

পার্বতীপুর রেলজংশনে কর্মরত এমজি ক্যারেজ স্টাফরা বলেন, ‘মফিজ ট্রেনের আয়ু অনেক আগে শেষ হয়েছে। এগুলো নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া চালানো যায় না।’

ব্রড গেজ লাইনের ক্যারেজ স্টাফরা বলেন, ‘নতুন কোচের গাড়িগুলো চেকিংয়ে কম সময় লাগে। তবে প্রতি সপ্তাহে বন্ধের দিনগুলোতে এগুলো ভালো করে পরীক্ষা করা হয়।’

ট্রেনের বৈষম্য সম্পর্কে জানতে চাইলে পার্বতীপুরে কর্মরত স্টেশন মাস্টার শোভন রায় কোনো রকম মন্তব্য করতে রাজি হননি।



সাতদিনের সেরা