kalerkantho

রবিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৮। ২৪ অক্টোবর ২০২১। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কৃষিতে তাক-লাগানো সমন্বিত পদ্ধতি

দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর   

৩০ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কৃষিতে তাক-লাগানো সমন্বিত পদ্ধতি

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ছোট মাছুয়া গ্রামে মো. হুমায়ুন কবির গাজী সমন্বিত কৃষি খামারে পুকুরপাড়ে কলাগাছ রোপণ করেছেন। একই খামারে গরুর পাশাপাশি আপেল কুল, পেঁপে, কলা ও ফুলকপি, পাতাকপি, মিষ্টিকুমড়া, শিম, করলার চাষ করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

উপকূলীয় এলাকা। একে তো লবণের আগ্রাসন, এর ওপর আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এমন স্থানে কৃষিতে বিনিয়োগ করে আশপাশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কৃষক মো. হুমায়ুন কবির গাজী (৬৫)। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ছোট মাছুয়া গ্রামে তাঁর সমন্বিত কৃষি খামারে বছরে ৩৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।

তাঁর খামার দেখে তুষখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান হাওলাদার, মো. বাচ্চু আড়তদার, ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য হাবিব আকন ও দীপক কুমার কর্মকার সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন।

মঠবাড়িয়া পৌর শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বলেশ্বর নদের তীরে নিভৃত ছোট মাছুয়া গ্রাম। ওই গ্রামের কৃষক ফুল মিয়া গাজীর (মৃত) ছেলে মো. হুমায়ুন কবির। তিনি ১৯৭৩ সালে এইচএসসি পাস করার পর ১৯৮৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ সচিব পদে চাকরিতে যোগ দেন। ২৯ বছর মঠবাড়িয়ার তুষখালী ও ভাণ্ডারিয়ার তেলিখালী ইউনিয়ন পরিষদে কাজ করে ২০১১ সালে অবসর নেন। এরপর ২০১২ সালে ২৩ লাখ টাকা নিয়ে বসতবাড়িসহ আশপাশের পতিত ১১ একর জমিতে গড়ে তোলেন মেসার্স গাজী সমন্বিত কৃষি খামার। এ কৃষি খামারের অধিকাংশ জমি পৈতৃক হলেও বার্ষিক বন্ধকে কিছু জমি নিয়েছেন। মোট ১১ একর জমির প্রায় সাত একরে পুকুর, সাড়ে তিন একরে সবজি ও এক একরে নানা ফলদ গাছ সৃজন করেন। ঘেরের বেড়িবাঁধে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে আপেল কুল, পেঁপে, কলা, আমসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ। পুকুর পাড়ে তৈরি করা হয়েছে ক্ষেত। ক্ষেতে চাষ করা হয়েছে ফুলকপি, পাতাকপি, মিষ্টিকুমড়া, শিম ও করলা।

হুমায়ুন কবির জানান, ২০১১ সালে খামার শুরু করার পর প্রথম দুই বছর লাভ হয়নি। তবে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে লাভজনক হয়ে ওঠে চাষাবাদ। চলতি বছরের শুরুতে উন্নত মানের মনোসেক্স তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশ মাছ, শীতকালীন সবজির চড়া দাম আসতে শুরু করে। প্রতিদিন ঘের থেকে পাঁচ মণ মাছ ৩০ হাজার, কুল দেড় মণ তিন হাজার, আট মণ ওলকপি চার হাজার, বেগুন এক মণ এক হাজার, দেড় মণ শিম, লাউ ১০০ পিস এক হাজারসহ অন্যান্য ফলদ বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকা হয়। প্রতিদিন ২০ বস্তা মাছের খাবার ২২ হাজার টাকা, সবজি পরিচর্যা দুই হাজার, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচসহ ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। গড়ে প্রতিদিন উদ্বৃত্ত থাকে ১০-১২ হাজার টাকা। প্রতিবছর তিনি ঘের থেকে প্রায় কোটি টাকার মাছ বিক্রি করে ৩০ লাখ টাকা আয় করেন। আর কৃষিতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়। তার খামারে ১২ জন কৃষি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। খামারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে অন্তত দুই শতাধিক পরিবারের।

 

তিনি আরো জানান, ঘেরের পানির তলদেশে মাছের খাবারের পরিত্যক্ত অংশ ও মাছের মলমূত্রে পলিমাটি জমে। প্রতি চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে সেচ দিয়ে শুকিয়ে এক থেকে দেড় ফুট পলি কাদা উঠিয়ে রোদে শুকিয়ে কম্পোস্ট সার তৈরি করেন। গরুর গোবরের জৈব সার ক্ষেতে দিয়ে সবজি ক্ষেত তৈরি করেন। এ সময় মাছের ঘেরের পুকুরে চুন, ইউরিয়া ও খৈল দিয়ে নতুন পোনা ছাড়ার জন্য পুকুর তৈরি করেন। ক্ষেতে পোকা নিধন প্রযুক্তি সেক্সফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন মাছের খাবার এখানে-সেখানে ছিটিয়ে রাখায় পরিবেশবান্ধব পাখি বসবাস করে। এসব পাখি ক্ষেতের পোকা নিধন করে।

উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হুমায়ুনের সাফল্য নিয়ে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তাঁর সমন্বিত কৃষি খামারে মাছ, কৃষি ও গবাদি পশুর সহাবস্থান রয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সবজি লাউ, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, বরবটি, বেগুন, গিমাকলমি, ডাঁটাশাক, চালকুমড়া, শসা, ঢেঁড়স, ধুন্দল, পুঁইশাকের  গড় উত্পদান ১৪ মেট্রিক টন। শীতকালীন সবজি ওলকপি, বাঁধাকপি, মিষ্টিকুমড়া, টমেটো, আলু, মুলা, বেগুন, পেঁয়াজ, শিম, মরিচ মিলিয়ে উত্পাদন ১৮ মেট্রিক টন। ফল আম, লিচু, পেয়ারা, লেবু, পেঁপে, কলা, মাল্টা, ড্রাগন; মাছের ঘেরের চারপাশ জুড়ে আপেল কুল ও কলা হয়। মাছের মধ্যে মনোসেক্স তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, পাঙ্গাশ, চিতল, গ্রাসকার্প, গলদা চিংড়ি, কালিবাউশ ও সরপুঁটি রয়েছে।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কৃষিকে লাভজনক করতে চাইলে সমন্বিত খামার গড়ে তোলার বিকল্প নেই। যে কেউ ইচ্ছা থাকলে এ খামার গড়ে তুলতে পারেন।’

এ বিষয়ে তুষখালী গ্রামের আরেক সফল চাষি দীপক কুমার কর্মকার বলেন, ‘হুমায়ুন কবির পরিবেশবান্ধব একজন সফল কৃষক। আমি তার খামার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি খামার গড়ে তুলেছি। তিনি এলাকার সফল কৃষকের দৃষ্টান্ত।’

মঠবাড়িয়ার ছোট মাছুয়া কৃষি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার কর্মকার বলেন, ‘প্রকৃতির একটি অন্যটির পরিপূরক। কৃষককে সফল হতে হলে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলতে হবে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে সম্পূর্ণ জৈব প্রযুক্তি, কম্পোস্ট ও জৈব সার ব্যবহার করে হুমায়ুন সফল হয়েছেন। তাঁর উত্পাদিত মাছ ও সবজি বিষমুক্ত।’

মঠবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘নানা কারণে আমাদের বিপুল পরিমাণ জমি পতিত থাকে। এসব জমি প্রস্তুত করে কৃষি খামার গড়ে তুলে যে কেউ সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেন। কৃষক হুমায়ুন সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’



সাতদিনের সেরা