kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সবজি নিয়ে বিপদ

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সবজি নিয়ে বিপদ

শীতের সবজিতে এখন হাটবাজার ভরপুর। আমদানি বেশি হওয়ায় অনেকটাই কমে গেছে সবজির দাম। বিক্রি করতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে পচে নষ্ট হচ্ছে। ছবিটি বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সংরক্ষণ জটিলতায় উত্তরের (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) ১৬ জেলায় প্রতিবছর প্রায় এক লাখ টন মৌসুমি সবজি পচে নষ্ট হয়। গড়ে ১০ টাকা কেজি হিসাবে ধরলে যার দাম দাঁড়ায় ১০০ কোটি টাকার ওপরে। কৃষি বিভাগ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বগুড়ার বাজারগুলোতে দুই মাস আগে থেকেই শীতকালীন সবজি আসা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিম, ফুলকপি, পাতাকপি, বরবটি, গাজর, মুলা, বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, লালশাক, পালংশাক ও পুঁইশাক। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবজির সরবরাহ বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে দাম। তাই শীতের সবজি নিয়ে প্রতিবছরের মতো এবারও বিপাকে পড়তে যাচ্ছে চাষিরা।

এ সপ্তাহে বগুড়ার দুটি বড় সবজি বাজার নয়মাইল হাট ও শেরপুর ঘুরে দেখা গেছে, মুলা কেজি ১৪ টাকা। এক মণ সাড়ে ৫০০ টাকা। ১০০ পিস বাঁধাকপি/ফুলকপির দাম ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা। আর দাম পড়ে গেলে এই কপির মূল্য দাঁড়ায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। মুলার কেজি হয়ে যায় এক টাকা থেকে ৫০ পয়সা। ওই সময় পরিবহন খরচও না ওঠায় কৃষকরা সবজি তুলে ফেলে দেয়। যা পচে নষ্ট হয়।

কালিবালা গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ কাঁকরোল চাষি ফরিদ সওদাগর জানান, আগাম সবজি চাষ করে ভালো দাম পেলেও খুশি নন। কারণ মৌসুমে অতিরিক্ত ফলনে তাঁর যে ক্ষতি হবে সেটা এই বাড়তি দামে পুষিয়ে তোলা যাবে না।

বগুড়ায় সবজির সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার মহাস্থানগড়। দিনমান পরিশ্রম করে যে চাষিরা এখানে নামমাত্র দামে সবজি বিক্রি করে ঘরে ফিরে যায়, তাদের সবার ওই একই কথা। আর কয়েক দিন পর যখন সব জমির সবজি একসঙ্গে হাটে আসবে, তখন দাম পড়ে যাবে। নামমাত্র দামে বেচতে হবে। এখন থেকে দাম কমানোর সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবজি চাষাবাদের এলাকাগুলোর হাট-বাজারে পাইকার ও মহাজনদের প্রতিনিধি (দালাল) ও ফড়িয়াদের প্রভাব প্রবল। কোনো চাষি ইচ্ছা করলে তার সবজি সরাসরি বড় মহাজন বা সাধারণ ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারে না। কৃষকরা সবজি বাজারে তোলার পর প্রথমে দালাল বা ফড়িয়ার খপ্পরে পড়তে হয়। তারা কৃষকদের কাছ থেকে অত্যন্ত কম দামে সবজি কেনে। পরে তা মহাজনের কাছে মণপ্রতি ৫০-৬০ টাকা লাভে বিক্রি করে। মহাজনরা ট্রাকে করে সুবিধা মতো ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বড় বড় কাঁচাবাজারে নিয়ে আসে।

কৃষকরা চায়, সরকার তাদের উৎপাদিত সবজি ন্যায্য দামে দেশের অন্যান্য বড় বড় শহরে বিক্রির ব্যবস্থা করুক। আর এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন সবজি সংরক্ষণাগার। তাতে কৃষক যেমন পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে, তেমনি ভোক্তারাও মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে অনেক কম দামে টাটকা সবজি পাবে।

স্থানীয়রা জানায়, ২০০৭ সালে চেলোপাড়ায় রেলের একটি জায়গায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চালু করা হয়েছিল চাষি বাজার। কৃষক সরাসরি সবজি বিক্রি করতে পারত এই বাজারে। দাম পেত ভালো। সরকার পরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে গেছে সেই বাজার।

চণ্ডিহারার কৃষক আফাজ, মইন, মকবুল হোসেন ও তারা মিয়ার অভিযোগ, কৃষক কেন সরাসরি বড় পাইকার, মহাজন বা ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারবে না? নিজের জমি থেকে ঢেঁড়শ, বরবটি, কাঁকরোল, বেগুন, করলা, পেঁপে, কাঁচা মরিচ, চালকুমড়া, পটল, চিচিঙ্গা তুলে বাজারে আসা মাত্র দালালদের হাতে জিম্মি হতে হয়। বাজারের প্রবেশ মুখে ভ্যানগাড়ি ঘিরে ধরে কৌশলে সবজি কিনে নেয়। বাজার মূল্য জানার সুযোগ পর্যন্ত দেয় না।

মহাস্থান বাজারের কমিশন এজেন্ট আবুল হোসেন সওদাগর বলেন, ‘এই বাজার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রায় ১৫ বছর ধরে স্থানীয় মহাজনদের ক্রেতা হিসেবে কাজ করছি। আমার মতো আরো অনেক এজেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় মহাজনদের নিয়োগ করা ফড়িয়া আছে অনেক।’

সবজি ব্যবসায়ীরা জানায়, উত্তরাঞ্চলে আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার রয়েছে। এখানে অনেকে টমেটো, ডিম বা কপি সংরক্ষণ করে। তবে এটা বাস্তবসম্মত নয়। সবজিভেদে হিমাগারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ভিন্ন সবজির জন্য আলাদা ঘর থাকতে হয়।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন তাজমা বলেন, ‘২০০১ সালে কাহালু উপজেলার দরগারহাটে মহাসড়কের পাশে সবজি সংরক্ষণাগার অ্যাগ্রোফ্রেশ লিমিটেড নির্মাণ করি। উত্তরাঞ্চলে এটিই প্রথম সংরক্ষণাগার। দুই কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এই প্রকল্পে আর্থিক সহযোগিতা করে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও কৃষকের অসচেতনতার কারণে প্রকল্পটিকে চালু রাখা যায়নি। যার কারণে কিছুদিনের মধ্যে এটি বন্ধ করে দিতে হয়। এখন স্থানটি পরিত্যক্ত রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছর শত কোটি টাকার সবজি পচে নষ্ট হয়। সংরক্ষণ করা গেলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হতো।’

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের রাজশাহী বিভাগীয় কর্মকর্তা বজলুর রশিদ বলেন, ‘বেশির ভাগ কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য ঢাকার বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যেতে অনাগ্রহী। তাদের সেই সুযোগও নেই। কোনো সংস্থা থেকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য কিনে ঢাকায় এনে বিক্রি করতে পারলে তবে ভোক্তারা কম দামে টাটকা সবজি পাবে। আমরা বিভিন্ন কম্পানির কাছে অনুরোধ করি, যাতে এই অঞ্চলের কৃষকের পণ্য সরাসরি কেনে। তবে সবজির উপযুক্ত দাম সারা বছর পেতে হলে সংরক্ষণাগার খুব বেশি প্রয়োজন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা