kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কাঠ পাচারে বন বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান   

২৭ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাঠ পাচারে বন বিভাগ

বান্দরবানের সদর উপজেলার বাঘমারা বাজার এলাকার বনের মধ্যে একটি অবৈধ করাতকল। এখানে বনের গাছ কেটে চেড়াইয়ের পর পাচারের জন্য কাঠ প্রস্তুত করা হয়। ছবিটি গত মঙ্গলবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাঘমারা, নোয়াপতং, কানাইজু পাড়া, হ্নারা, কচ্ছপতলীতে রয়েছে পাহাড়ি বনাঞ্চল। এসব এলাকা বান্দরবান জেলার মধ্যে পড়লেও এই বনাঞ্চল তত্ত্বাবধান করছে রাঙামাটির কাপ্তাই পাল্পউড বাগান বিভাগ। অভিযোগ উঠেছে, তদারকির অভাবে এসব এলাকার বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিদিন শত শত ঘনফুট কাঠ পাচার করছে দুর্বৃত্তরা। এ ক্ষেত্রে অবৈধ আয়ের ‘পাইপলাইন’ সচল রাখতে কাঠ পাচারের নিরাপদ পথটি সংশ্লিষ্টরাই জিইয়ে রেখেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা পেপার মিল ও বাংলাদেশ রেয়ন মিলে কাঁচামালের জোগান দিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় কাপ্তাই পাল্পউড বাগান বিভাগ। জেলা ভিন্ন হলেও তদারকির সুবিধা বিবেচনায় বাঘমারা, নোয়াপতং, হ্নারা ও কচ্ছপতলী নামে চারটি ফরেস্ট রেঞ্জের আওতায় বান্দরবানের ৯টি মৌজার সরকারি বনসহ ব্যক্তিমালিকানাধীন বিস্তীর্ণ বনভূমি কাপ্তাই পাল্পউড বাগান বিভাগের (কাপ্তাই পিপিডি) তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, নিজ জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও এসব এলাকার বনভূমির ওপর বান্দরবান বন বিভাগ বা বান্দরবান পাল্পউড বাগান বিভাগের কোনো কর্তৃত্ব নেই। এ সুযোগে চোখের সামনে দিয়ে মূল্যবান বনজ সম্পদ পাচার হয়ে গেলেও তারা নীরব ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে কাপ্তাই পাল্পউড বাগান বিভাগের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী পাল্পউড বা নরম কাঠ সৃজনের পরিবর্তে সেগুন, গর্জন, চম্পা ফুলসহ অন্যান্য জাতের কাঠের ভুয়া ট্রানজিট পাস (টিপি) ইস্যু করতেই বেশি ব্যস্ত।

স্থানীয় বাসিন্দা আলাই মং অভিযোগ করেন, বন বিভাগীয় কর্মচারীদের সহযোগিতায় দস্যুরা সরকারি বনের গাছ কেটে রাস্তার ওপর স্তূপ করছে। পরে সুযোগ বুঝে জোত পারমিটের নামে সরকারি বনজ সম্পদ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় একই ধরনের সুযোগ নিচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতের মালিকরাও। তারাও ভুয়া পারমিট বা একই পারমিট বারবার দেখিয়ে ভুয়া টিপির মাধ্যমে বনজ সম্পদ পাচার করে যাচ্ছে।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের একজন কর্মচারী জানান, জনবল কম থাকার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতার কারণে ওই এলাকার বন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব এলাকা থেকে জোত পারমিটের মাধ্যমে ইস্যু করা প্রতি ঘনফুট কাঠের জন্য স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে ৫০ টাকা এবং সরকারি বনের কাঠের জন্য ৭৫ টাকা হারে চাঁদা দিতে হয়। অর্থের লোভে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো কাঠ পাচারে সহযোগিতা দিতে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্য করে থাকে।

বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী জোত পারমিটের আবেদন পাওয়ার পর প্রথমে উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা আবেদন করা ওই ভূমির মালিকানা, অবস্থান ও বনের অস্তিত্ব সম্পর্কে লিখিত নিশ্চয়তা দেন। এরপর সংশ্লিষ্ট এলাকার ফরেস্টার ওই জমি সরেজমিন পরিদর্শন করে গাছগুলোর একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেন। এরপর ডেপুটি রেঞ্জার তালিকাভুক্ত গাছের মার্কিং করেন। পরের ধাপটি সম্পাদিত হয় রেঞ্জ অফিসারের তত্ত্বাবধানে। তিনি মার্কিং করা প্রতিটি গাছের বিপরীতে কী পরিমাণ কাঠ পাওয়া যাবে, এর একটি তালিকা তৈরি করে বন বিভাগে পাঠান। এরপর পর্যায়ক্রমে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) সরেজমিন পরিদর্শন করার পরই গাছ কেটে লগিং করার অনুমতি দেন। তবে উল্লিখিত মৌজাগুলোতে দুর্গম যোগাযোগের কারণ দেখিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিবর্তে ফরেস্টাররাই জোতের বাগান পরিদর্শন করেন এবং জোত পারমিট ইস্যুর চূড়ান্ত সুপারিশ দিয়ে থাকেন। ফলে নিম্নপদস্থ ওই কর্মচারীদের সঙ্গে সহজেই যোগসাজশ তৈরি করে কাঠ পাচারের এক স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছে কাঠ ব্যবসায়ীরা।

সম্প্রতি বাঘমারা, নোয়াপতং, আন্তাহাপাড়া, নাচালংপাড়া এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনকালে কাঠ পাচারের নেটওয়ার্কের কিছু চিত্র দেখা যায়। বান্দরবান-রাজস্থলী সড়কের বান্দরবান অংশে রাস্তার দুই পাশে শত শত ঘনফুট গোল ও রদ্দা কাঠ স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের সেগুন বাগানের মধ্যেই খড় বা জঙ্গল চাপা দিয়ে বিপুল পরিমাণ কাঠ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। একই অবস্থা দেখা গেল বন বিভাগের বাঘমারার চেক স্টেশন ও রেঞ্জ অফিসের আঙিনায়ও। সেখানে কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী ও তাদের লোকজনকে অপেক্ষা করতে দেখা গেল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, অফিসটি রেঞ্জ অফিসারের হলেও ‘রায়হান সাহেব’ নামের এক বন কর্মকর্তা ওই অফিসের দায়িত্বে রয়েছেন। অনেক চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কর্মচারীরা জানিয়েছেন, তিনি কচ্ছপতলী রেঞ্জেরও অতিরিক্ত দায়িত্বে। তিনি সেখানেই থাকেন। কর্মচারীদের কাছ থেকে যে মোবাইল নম্বর পাওয়া গেল, সেটিও বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে কাপ্তাই পাল্পউড বাগান বিভাগের ডিএফও আ ন ম আবদুল ওয়াদুদ জানান, এসব এলাকায় পারমিটের কাজকর্ম কম থাকার পাশাপাশি জনবল সংকটের কারণে বন রেঞ্জগুলোতে রেঞ্জ অফিসার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ফরেস্টার দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। তিনি জানান, পারমিট ইস্যুতে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও ভুয়া কাগজে বা একই কাগজে বারবার টিপি ইস্যু করার তথ্য সঠিক নয়।

বান্দরবান পাল্পউড বাগান বিভাগের একজন সাবেক ডিএফও কালের কণ্ঠকে জানান, দীর্ঘদিনেও বান্দরবান জেলার অধীন মৌজাগুলোকে বান্দরবান পাল্পউড বাগান বিভাগের অধীনে আনা সম্ভব হয়নি। এটি হলে এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা সমাধান সম্ভব হতো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা