kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

পলাশে হাজারো অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ

মিটার নেই, বিলও দিতে হয় না

সুমন বর্মণ, নরসিংদী   

১ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিটার নেই, বিলও দিতে হয় না

নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ছোট রামপুর গ্রামের শাহিন মিয়ার বাড়িতে মিটারবিহীন অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ। নিয়মিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও তাঁকে কোনো বিল দিতে হয় না। ছবি : কালের কণ্ঠ

নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ। ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবৈধ হাজারো বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ, বাড়ছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট।

অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগচক্রের প্রধান অভিযুক্ত তরিকুল নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর ঘোড়াশাল জোনাল অফিসের লাইনম্যান গ্রেড-১।

বিজ্ঞাপন

এ অভিযোগে গত মাসে তাঁকে পিরোজপুরে বদলি করা হলেও তিনি শ্রম আদালতে মামলা করে তা স্থগিত করিয়েছেন।

সরেজমিন উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ছোট রামপুর, জিনারদী ইউনিয়নের গুভুরিয়া, পৌরসভার দড়িহাওলা গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়িতে মিটার নেই। তবু জ্ব্বলছে বিদ্যুতের আলো। চলছে ইলেকট্রনিক পাখা, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র। আবার কোথাও মিটার থাকলেও তার কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। এ ছাড়া আবাসিক সংযোগ নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যিক, যার কোনো বিল হচ্ছে না।

ছোট রামপুরের রাজমিস্ত্রি শাহিন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি থেকে বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বোর্ডে মিটার নেই। মিটার ছাড়াই বাড়িতে ব্যবহৃত হচ্ছে বিদ্যুৎ। সেই বাড়ি থেকে ছোট রামপুরের উত্তরপাড়ার একাধিক বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে ওই সব সংযোগের তার টানা হয়েছে।

জানতে চাইলে শাহিন মিয়া বলেন, 'এক বছর আগে ফরহাদকে কারেন্টের জন্য ১৬ হাজার টাকা দিছি। ৮-৯ মাস আগে সে মিটার ছাড়াই এই লাইন লাগাইয়া দিছে। মিটার নাই। তাই বিলও হয় না। আমার বাড়ি থেকে ফরহাদ আরো কয়েক বাড়িতে লাইন দিলেও আপত্তি করি নাই। '

ছোট রামপুরের উত্তরপাড়ার নজর আলী ও আল-আমিনের বাড়িতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ। জানতে চাইলে আল-আমিন বলেন, 'কারেন্টের লাইগ্যা ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করতে পারে না। দীর্ঘদিন ঘুরেও লাইন পাইনি। শেষে ফরহাদকে ১৬ হাজার টাকা দেওয়ার পর এই লাইন টেনে দিয়েছে। '

ওই গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান বলেন, 'লাইনম্যান তরিকুলের শেল্টারে ফরহাদ গ্রামের শত শত মানুষের কাছ থেকে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সে গ্রামের নিরীহ ও অশিক্ষিত মানুষকে দু-তিন বছর ঘুরিয়ে অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে। এ কারণে আমাদের গ্রামে লোডশেডিং বেড়ে গেছে। শুনতাম, বিদ্যুতের আইন নাকি ভয়ানক। কিন্তু যারা বিদ্যুতের এই হরিলুট করছে তাদের কেন আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না?'

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ফরহাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

জিনারদী ইউনিয়নের গুভুরিয়া পাড়ার দিলীপ রায় তিন মাস আগে বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেও বিল পাননি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'বৈধ-অবৈধ জানি না। লাইনম্যান তরিকুলকে অনেক টাকা দিয়ে সংযোগ পেয়েছি। বিদ্যুৎ জ্বলছে প্রায় তিন মাস যাবৎ, কোনো বিল আসে না। '

পলাশ দড়িহাওলা পাড়া গ্রামের অনিল কুমার দে ও আশীষ কুমার দত্ত লাইনম্যান তরিকুলকে এক বছর আগে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দিলেও দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ সংযোগ পাননি। অবশেষে গত দুই সপ্তাহ আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেও তা ছিল অবৈধ। খবর পেয়ে গত বুধবার সেই অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় তরিকুলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অবৈধ বিদ্যুৎ, মিটার, খুঁটি সংযোগ দেওয়ার বিশাল বাহিনী। এর মধ্যে তালতলীর মোশারফ, রামপুরের ফরহাদ, কুড়াইতলী ও রাবানের চন্দন, শংকর, রতনসহ একাধিক লোক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মচারী জানান, বিগত আট বছরে তরিকুল অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত লাইনম্যান তরিকুল বলেন, 'এমনিই চাকরি নিয়ে ঝামেলায় আছি। এগুলো প্রকাশ করলে কি লাভ হবে? এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। '

নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ঘোড়াশাল জোনাল অফিসের উপমহাপরিদর্শক (ডিজিএম) অনিতা বর্ধন বলেন, 'উপজেলার রামপুর, কিতাম্বরদী, শেকান্দরদী গ্রামে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের প্রবণতা বেশি। ইতিমধ্যে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগে আমরা রামপুর গ্রামের ফরহাদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। পাশাপাশি ওই সব এলাকায় বেশ কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও জরিমানা আদায় করেছি। কিন্তু সামাজিক সচেতনতার অভাবে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। '

ডিজিএম বলেন, 'তরিকুল পলাশের অনেক স্থানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছিল, যার কারণে তাকে ঘোড়াশাল অফিস থেকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু সে বদলি স্থানের কাজে যোগ না দিয়ে শ্রম আদালতে মামলা করে আদেশ স্থগিত করিয়েছে। একই সঙ্গে ওপর মহলে এখানে থাকার জন্য জোর তদবির চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত যতবার তাকে বদলি করা হয়েছে, ওপর মহলের তদবিরে পুনরায় পলাশেই রয়ে গেছে। '



সাতদিনের সেরা