kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

\'আর কতবার উচ্ছেদ হব?\'

বিপ্লব রহমান, বাবুছড়া (দীঘিনালা) থেকে ফিরে   

২ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



\'আর কতবার উচ্ছেদ হব?\'

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় উচ্ছেদ হয়ে উদ্বিগ্ন এই পাহাড়ি পরিবার। ছবি : কালের কণ্ঠ

'১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ আর ১৯৮৯ সালে শান্তিবাহিনী-সেনাবাহিনীর সশস্ত্র যুদ্ধের কারণে দুই দফা ছাড়তে হয়েছিল ভিটামাটি। আর এখন বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ছাউনি করবে বলে তৃতীয় দফা আমাদের উচ্ছেদ করা হলো। আমাদের কি অপরাধ? আর কতবার উচ্ছেদ হব আমরা?' ভাঙা বাংলায় কথাগুলো বলতে বলতে গামছা দিয়ে চোখ মুছছিলেন বয়োবৃদ্ধ পাহাড়ি নারী আনন্দ বালা চাকমা।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়ায় সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ৫১ বিজিবির সদর দপ্তরের কারণে উচ্ছেদ হওয়া যে ২১টি পাহাড়ি পরিবার বাবুছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনটি কক্ষে গাদাগাদি করে বাস করছে, তাদের মধ্যে বর্ষীয়ান আনন্দ বালাও একজন। গত শুক্রবার সেখানেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বিজিবির সদর দপ্তর তথা ছাউনি প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে গত ১০ জুন গ্রামবাসীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় তাঁর ডান পায়ে গুলি লাগে।

একই সুরে কথা বললেন শশী মোহন কারবারি পাড়া থেকে উচ্ছেদ হওয়া গ্রামপ্রধান (কারবারি) সন্তোষ কুমার কারবারি। তিনি বলেন, কাপ্তাই বাঁধের কারণে পাহাড়ের প্রায় ৫৪ হাজার একর চাষের জমি জলমগ্ন হয়। সে সময় উদ্বাস্তু হয় প্রায় এক লাখ লোক। বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত পাহাড়িরা বাবুছড়ায় তাদের গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করে। একই সময় প্রতিষ্ঠিত হয় পাশের আরেকটি গ্রাম যত্নমোহন কারবারি পাড়াসহ আরো কয়েকটি গ্রাম। নব্বইয়ের দশকের বিভিন্ন সময় অস্থির রাজনীতির কারণে আশপাশের সবকটি গ্রামের পাহাড়িরা ভারতে শরণার্থী হয়েছিল। ৮ থেকে ৯ বছর পর দেশে ফিরে দেখে বেশির ভাগ ঘরবাড়ি, জমি-জিরাত দখল হয়ে গেছে। সন্তোষ কারবারির অভিযোগ, এখনো অনেকেই নিজ নিজ জায়গা-জমি ফেরত পায়নি। উল্টো গত ১০ জুন বিজিবির ছাউনি প্রতিষ্ঠার নামে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।

ওই দিনের ঘটনায় আহত আরেক নারী গোপা চাকমা বলেন, 'সরকার বারবার আমাদের উচ্ছেদ করে। নিজেদের গ্রামে শান্তিতে বাস করতে দেয় না। তারাই আবার অহেতুক মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করছে।'

ন্যান্সি-প্রিয়সী-নাবানী চাকমা যথাক্রমে নবম, অষ্টম ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। তারা যে স্কুলে পড়াশোনা করে, গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে এখন সে স্কুলেরই একাংশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। তারা জানায়, 'আমরা এখনো পশুর মতো গাদাগাদি করে বাস করছি। সংঘর্ষের পর পরই এক কাপড়ে ঘর ছেড়েছি। জামা-কাপড়, বই-খাতাপত্র কিছুই সঙ্গে করে আনতে পারিনি। সবার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে।'

গত ১০ জুন পাহাড়ি গ্রামবাসী ও পুলিশের সংঘর্ষের পর থেকে ২ নম্বর বাঘাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেখানে নারী ও পুরুষ সদস্যদের নিয়ে বসেছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। চকচকে নতুন কাঁটাতারে ঘেরা স্কুলটিও এখন বিজিবির ছাউনির ভেতরে। বিজিবি ছাউনি প্রতিষ্ঠা করতে গ্রামের ভেতর তিনটি টিলা কেটে তৈরি করেছে বেশ কয়েকটি মাটির কাঁচা রাস্তা। সৈনিকদের জন্য টিনের ব্যারাক নির্মাণের কাজ চলছে। কয়েকটি তাঁবুতেও বিজিবির সৈনিকরা আশ্রয় নিয়েছেন। কলাবাগান কেটে তৈরি করা হচ্ছে হেলিপ্যাড।

৫১ বিজিবির সদর দপ্তরের উপঅধিনায়ক মেজর কামাল উদ্দীন তাঁদের প্রতিষ্ঠিত সদর দপ্তর তথা ছাউনির কারণে পাহাড়ি জনপদ উচ্ছেদ হওয়ার কথা অস্বীকার করেন। ২০০৪ ও ২০০৫ সালের জেলা প্রশাসনের নথিপত্র দেখিয়ে তিনি বলেন, 'এখানে কোনো সময়ই জনবসতি ছিল না। পরে এখানে সেনা ছাউনি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারত-বাংলাদেশের ত্রিপুরা সীমান্তের প্রায় ১২৩ একর অরক্ষিত থাকায় সেনা ছাউনিটিকেই এখন বিজিবির ছাউনিতে রূপান্তর করা হচ্ছে।' তিনি অভিযোগ করে বলেন, শান্তিচুক্তিবিরোধী একটি স্বার্থান্বেষী মহল পাহাড়িদের উসকে দিচ্ছে। তারা পাহাড়িদের সংঘটিত করে গত ১০ জুন বিজিবির সদস্যদের ওপর দা, কুড়াল, বটি ও শাবল নিয়ে হামলা করেছে।

জেলা প্রশাসক মাসুদ করিমও বিজিবির ছাউনি এলাকায় জনবসতি থাকার কথা স্বীকার করেননি। বক্তব্যের সমর্থনে বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র দেখিয়ে তিনি বলেন, 'ছয়-সাত মাস আগেও সেখানে আমি কোনো জনবসতি দেখিনি। ছয়-সাতটি পরিত্যক্ত টংঘর ছিল। এখন বিজিবির ছাউনি প্রতিষ্ঠার কথা শুনে শান্তিচুক্তিবিরোধী একটি সশস্ত্র আঞ্চলিক দল পাহাড়িদের উসকানি দিচ্ছে। তারাই বাবুছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অন্যত্র থেকে পাহাড়িদের এনে জড়ো করেছে।'

বিজিবির ছাউনির ভেতরে পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা প্রশাসক বলেন, এটি ভুলবশত করা হয়েছে। কাঁটাতারের ভেতরে স্কুল থাকা উচিত নয়।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চাই থো অং মারমা বলেন, 'বাবুছড়ার ঘটনাটি দুঃখজনক। এ সরকারের মতো অন্য কোনো সরকারই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। অথচ এ সরকারের আমলেই এমন অপ্রীতিকর ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।'

পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম (পাহাড়ি) শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বলেন, 'আমরা অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নিরাপত্তা ছাউনির কারণে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করা হলে কখনোই তাদের পুনর্বাসন করা হয় না। বরং ছাউনির আশপাশে বহিরাগত বাঙালিদের এনে বসতি গড়ে দেওয়া হয়।'

দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা বলেন, বাবুছড়ায় হামলা চালিয়ে পাহাড়িদের ঘরবাড়ি থেকে জোর করে উচ্ছেদের ঘটনা খুবই দুঃখজনক।

দীঘিনালার ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান চন্দ্র রঞ্জন চাকমা বলেন, 'বিজিবি ছাউনি প্রতিষ্ঠার আগে গ্রামবাসীর মতামত নেয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেনি। যেদিন বিজিবির সঙ্গে আমাদের আলোচনায় বসার কথা ছিল, সেদিনই (১০ জুন) হামলা করে গ্রামবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।'

 

 

মন্তব্য