kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

ভাষা দিবস কি অনুষ্ঠান থেকে আবার আন্দোলন হবে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভাষা দিবস কি অনুষ্ঠান থেকে আবার আন্দোলন হবে

একুশের বয়স হয়েছে উনসত্তর বছর। আটষট্টি বছর ধরে এই দিবসটি নিয়ে লিখছি এবং বলছি। ইউরোপে বসবাসকালে ইউরোপ এবং আমেরিকার বহু দেশে একুশে উদযাপনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। একুশের গানটি লেখার সুবাদে হাজারবার দেশে ও বিদেশে এই গান কেন লিখেছি, কেমন করে লিখেছি তার ইতিহাস বলতে হয়। আজ যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সংগীত হিসেবে এটি পৃথিবীর এগারো কি বারো দেশে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে গীত হয়, সে জন্য আমি কতটা গর্ব অনুভব করি, তা-ও অনেকে জানতে চান। একই কথা বারবার বলতে বলতে আমি নিজেকে সুখী বোধ করি না।

এবার ফেব্রুয়ারি মাসে আমি অসুস্থ। করোনার ভ্যাকসিন পেয়েছি। কিন্তু বার্ধক্যজনিত নানা রোগে কাতর। দুই সপ্তাহ শয্যাশায়ী থাকার পর উঠে বসেছি বটে, শরীর খুবই দুর্বল। তবু একুশে সম্পর্কে কয়েকটি জুম বা অনলাইন আলোচনায় যোগ দিচ্ছি। একুশের ওপর লেখার তাগিদও কম পাচ্ছি না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে না লেখার জন্য ক্ষমা চেয়েছি। শরীরে কুলাচ্ছে না, মনও চাচ্ছে না, বছর বছর একই কথা আর কত লিখব? একই কথা আর কত বলব।

প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে যা লিখি, তা এখন প্রথাগত লেখা। এই প্রথাগত লেখার জন্য একদল পণ্ডিত আছেন। তাঁরা লিখুন। সেই যে চর্যাপদের আমল থেকে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দকে পেরিয়ে শামসুর রাহমান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই বিরাট প্রবাহ সম্পর্কে লিখুন, পাণ্ডিত্য প্রকাশ করুন, আমি আজ লিখতে চাই একটি লড়াকু ও অকুলীন ভাষা নিয়ে এবং সেই ভাষার দিবস নিয়ে।

পাকিস্তান আমলে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম :

‘আমার দুখিনী বাংলা

মা, তুই আমার জননী’

আজ স্বাধীন বাংলাদেশের আমলে কবিতা লিখেছি

‘আমার দুখিনী ভাষা

মা, তুই আমার ভালোবাসা।’

একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পরও ভাষা দুঃখিনী কেন? কেন, রূপকথায় পড়েননি রাজার দুই রানি—সুয়োরানি ও দুয়োরানি। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা দুয়োরানি এখনো, সুয়োরানি ইংরেজি। উর্দুর সঙ্গে আমাদের ভাব হয়নি; কিন্তু হিন্দির সঙ্গে হয়েছে। গ্লোবালাইজেশনের নামে হিন্দি এখন আমাদের সদরে-অন্দরে, শয়নকক্ষে পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে।  আমরা হিন্দি গান শুনতে ভালোবাসি। জন্মোৎসব, বিবাহ উৎসবে মুম্বাইয়া কালচারের অনুকরণ করি। দুঃখিনী বাংলা সংস্কৃতি সেখানে ক্রমেই অনুপস্থিত।

তবে হ্যাঁ, বছরে দুটি দিনে আমরা বাঙালি সাজার চেষ্টা করি। একটি পহেলা বৈশাখ, আরেকটি একুশে ফেব্রুয়ারি। যে দিবসটি নিয়ে আজ লিখছি। যে দিবসটির বয়স আজ ৬৯ বছর। দিবসটি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তার গতি কম, জ্যোতি কম, আবেদনও কম। যাক, যে কথা বলছিলাম, পহেলা বৈশাখ ও একুশে ফেব্রুয়ারি বা আট ফাল্গুন, এই দুটি দিনে আমরা বাঙালি হই। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরি, মহিলারা শাড়ি পরেন। নর-নারী-নির্বিশেষ সবাই রবীন্দ্রসংগীত শোনেন এবং গেয়েও থাকেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাষা দিবসটির চরিত্র পাল্টে গেছে। আগে একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল একটি আন্দোলন, এখন এটি একটি অনুষ্ঠান। আন্দোলনে আবেগ থাকে, প্রণোদনা থাকে। অনুষ্ঠানে তা থাকে না। আন্দোলনে জনগণের প্রাণের সংযুক্তি থাকে, এককালে একুশের তা ছিল। এখন আন্দোলনের বদলে অনুষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পর জনমনের সেই উচ্ছৃঙ্খল আলোড়ন ও আন্দোলন নেই একুশের দিবসে। আছে নিগড়বদ্ধ সরকারি আনুষ্ঠানিকতা। সরকারপ্রধানরা এসে তাতে প্রথম মালা দেন। জনগণ থাকে ব্যারিকেডের বাইরে—পুলিশ পাহারায়। আগের মতো মধ্যরাতের প্রভাতফেরিতে ‘আমি কি ভুলিতে পারি’ রোদনের মতো বেজে ওঠে না। গানটির সুর শুধু যন্ত্রসংগীতে বাজতে থাকে। ভাষাহীন, মূক সেই সুর যেন বলতে চায় আমার নতুন কবিতার কথাই, ‘আমার দুখিনী ভাষা, মা, তুই আমার ভালোবাসা।’

হ্যাঁ, একুশের চরিত্র আরো একভাবে পাল্টেছে। একুশ আমাদের একটি প্রধান জাতীয় দিবস। এই দিবসের আবেদন সব ধর্মমতের মানুষের কাছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই একুশের মাথায় টুপি পরানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দেখি, একুশের অনুষ্ঠান শুরু হয় সুরা, কেরাত পাঠ ইত্যাদি দিয়ে। মনে মনে ভাবি, ভাগ্যিস, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ধূপধুনা, তন্ত্রমন্ত্র দ্বারা একুশের অনুষ্ঠান শুরু করে না। যদি করত, তাহলে বাঙালির এই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় দিবসও বিভক্ত হয়ে যেত।

এই বিভক্তি থেকে দিবসটিকে রক্ষা করেছেন শেখ হাসিনাও। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইউনেসকোকে অনুরোধ জানিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ করার ব্যবস্থা করে এই দিবসটির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা করেছেন, একে বিশ্বজনীনতা দান করেছেন। এখন সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।

অবশ্য এ জন্য আরো দুজন বাঙালির নাম স্মরণীয়। তাঁরা ভ্যাংকুভারপ্রবাসী রফিক ও সালাম। সেই সুদূর ভ্যাংকুভারে বসে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। বায়ান্নর দুই ভাষাশহীদ রফিক ও সালামের নামে ভ্যাংকুভারের এই দুই প্রবাসীর নাম। রফিক সাহেব এখন প্রয়াত। তাঁর পরিবার-পরিজন আছে ভ্যাংকুভারে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের মূল লক্ষ্য পৃথিবীর দলিত, উপেক্ষিত ভাষাগুলোর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে সাহায্য জোগানো। যেসব জাতির মুখে নিজের ভাষা মূক, তাকে জীবন্ত করে তোলা। বাংলা ভাষা বিশ্বের একটি সমৃদ্ধ ভাষা বটে, কিন্তু উপেক্ষিত ভাষা। একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পরও সে অকুলীন রয়ে গেছে। কৌলীন্য অর্জন করতে পারেনি। রাষ্ট্রের শাসকরা বাংলা ভাষাকে অনুকম্পা দেখান, অনুগ্রহ দেখান, সম্মান দেখান না। শাসক শ্রেণি বাংলা বলার নামে বাংরেজি বলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর হতে চলেছে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ আমলে ৫০ বছরেরও কম সময়ে যেখানে বাংলা ভাষার আধুনিকীকরণ হয়েছে, বিশাল উন্নতি হয়েছে, সেখানে স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষার উন্নয়ন এখনো বাংলা একাডেমির গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ। তার প্রসার ঘটেনি জনজীবনে। ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে তো বাংলা থাকবেই, আধুনিক প্রযুক্তিকে ধারণ ও গ্রহণ করার ক্ষমতাও তাকে অর্জন করতে হবে। শুধু অনুবাদ দ্বারা কোনো ভাষা উন্নত হয় না। তার দুয়ার সব ভাষা থেকে শব্দসম্ভার আহরণের জন্য খোলা রাখতে হবে। বাংলা ভাষার গ্রহণীশক্তি ব্যাপক, রাশিয়ান ভাষার স্ফুটনিক, ইংরেজি ভাষার হাইজ্যাক পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের কাছেও বাংলা হয়ে গেছে।

বাংলা সাহিত্যের উন্নতি হয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু বাংলাকে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষা, ব্যাবহারিক ভাষা করে অবশ্যই তুলতে হবে। বাংলায় যেন ওষুধের প্রেসক্রিপশন লেখা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্যের, কূটনৈতিক মতবিনিময়ের চিঠিপত্র লেখা যায়; নইলে সংস্কৃত ও পালি ভাষার মতো বাংলারও পতন ঘটতে পারে। সংস্কৃত ও পালি এখন শুধু ধর্মগ্রন্থের ভাষা।

বাংলার একটি সৌভাগ্য, বাংলা কখনো রাজদরবারের ভাষা হয়নি, ধর্মগ্রন্থের ভাষা হয়নি। হলে তার বিকাশ বন্ধ হয়ে যেত, যেমন হয়েছিল প্রাচীন আরবি ভাষার। মধ্যপ্রাচ্যে অসাম্প্রদায়িক আরব জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের জোয়ারে যে আধুনিক আরবি ভাষা তৈরি হয়, তাতে এই ভাষা বেঁচে যায়। বাংলা রাজভাষা ছিল না, এই প্রথম একটি জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেটের ভাষা হয়েছে। একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের বাহন হয়েছে।

আমাদের বাংলা ভাষার বর্তমান সমস্যাটা এখানেই। আমাদের শাসকরা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের আদর্শ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে ভাষাকেও টেনে নিতে চাচ্ছেন পেছনে। আমাদের শাসক ও বুদ্ধিজীবী সমাজে মূল্যবোধ কম। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চরমে। এই অবক্ষয়ের ছাপ পড়ছে ভাষায়ও। ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে ধর্মান্ধতার কালো হাতের ছাপ এখন স্পষ্ট। অন্যদিকে মুম্বাইয়া অপসংস্কৃতি ও হিন্দি ভাষার উৎকট প্রভাব। একটি ভাষা তখনই প্রকৃত বিকাশ লাভ করে, যখন তার অন্য ভাষাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক হয়। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এখন যা ঘটছে, তা সহস্র ভাষার বাহুবন্ধন নয়, একটি ভাষার আধিপত্যবাদী গ্রাস, যা আমাদের সমাজজীবনে এরই মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। ধর্মান্ধতা ও বিশ্বায়নের নামে অপসংস্কৃতির গ্রাস শুধু আমাদের ভাষাকে নয়, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকেও বিষণ্ন করে তুলেছে। দুঃখের বিষয়, এ সম্পর্কে আমাদের শাসক শ্রেণি উদাসীন। সমাজের ভেতরেও বায়ান্নর মতো কোনো প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না।

তবে আমাদের একটি ভরসাস্থল এখনো আছে। সেটি হলো বাংলা ভাষার আদি চরিত্র। এই চরিত্র লড়াকু। জন্মাবধি এই ভাষা লড়াই করে বেঁচে আছে। সেই চর্যাপদের যুগে যখন বাংলাকে রৌরব নরকের ভাষা আখ্যা দিয়ে সমস্ত বাংলা গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, তখনো জনমুখে এই ভাষা লড়াই করে তার অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল। তারপর ইংরেজ আমলে সংস্কৃত পণ্ডিতদের বাংলা ভাষার মাথায় টিকি গজানোর চেষ্টা এবং তার পাল্টা মৌলভিদের ভাষার মাথায় টিকির বদলে টুপি পরানোর চেষ্টা—সব ব্যর্থ করে বাংলা ভাষা জনজবানে তার অস্তিত্ব রক্ষা করেছে। তারপর ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের হাত ধরে বিশ্বের একটি উন্নত ভাষায় পরিণত হয়েছে।

একুশ আন্দোলন থেকে অনুষ্ঠান হয়ে গেছে; কিন্তু ভাষা তা হয়নি। তা পণ্ডিতদের গবেষণা উপেক্ষা করে জনমুখে নিত্য বিবর্তিত, নিত্য রূপান্তরিত হচ্ছে। এই রূপান্তর থেকে আবার নতুন ভাষা আন্দোলন একদিন গর্জে উঠবে না, গ্রন্থ ও গবেষণাকে আস্তাকুঁড়ে রেখে জনজবানরূপে আবার রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে, শাসক শ্রেণির সব প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে না, তা কে বলবে? আমি হয়তো দেখে যাব না; কিন্তু নতুন প্রজন্মের জন্য সেই প্রত্যাশার কথা ঘোষণা করে তো যেতে পারি।

মন্তব্য