kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে

বঙ্গবন্ধুর একুশের পর্যবেক্ষণ

সেলিনা হোসেন   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর একুশের পর্যবেক্ষণ

বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে একুশে ফেব্রুয়ারির নানা দিকের উল্লেখ পাওয়া যায়। ৯৩ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন : “আমাদের এক জায়গায় রাখা হয়েছিল জেলের ভিতর। যে ওয়ার্ডে আমাদের রাখা হয়েছিল, তার নাম চার নম্বর ওয়ার্ড। তিনতলা দালান। দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’—নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, ‘হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।’ হক সাহেব আমাকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব।’”

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে স্কুলের ছাত্রীদের ভাষার জন্য আন্দোলন গর্বিত হয়ে ওঠে মিছিলে-স্লোগানে সবটুকু বঙ্গবন্ধুর চেতনার স্বাপ্নিক দ্যোতনা। এই আত্মবিশ্বাস তাঁকে গভীরতম বোধের অবিনাশী চেতনায় স্থির করে। তিনি লক্ষ্য অর্জনের যাত্রা নিজের সামনে এগিয়ে যাওয়াকে দৃঢ়তর করেন। এই বইয়ের ৯৯ পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন, “জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোড়দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ আমরা প্রায় চার-পাঁচ শত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিল ‘মানি না’। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে বক্তৃতা করতে উঠে তিনি যখন আবার বললেন, ‘উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে’—তখন ছাত্ররা তাঁর সামনে বসে চিৎকার করে বলল, ‘না, না, না’। জিন্নাহ প্রায় পাঁচ মিনিট চুপ করে ছিলেন, তারপর বক্তৃতা করেছিলেন। আমার মনে হয়, এই প্রথম তাঁর মুখের ওপর তাঁর কথার প্রতিবাদ করল বাংলার ছাত্ররা। এরপর জিন্নাহ যত দিন বেঁচে ছিলেন আর কোনো দিন বলেন নাই, উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।”

এই উদ্ধৃতি থেকেও বোঝা যায়, অধিকার আদায়ের দৃঢ়তায় তাঁর মর্মবাণী নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছুঁয়ে অতিক্রম করেছে পথের দিশা।

বইয়ের ১১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘পরের দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম আশুগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন ধরতে। পথে পথে গান চলল। নদীতে বসে আব্বাসউদ্দীন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজ গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।...’ আমি আব্বাসউদ্দীন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালোবাসো, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।’ আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।”

বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীনের হৃদয় উজাড় করা টান বঙ্গবন্ধুকে অভিভূত করে। তিনি কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। তাঁর অনুভবের মাত্রা আব্বাসউদ্দীনের গান শুনে পূর্ণ করেছেন। এভাবে পথে পথে একুশের চেতনা তাঁকে আন্দোলিত করেছে। তিনি পূর্ণতর মাত্রায় নিবেদিত ছিলেন।

এ বইয়ের ২০০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “২১শে ফেব্রুয়ারি আমরা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটালাম, রাতে সিপাহীরা ডিউটিতে এসে খবর দিল, ঢাকায় ভীষণ গোলমাল হয়েছে। কয়েকজন লোক গুলি খেয়ে মারা গেছে। রেডিওর খবর। ফরিদপুরে হরতাল হয়েছে, ছাত্র-ছাত্রীরা শোভাযাত্রা করে জেলগেটে এসেছিল। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, বাঙালিদের শোষণ করা চলবে না’, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, আরও অনেক স্লোগান।’”

এই সময়ে তিনি ছিলেন ফরিদপুর জেলে। জেলে বসে অনশন করেছিলেন। বইয়ে লিখেছেন, ‘একদিন মরতেই হবে, অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে যদি মরতে হয়, সে মরাতেও শান্তি আছে।’

মৃত্যুকে নিয়ে এমন চিন্তা একজন দেশপ্রেমিক মানুষের পক্ষেই সম্ভব, যিনি জীবনব্যাপী অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হন। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনে মৃত্যুর এই ভাবনার স্থায়ী রূপ ছিল। তিনি পরাজয় মানেননি। শত অবরোধের মুখে জীবনীশক্তিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

প্রতিবাদ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন ছিল তাঁর কাছে শান্তির মৃত্যু। বরেণ্য মানুষের উজ্জ্বল কালবেলা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা