kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৯ চৈত্র ১৪২৬। ২ এপ্রিল ২০২০। ৭ শাবান ১৪৪১

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

সৌমিত্র শেখর   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট চলাকালে পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত শওকত আলীকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি : বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে

অনেকে বলে থাকেন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলবন্দি হয়ে ফরিদপুরে ছিলেন। ফলে এই আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ সম্ভব ছিল না। যাঁরা এহেন কথা বলে থাকেন, তাঁদের বক্তব্যে তথ্য ও যুক্তি নেই। কারণ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুধু কিছু মুহৃর্তের ব্যাপার নয়। এর ছিল প্রস্তুতি ও প্রবহমানতা। এই প্রস্তুতি ও প্রবহমানতা বিচার করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রধান স্থপতি বলা প্রয়োজন।

বাঙালির আত্মশক্তির উত্থান দেখা গিয়েছিল ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষার জন্য প্রকাশ্যে আন্দোলন করে শহীদ হওয়ার পূর্বদৃষ্টান্ত আর নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে অন্তরীণ নিশ্চয়। একুশের ঘটনা স্মরণ করে জেলখানায় বসে তিনি লিখেছেন : ‘মাতৃভাষা আন্দোলনে পৃথিবীতে এই প্রথম বাঙালিরাই রক্ত দিল। দুনিয়ার কোথাও ভাষা আন্দোলন করার জন্য গুলি করে হত্যা করা হয় নাই। জনাব নূরুল আমিন বুঝতে পারলেন না, আমলাতন্ত্র তাঁকে কোথায় নিয়ে গেল। গুলি হলো মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলের এরিয়ার ভেতরে, রাস্তায়ও নয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলেও গুলি না করে গ্রেপ্তার করলেই তো চলত। আমি ভাবলাম, দেখব কি না জানি না, তবে রক্ত যখন আমাদের ছেলেরা দিয়েছে, তখন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করে আর উপায় নাই।’ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ এভাবেই একুশের রক্তদান এবং এই রক্তদানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। জেলে বসে (১৯৬৬) সেই আন্দোলনের পরিণাম নিয়ে রাজনৈতিক গ্রন্থ রচনা কম সাহসের কথা নয়। এই সাহস বঙ্গবন্ধু নিজে লালন করতেন এবং তা বাঙালিদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে তিনি পেরেছিলেন।

ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা এক দিনের নয়। ছাত্ররাজনীতিতে যখন তিনি ছিলেন, আওয়ামী লীগের মূল রাজনীতিতে যখন তিনি যুক্ত, স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন তিনি—সব সময়ই ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি উন্নত ভাবনা ভেবেছেন এবং তা কার্যকরের ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এই ভাবনার ধারাবাহিকতা আছে। ১৯৫২ সালের আন্দোলনের পর ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানে প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে এর ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে উর্দুর পাশে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাঙালির জন্য বিলম্বে হলেও এটি একটি বিজয় নিশ্চয়। কিন্তু এতেই তুষ্ট ছিলেন না বঙ্গবন্ধু। ১৯৬৬ সালের ৮ জুন, বুধবার জেলবন্দি বঙ্গবন্ধু শহীদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে স্রষ্টার কাছে নীরবে প্রার্থনা করেন এবং অন্তরের মণিকোঠায় নেন সুদৃঢ় সংগ্রামের শপথ। ‘কারাগারের রোজনামচায়’ বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যেভাবে এ দেশের ছাত্র-জনসাধারণ জীবন দিয়েছিল তারই বিনিময়ে বাংলা আজ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। রক্ত বৃথা যায় না। যারা হাসতে হাসতে জীবন দিল, আহত হলো, গ্রেপ্তার হলো, নির্যাতন সহ্য করল তাদের প্রতি এবং তাদের সন্তান-সন্ততির প্রতি নীরব প্রাণের সহানুভূতি ছাড়া জেলবন্দি আমি [বঙ্গবন্ধু] আর কী দিতে পারি! আল্লাহর কাছে এই কারাগারে বসে তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য হাত তুলে মোনাজাত করলাম। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না, সংগ্রাম চালিয়ে যাব। যা কপালে আছে তা-ই হবে। জনগণ ত্যাগের দাম দেয়। ত্যাগের মাধ্যমেই জনগণের দাবি আদায় করতে হবে।’ এই প্রতিজ্ঞা বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত রক্ষা করেছিলেন এবং সে কারণেই বাঙালি পেয়েছিল একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। 

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় যুবলীগের কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠান এবং সেখানে ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেছিলেন তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। বিশিষ্ট ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক লিখেছেন, ‘সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।’ কী ছিল সেই প্রস্তাবে? গাজীউল হক বঙ্গবন্ধুর সে বচন উল্লেখ করে লিখেছেন : ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ এই দাবি থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে। তমদ্দুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথ সভায় এই পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। ফজলুল হক মুসলিম হলের এই সভায় উপস্থিত ছিলেন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবুল কাসেম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজিতকুমার গুহ প্রমুখ। সভায় পূর্বাপর ঘটনাগুলো আলোচনা করে গণপরিষদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা ও মুসলিম লীগের বাংলা ভাষাবিরোধী কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে এর বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। আন্দোলনের স্বার্থেই গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। গণতান্ত্রিক যুবলীগ, গণআজাদী লীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস, ছাত্রাবাস বা হোস্টেলগুলোর সংসদ ইত্যাদি ছাত্র ও যুব প্রতিষ্ঠান থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে পরিষদ গঠিত হয়। এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ ও সুদূরপ্রসারী। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা শহরে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদসভা, সাধারণ ধর্মঘট, বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ওই দিন পূর্ব বাংলায় সফল হরতাল পালিত হয় আর বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে এভাবেই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সূচনা ঘটে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এটাই ছিল প্রথম হরতাল। হরতালে বিক্ষোভ দেখানোর সময় সচিবালয়ের প্রথম প্রবেশদ্বার বা গেটে পিকেটিংয়ে অংশ নেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ প্রমুখ, দ্বিতীয় প্রবেশদ্বারে অন্যরা। এই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম সূচনা করতে গিয়ে পুলিশ ও শাসক দলের ভাড়াটে গুণ্ডাদের হাতে বহু আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা আহত এবং অনেক ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রনেতাদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন চরমে ওঠে। ফলে ১৫ মার্চও হরতাল পালিত হয়। অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বিবেচনা করে ওই দিন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি কমরুদ্দিন আহমদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর চুক্তি! একটি অভাবিত ঘটনা। সেটিও সম্ভবপর হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দিদের মুক্তির লক্ষ্যে ছাত্রসমাজের বজ্রকঠোর মনোভাবের জন্য। এই চুক্তির আটটি শর্ত ছিল। প্রধান কয়েকটি হলো : গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তিদান; হামলার তদন্ত ও প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি প্রদান; বাংলাকে উর্দুর সমমর্যাদাদানের জন্য ব্যবস্থাপক সভায় প্রস্তাবের ব্যবস্থা; কলেজগুলোতে বাংলায় পঠন-পাঠনের সুযোগ সৃষ্টি; আন্দোলনকারীদের ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া; সংবাদপত্রগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার; ‘আন্দোলনকারীরা বিদেশের অনুচর’ সরকারের এই বক্তব্য প্রত্যাহার।  বন্দি ছাত্রদের মুক্তি দেওয়া হলেও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে এবং জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরদিনই বঙ্গবন্ধু এই বিক্ষোভে শামিল হন। শুধু শামিল নয়, বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সমাবেশে তাঁকে সভাপতিত্ব করতে হয়। এই সভাপতিত্বের ব্যাপারটি পূর্বনির্ধারিত ছিল না। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় কোনো সভায় সভাপতিত্বও করেননি বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ সে সময় বঙ্গবন্ধুর ওপরই নেতৃত্ব প্রদান করে। তাই ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে তিনি আন্দোলনের জন্য কিছু দিকনির্দেশনাও ঘোষণা দেন। 

১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ পূর্বদিনের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বানে নঈমুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায়ও ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান অংশগ্রহণ ও বক্তব্য প্রদান করেন। তবে এই অভূতপূর্ব ধর্মঘট পালনের জন্য নেতাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাজউদ্দীন আহমদ, শামসুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, নঈমুদ্দিন আহমদ, শওকত আলী, আবদুল মতিন প্রমুখ নেতার কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার ফলে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন সমগ্র পূর্ব বাংলা বাঙালির আত্মার আন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। জনসভা, মিছিল আর স্লোগানে সারা দেশ কেঁপে ওঠে, রাস্তা, দেয়াল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পোস্টারে ছেয়ে যায়। তাতে লেখা থাকে : ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এই দাবি আদায়ের জন্য ভাষাসংগ্রাম কমিটি অক্লান্তভাবে কাজ করে যায় এবং এই ভাষাসংগ্রাম কমিটির সঙ্গে ওতপ্রোত সম্পর্কে যাঁরা নিরলস কাজ করেছেন, সেসব ছাত্রনেতার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সর্বাগ্রে। তাঁর ভূমিকা ও সাহস ছিল স্মরণে রাখার মতো।

১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ২১ মার্চ ঢাকা ঘোড়দৌড় মাঠে (রেসকোর্স ময়দান) এক ভাষণে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুসহ চার-পাঁচ শ ছাত্র সেই সমাবেশে একত্রে বসেছিলেন। ছাত্ররা ধ্বনি ও হাত তুলে জিন্নাহর এই প্রত্যয়ের বিপক্ষে জানিয়ে দেয় : ‘মানি না’। এরই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের সময় জিন্নাহর বক্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা। ২১ মার্চের প্রতিবাদ থেকেই ২৪ মার্চের প্রতিবাদের সাহস সঞ্চয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের ভিত তৈরিতে এভাবেই বঙ্গবন্ধু সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা ত্যাগ করার পর ছাত্রসমাজের মধ্যে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে খানিকটা দ্বিধার জন্ম যে হয়েছিল, তা স্বীকার না করার উপায় নেই। কেননা পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তানেই জিন্নাহর গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি ছিল। জিন্নাহর মুখ দিয়ে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে বক্তব্য এলে অনেক বাঙালি ছাত্রনেতা পর্যন্ত দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। ছাত্রসমাজের এই দ্বিধাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে জিন্নাহর অবস্থানকে সমর্থন করার জন্য কেউ কেউ বক্তব্যও রাখেন। কিন্তু এখানেই আবার বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের দূরদর্শিতা লক্ষ করা যায়। ছাত্রসমাজের এই দ্বিধাকালে দ্ব্যর্থহীনভাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, নেতা অন্যায় করলেও ন্যায়ের স্বার্থে তার প্রতিবাদ করতে হবে। 

এ সময় বঙ্গবন্ধু বাঙালির রাজনৈতিক দল গঠনে তৎপর হন। আসলে ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগে’র ভূমিকা ছিল প্রতিক্রিয়াশীল। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারটি ভালো করে ছাত্রসমাজে ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন। তাই ছাত্রদের মধ্যে সমর্থন হারিয়ে ফেলে এই ছাত্রসংগঠনটি। দেশ ও ছাত্রদের স্বার্থে সঠিক পথে আন্দোলন পরিচালনার জন্য ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চের প্রথম সপ্তাহে শেখ মুজিবুর রহমানসহ চৌদ্দজন ছাত্রনেতা একটি প্রচারপত্র বিলি করেন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত হয় সরকারবিরোধী প্রথম সংগঠন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। রাষ্ট্রভাষা সংগঠনে এই ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান সরকার গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে আটকে রাখে। এদিকে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের রাজনীতিতে হত্যা-পাল্টা হত্যার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন পূর্ব বাংলার এককালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি তিনি ঢাকার পল্টন ময়দানে একটি বক্তৃতায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। অথচ তিনিই ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ছাত্রদের সঙ্গে যে আট দফা চুক্তি করেছিলেন, তাতে বাংলাকে উর্দুর সমমর্যাদা প্রদান করা হবে বলে অঙ্গীকার ছিল। যাঁরা লেখেন, এ সময় বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে তাঁর উপস্থিতি নেই। যাঁরা এগুলো লেখেন, তাঁরা প্রকৃত ইতিহাস হয় জানেন না অথবা জেনে গোপন করেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেরও স্থপতি। এই আন্দোলন কিভাবে, কারা আরম্ভ করবে, জেলে বসে তাঁর নিজের করণীয় কী হবে এসব তিনি আগেই ভেবেছেন এবং অনুসারীদের দিয়ে সে অনুসারে কাজ করিয়েছেন। ভাষাসৈনিক গাজীউল হক এ প্রসঙ্গে স্পষ্টতই লিখেছেন, ‘১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জনাব শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলে আটক ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে জেলে থেকেই তিনি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীও ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন।’ এই চিরকুটে ছিল আন্দোলন সম্পর্কে দিকনির্দেশনা। এ ব্যাপারে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু নিজে সব প্রকাশ করে গেছেন।

ফরিদপুর জেলে এসে বঙ্গবন্ধু ও মহিউদ্দিন আহমেদ পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে অনশন আরম্ভ করেন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁরা শারীরিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু অনশনরত অবস্থায় জেলে বসেই কর্তব্যরত পুলিশের কাছে সংবাদ পান—ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়েছে, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় গুলি হয়েছে, ছাত্ররা শহীদ হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চেয়ে ফরিদপুরে মিছিল হয়েছে ইত্যাদি। অনশনে বঙ্গবন্ধুর শরীরের এমন অবনতি হয়েছিল যে ডাক্তাররা পর্যন্ত আতঙ্কিত হয়েছিলেন। অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি জেল থেকে মুক্ত হয়ে বের হন।

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম বার্ষিকী পালনের সময় বঙ্গবন্ধু ঢাকায়ই থাকেন, নেতৃত্ব দেন মিছিলে, করেন বক্তৃতা। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে প্রভাতফেরি বের করা হয়; কালো পতাকা বহন করা হয়; ঢাকা শহর প্রদক্ষিণও করা হয়। এই মিছিলে নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মুর্তাজা আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পণ্ডিতরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তার পরে বাংলা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’ এভাবেই একুশের চেতনার আলোকে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সময় দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় অবশেষে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ, ১৯৭১ সালে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা