kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

বাংলা ভাষা ও বঙ্গবন্ধু

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



বাংলা ভাষা ও বঙ্গবন্ধু

প্রচ্ছদ : ফারজানা জাহান

একুশে ফেব্রুয়ারির দুটি বাস্তবতা। একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। আরেকটি আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। আমরা ৬৮ বছর ধরে তার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মেতে রয়েছি। তার অপর বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি দিই না। এ জন্য আমাদের রাজনৈতিক নেতারা দায়ী। ৬৮ বছর ধরেই তাঁরা একুশে ফেব্রুয়ারিকে তাঁদের রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের কাজে লাগিয়েছেন এবং এখনো লাগাচ্ছেন। তার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দাবি পূরণের দিকে নজর দেননি। এখনো দিচ্ছেন, তা বলা যাবে না। একটা উদাহরণ দিই। ১৯৪৮ সাল থেকে যে ভাষা আন্দোলন, তাতে প্রথমে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা খুব কম ছিল। আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল ছাত্র ও যুবসমাজ। তাদের মধ্যে মুসলিম লীগার ছাড়া ডান ও বামের বেশির ভাগ দলের সমর্থক ছিল। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে বামের আবদুল মতিন, গাজীউল হক (পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন) যেমন ছিলেন, তেমনি মধ্য বামের শেখ মুজিবুর রহমান, নইমুদ্দীন আহমদ প্রমুখ ছিলেন।

দেশের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তখন ভাষার দাবিকে সমর্থন দিলেও এই দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামতে অসম্মত ছিল। উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জিন্নাহর ভাষণের প্রতিবাদে দেশে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস থেকে যে আন্দোলন শুরু হয়, ১৯৫২ সালে তা পরিণত অবস্থায় পৌঁছে। ছাত্রসমাজ ভাষার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি স্কুল-কলেজে ধর্মঘট এবং ঢাকায় শোভাযাত্রা ও সভা করার কর্মসূচি দেয়। তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ভাষা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ১৪৪ ধারা ভাঙার বিরোধিতা করে।

তাদের এই বিরোধিতার কারণও ছিল রাজনৈতিক  উদ্দেশ্যমূলক। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ভাষার দাবিকে তারা মৌখিক সমর্থন দেবে। কিন্তু তার জন্য আন্দোলনে নেমে সরকারের সঙ্গে কনফ্রন্টেশনে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বিলম্বিত করবে না। এ জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ভবনের আমতলায় ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গাজীউল হকের সভাপতিত্বে যে সর্বদলীয় ছাত্রসভা হয়, তাতে আওয়ামী লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক উপস্থিত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিরোধিতা করেন।

সেদিন ছোট্ট একটি ঘটনা না ঘটলে হয়তো ভাষা আন্দোলন সেখানেই থেমে যেত। আমতলায় সর্বদলীয় ছাত্র বৈঠকে ছাত্রলীগের সদস্যরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। তাঁরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে ভোট না দিলে সিদ্ধান্তটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয় না। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হতবুদ্ধি। আওয়ামী লীগ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিরোধিতা করছে। এখন তারা কী করবে?

তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে। ফরিদপুর, না ময়মনসিংহ জেলে আছেন কেউ জানে না। এই সময় এক সিপাই ছাত্রলীগের তদানীন্তন সভাপতির কাছে শেখ সাহেবের লেখা একটি চিরকুট দিলেন। জেলের সিপাইদের বশ করে তাঁদের মারফত গোপনে বাইরে দলীয় নেতাদের কাছে মতামত জানানো ছিল তাঁর রাজনীতির একটা কৌশল। একুশে ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো চিরকুটে তাঁর নির্দেশ ছিল, ‘বাংলা ভাষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। প্রয়োজনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে।’ তাঁর কথা আমি হুবহু উদ্ধৃত করতে পারিনি। দীর্ঘ ৬৮ বছর আগের কথা। এই চিরকুটের কথা ছাত্রলীগের সভাপতি আমাদের জানিয়েছিলেন। তাই স্মৃতি থেকে আমাদের তখনকার মুজিব ভাইয়ের পাঠানো চিরকুটের কথাগুলো লিখলাম। এই চিরকুট আসার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ছাত্রসভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ছাত্রমিছিল রাজপথে নামে। পুলিশের গুলিতে বরকত, রফিক, সালাম, জব্বার এবং আরো কয়েকজন শহীদ হন।

পুরনো দিনের কথা আবার এখানে লিখলাম এ জন্য যে এই প্রেক্ষাপট ছাড়া ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর (তখন তিনি বঙ্গবন্ধু হননি) নেতৃত্বে উঠে আসাটা বোঝা যাবে না। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বগুণ এমনই ছিল যে জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদান যেন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ওপর বর্তায়। বায়ান্নর পরবর্তী তেপ্পান্নর প্রথম একুশে উদ্যাপনের বিরাট শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিব।

সন্দেহ নেই, ভাষা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল বামপন্থীরা। কিন্তু তাদের আন্দোলনের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিটা ছিল না। এটা যোগ করেন বঙ্গবন্ধু। বামদের সাংস্কৃতিক ভাষা আন্দোলন সাধারণ মানুষের স্তর পর্যন্ত পৌঁছেনি। ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর আরো একটি বড় কারণ ছিল, ভাষা আন্দোলন চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি একটি ইশতেহার প্রকাশ করে। তার শিরোনাম ছিল, ‘সকল ভাষার সমান অধিকার।’ অর্থাৎ তাঁরা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকার চান, সেই সঙ্গে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে প্রচলিত সিন্ধি, পাঞ্জাবি, পশতু ভাষাকেও বাংলা ভাষার মতো সমান রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে হবে।

এখানেই বামপন্থীদের সঙ্গে শেখ মুজিবের মতানৈক্য ঘটে। তিনি বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের ভাষা থাকা সত্ত্বেও তাদের একটা লিঙ্গাফ্রাংকা আছে। সেটি উর্দু। সব প্রদেশের মানুষই উর্দু বোঝে। তথাপি সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বালুচ, পশতু ভাষা সংশ্লিষ্ট প্রদেশগুলোতে সরকারি ভাষা হতে পারে। কিন্তু বাঙালিরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। তাদের মুখের ভাষাকে অবশ্যই উর্দুর পাশাপাশি সমগ্র পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।

বাংলা ভাষাকে নিয়ে এই অরাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী দাবি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ঢাকার আদিবাসী, যাঁরা এক ধরনের ভাঙা উর্দু ভাষায় কথা বলেন, তাঁরাও ভাষা আন্দোলনে সমর্থন দিতে এগিয়ে আসেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণা তাদেরও উদ্দীপ্ত করে তোলে। ঢাকার এই আদিবাসীদের অন্যতম নেতা পেয়ারু সরদার বাংলা ভাষা আন্দোলনের একজন নেতৃস্থানীয় সমর্থক ছিলেন। তিনি প্রথম শহীদ মিনারটি স্থাপনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের ইট, কাঠ, বালু, এমনকি অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। যতবার পুলিশ ও সৈন্য এসে মিনারটি ভেঙেছে, ততবার তিনি এই শহীদ বেদি স্থাপনে সাহায্য জোগান।

একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে বামপন্থী কবিরা অনেক গান লিখেছিলেন। সেগুলো তেমন জনসমাদৃত হয়নি। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্পর্শযুক্ত গানটি যখন লিখলেন আবদুল লতিফ ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়—’ শুধু শহর নয়, গ্রাম-গ্রামান্তরে গানটি ভাষা আন্দোলনে শক্তি জুগিয়েছে।

বামপন্থীরা ভাষা আন্দোলনকে একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে জাতীয়তাবাদী শক্তির সংযোগ ছাড়া যে কাজ হবে না এটা তারা বুঝতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তানে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের জোয়ারই তৈরি করেছে ভাষা আন্দোলন। এটা বুঝতে না পেরে এই আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ শেখ মুজিবের ছয় দফার আন্দোলনেও তারা প্রথমে সমর্থন জোগাতে পারেনি।

তৎকালীন চীনপন্থী বামেরা তো ছয় দফা ও তৎপরবর্তী স্বাধীনতার যুদ্ধেও সমর্থন দিতে পারেনি।

একুশের রক্তাক্ত ঘটনার পর সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান যখন মুসলিম লীগ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, তখনো বামেরা এই আন্দোলনের জাতীয়তাবাদী প্রেক্ষিতটির দিকে তাকায়নি, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এটিকে শুধু তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছে। বায়ান্ন সালে তারা একুশ তারিখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করাকে সমর্থন দিতে পারেনি, কিন্তু ১৯৫৪ সালে নির্বাচন জেতার জন্য তারা একুশকে ব্যবহার করতে চায়। ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার লেখার ভার পড়ে আবুল মনসুর আহমদের ওপর। তিনি একুশের সেন্টিমেন্ট এই ইশতেহারে ঢোকানোর জন্য নির্বাচনী ইশতেহারটির নাম দেন ‘যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা দাবি’। এই ইশতেহারের খসড়া নিয়ে আলোচনার সময় আবুল মনসুর আহমদকে শেখ মুজিব বলেন, কেবল ভোট লাভের জন্য একুশের নাম ব্যবহার করলে চলবে না, ভাষা আন্দোলনের দাবিগুলো, যেমন সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করা, পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু একাডেমির মতো পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা, বাংলার লোকসাহিত্য ও ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ ইত্যাদি দাবি যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করতে হবে। শেখ মুজিবের দাবিতে ভাষা আন্দোলনের এই দাবিগুলো যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত হয়।

১৯৫৩ সালে একুশের একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে। সভাপতিত্ব করেন ড. এনামুল হক। এই সভায় শেখ মুজিব বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ ভাগ হওয়ার প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলাম, প্রস্তাবিত পাকিস্তানে বাঙালিরা বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হওয়ায় দেশের রাজধানী, নেভাল হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে হওয়া উচিত। বাংলা ভাষার মতো সেরা ভাষা সারা পাকিস্তানে আর নেই। উর্দুও তার সমকক্ষ নয়। তাই আমরা দাবি করতে পারতাম বাংলাই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। আমরা তা করিনি। আজ তারই খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলার দামাল সন্তানদের বুকের রক্ত ঢেলে।’

১৯৫৫ সালে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতা সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও শেখ মুজিব তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘এটা বাংলা ভাষাকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার এক ধাপ মাত্র। এই ভাষা জাতীয় জীবনে ও সরকারি কাজকর্মের সর্বস্তরে ব্যবহার না করা হলে, শিক্ষার মাধ্যম না করা হলে কেবল অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কেতাবি স্বীকৃতি দ্বারা কোনো লাভ হবে না’...

তিনি বাংলাকে ব্যাবহারিক ভাষা করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। এরপর তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ‘নতুন দিন’ পত্রিকায় নিজের নামে প্রকাশিত প্রবন্ধে লেখেন, ‘মোগলরা ফার্সিকে রাজভাষা করেছিল। সাত শ বছর তা রাজভাষা হিসেবে চালু থাকলেও জনজীবনে প্রতিষ্ঠা পায়নি। ভারতের মানুষ এক শ বছরের মধ্যে তা ভুলে গেছে। বাংলাকে তেমন সরকারি ভাষা করলে চলবে না। তার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠা চাই। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক কার্যক্রমে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা দরকার। ওষুধের একটা প্রেসক্রিপশন বাংলায় লেখা যায় না। ভাষার এই দুর্বলতা দূর করা দরকার। আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক কাজকর্মে ফার্সি, উর্দু, আরবির বদলে বাংলা ভাষা ব্যবহার সর্বজনীন করা দরকার।

আমি এই নিবন্ধের গোড়ায় ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার কথা লিখেছি; সেই বাস্তবতার কথা সেই ষাটের দশকে ‘নতুন দিনে’ লিখেছিলেন শেখ মুজিব। পাকিস্তান গণপরিষদে সব বাধা অগ্রাহ্য করে তিনি বাংলায় বক্তৃতা দেন। এই সময় মুসলিম লীগের এক সদস্য টিটকারি দিয়ে বলেন, শেখ মুজিব ইংরেজি জানেন না, তাই বাংলায় বক্তৃতা দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বক্তৃতার ভাষা বদল করে বাকি সময়টা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন।

আইয়ুবি জামানায় যখন রোমান হরফে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাব উঠেছিল, তখন তিনি অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে মিলে সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং সফল হন। ছয় দফা আন্দোলন চলাকালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাম আগের বাংলাদেশ রাখার ঘোষণা দেন এবং বলেন, ‘আজ থেকে আমাদের জাতি পরিচয় হবে বাঙালি।’ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন এবং বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা করার উদ্যোগ নেন। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত ৭৩ জাতি জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে তিনি বাংলায় বক্তৃতা দেন। জাতিসংঘে এবং নিরপেক্ষ জোট সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের পর বিশ্বসভায় বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।

বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বঙ্গবন্ধু অবিচ্ছেদ্য—এ কথাটা বিনা দ্বিধায় বলা চলে।

(লন্ডন, মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা