kalerkantho

সোমবার । ১১ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৬ জুলাই ২০২১। ১৫ জিলহজ ১৪৪২

ক্ষুব্ধ চেতনায় একুশের স্মৃতি

আহমদ রফিক   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



ক্ষুব্ধ চেতনায় একুশের স্মৃতি

একুশের রক্তঝরা ঘটনাবলির স্মৃতি ছয় দশকেও হারিয়ে যায়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে পুলিশের টিয়ারগ্যাস আর লাঠিচার্জ, ব্যাপক গ্রেপ্তার আর ভরদুপুরের গুলিতে ছাত্র-অছাত্র হত্যার ঘটনা বড় মর্মস্পর্শী। নিরস্ত্র ছাত্রসমাবেশে পুলিশের গুলিচালনা এখনো অস্বাভাবিকই মনে হয়। তখন নয়, পরবর্তীকালের বিচার-ব্যাখ্যায় মনে হয়েছে পুলিশ কর্মকর্তা (বাঙালি-অবাঙালি) ও ম্যাজিস্ট্রেট-আমলার অহমবোধ সম্ভবত ঘটনার মূল কারণ।

একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিল্ডিং প্রাঙ্গণে সকাল ১০টার দিকে ক্রমে জমায়েত হওয়া ছাত্রছাত্রীদের স্লোগান ও তৎপরতা ঠেকাতে সামনের রাস্তায় অবস্থান নেওয়া পুলিশ বাহিনীর ক্রমাগত কাঁদানে গ্যাস বর্ষণ এক অসহনীয় অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। তাই মধুর ক্যান্টিন ও আশপাশে দাঁড়ানো ছাত্রদের আলোচনা, তর্কবিতর্ক ও আমতলার ছাত্রসভা সংক্ষেপে শেষ করতে হয়।

সভার সিদ্ধান্ত, ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। গন্তব্যস্থল মেডিক্যাল হোস্টেলের নিকটবর্তী পরিষদ ভবন। উদ্দেশ্য ব্যবস্থাপক পরিষদের প্রধান সদস্যদের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়, যাতে তাঁরা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তা গণপরিষদে পাস করানোর ব্যবস্থা নেন। এই সহজ, স্বচ্ছ ঘটনাও পছন্দ হয়নি সরকার ও তার প্রশাসনের। তাই টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও গ্রেপ্তার।

গ্রেপ্তারের সংখ্যা এতই যে পরে শুনেছি তাদের অনেককে তেজগাঁও, কুর্মিটোলায় ছেড়ে দিয়ে আসা হয়, যাতে তারা বিকেলনাগাদ ঢাকায় ফিরে আন্দোলনে যোগ দিতে না পারে। যোগাযোগব্যবস্থা তখন এমনই ছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আমার কয়েকজন বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ পরিচিতজন ছিলেন, যেমন হাবিবুর রহমান শেলী, আনোয়ারুল হক খান, আলী আজমল, নেয়ামাল বাসির প্রমুখ।

পুলিশের এই লাঠিবাজি, গ্রেপ্তার ও টিয়ারগ্যাস বৃষ্টির মধ্যেই অধিকাংশ ছাত্র পুলিশের বাধা ডিঙিয়ে নানাপথ ধরে মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে এসে হাজির। আর আমরা কয়েকজন ছাত্র ভেতরের পাঁচিলের ভাঙা ফোকর বড় করে নিয়ে সে পথে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে, সেখান থেকে হোস্টেল জমায়েতে যোগ দিই। নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ছাত্র-যুবা থেকে যান পেছনে মধুর ক্যান্টিনে, সম্ভবত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায়।

দুই

১৪৪ ধারা জারি ও তা ভাঙার পরিস্থিতি বুঝতে একটু পেছন ফিরতে হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের আন্দোলন স্থগিত করার পর গঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মতিন। ভাষা আন্দোলন নতুন করে সংগঠিত করতে তাঁর নিরলস চেষ্টায় ১৯৫০ থেকে ১৯৫১ সাল অবধি সংঘটিত তৎপরতায় অংশ নিয়েছি। যেমন মূলনীতি কমিটির উর্দু রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সভা, সমাবেশ ও মিছিলে। মনে আছে ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশে রাস্তায় পুলিশের হামলা, পরে সমাবেশ, বক্তৃতা, প্রস্তাব ইত্যাদি ঘটনা। শেষ পর্যন্ত ওই কমিটির প্রস্তাব স্থগিত। ছাত্রদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা সার্থক। রাজনীতিকদেরও স্বস্তি।

ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি এভাবে পায়ে পায়ে ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পৌঁছে। আর জানুয়ারির শেষদিকে আবার অঘটন। ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে এক বক্তৃতায় জানান যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হতে যাচ্ছে। এ ঘোষণায় ছাত্ররা উত্তোজিত। শুরু হয় প্রতিবাদী তৎপরতা। শিক্ষায়তনে ধর্মঘট, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রসভা, ৩১ জানুয়ারি ভাসানীর সভাপতিত্বে পুরান ঢাকায় বার লাইব্রেরিতে কর্মিসভা ইত্যাদি।

সে সভায় গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। কাজী গোলাম মাহবুব আহ্বায়ক। এতে ছিল রাজনীতিকদের প্রাধান্য। রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য ছিল ভাষা আন্দোলনকে তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা। এখানে ছাত্রদের সঙ্গে তাঁদের দ্বন্দ্ব নানা ঘটনায় পরিস্ফুট। কিন্তু আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্র-যুব সমাজ। তাই তাঁরা আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখতে বারবার চেষ্টা করেছেন। প্রয়োজনে সরকারের সঙ্গে আপসবাদী-নীতি নিয়ে এগিয়েছেন। একই পথ অনুসরণ করেছেন তাঁদের সমর্থক ছাত্রনেতাদের একাংশ। ছোটখাটো একাধিক ঘটনায়ও এমনটাই দেখা গেছে।

যেমন ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেলতলায় ছাত্রসভায় আন্দোলন প্রদেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২১ ফেব্রুয়ারিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করার পর যে প্রতিবাদী মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত হয়, এর বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করেন কিছুসংখ্যক ছাত্রনেতা। কিন্তু সাধারণ ছাত্রসমাজ তা না মেনে রাজপথে বেরিয়ে আসে এবং মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউসের সামনে প্রতিবাদী স্লোগানে পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা লিখছি।

একইভাবে একুশের প্রস্তুতি দেখে শঙ্কিত প্রশাসন যখন ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা শহরে এক মাসের জন্য সভা-সমাবেশ-মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ১৪৪ ধারা জারি করে, তখন রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভাণ্ডার কর্মসূচির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, যাতে সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাতে যেতে না হয়। তাই তারা ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সভায় ১১/৩ ভোটে ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ছাত্র নেতৃত্ব সে সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হয়নি। সাধারণ ছাত্রসমাজ তো নয়ই।

সেদিন সন্ধ্যার পর ঢাকা হলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জানতে পারি ওই সব হলের ছাত্রদের সবাই ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে। আনোয়ার, মৃণাল, গাজীউল, মশারফদের মুখে এমন কথাই শোনা গেল। যে মনোভাব মেডিক্যাল হোস্টেলের ছাত্রদের মধ্যেও বিকেলে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় দেখা গিয়েছিল। এ ব্যাপারে ছাত্রসমাজ একাট্টা। আর সর্বদলীয় নেতাদের আপসবাদী সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে পাল্টা ছাত্রসভা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্র-যুবনেতৃত্ব।

এ সিদ্ধান্তের পক্ষে গোটা ছাত্রসমাজ যে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সমর্থন জানাবে, সেটাও আমাদের অজানা ছিল না। একুশ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে নবকুমার স্কুল, জগন্নাথ কলেজ, মিটফোর্ড স্কুল, পুরান ঢাকার দু-একটি মহল্লা থেকে প্রগতিশীল ছাত্রকর্মীরা দু-একজন করে জমায়েত হতে থাকে, উদ্দেশ্য আমতলার ছাত্রসভায় যোগদান। সেদিন খুব ভোরে আমি ও বন্ধু আলী আজমল ছাত্র এলাকার অবস্থা পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসে দেখি চারদিকে সুনসান স্তব্ধতা। এর মধ্যে দূরে মর্নিং নিউজ পত্রিকার অস্টিন গাড়িটাকে অতিদ্রুত পাশকাটিয়ে চলে যেতে দেখি। গাড়ির গায়ে বড় অক্ষরে লেখা 'ভয়েস অব নেশন', অবশ্য ইংরেজিতে।

তিন

এমনই ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্র এলাকার পরিস্থিতি এবং দুপুর ১২টার দিকে মেডিক্যাল হোস্টেলে ছাত্রদের জমায়েত। তাতে ছিল কিছুসংখ্যক অছাত্রেরও উপস্থিতি। তাদের লক্ষ্য পুলিশের বাধা অতিক্রম করে পরিষদ ভবনের সামনে পৌঁছানো। কিন্তু ইতিমধ্যে হোস্টেলের সামনে সেক্রেটারিয়েট রোড ও ফুলার রোডজুড়ে পুলিশ বাহিনী জোরালো অবস্থান নিয়েছে, যাতে প্রতিবাদী ছাত্ররা পরিষদ ভবনের সামনে পৌঁছাতে না পারে। এ কাজটি তারা ঠিকঠাকমতোই করতে পেরেছিল, অবশ্য কয়েকজন নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে হত্যা করে।

হোস্টেল প্রাঙ্গণে সেদিন দুপুরে জমজমাট ছাত্রদের উপস্থিতি। থেকে থেকে স্লোগান উঠছে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই', 'রাজবন্দিদের মুক্তি চাই', 'পুলিশি জুলুম চলবে না' ইত্যাদি। ইতিমধ্যে ২০ নম্বর ব্যারাকের সর্ব পশ্চিমপ্রান্তে ১ নম্বর কক্ষে স্থাপিত হয় মেডিক্যাল ছাত্রদের চেষ্টায় কন্ট্রোল রুম, মূলত আন্দোলনসহায়ক প্রচারের উদ্দেশ্যে। এতে কলেজ ইউনিয়নের মাইক ব্যবহার করা হয়। এ কন্ট্রোলরুমের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র দেড় দিন। ২২ ফেব্রুয়ারিই সশস্ত্র পুলিশ ও ইপিআর এ প্রচারযন্ত্রটি কেড়ে নেয় মূলত এর হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছাত্রদের তৎপরতা ছিল স্লোগান ও পরিষদ ভবনে পৌঁছানোর চেষ্টায় সীমাবদ্ধ। পরিষদ অভিমুখে যাত্রী এমএলএদের কাছ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে প্রস্তাব আদায়ের কাজটি সম্পন্ন করা যায়নি পুলিশে তৎপরতার কারণে। তবে কয়েকজন তরুণ মেডিক্যাল ছাত্র অন্তত মানিকগঞ্জের প্রবীণ এমএলএ সৈয়দ আওলাদ হোসেনকে হোস্টেলে নিয়ে আসতে পেরেছিল এবং তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে পরিষদে প্রস্তাব তোলার স্বীকারোক্তি দিয়ে ছাত্রদের হাত থেকে ছাড়া পান। অথচ নিরুপদ্রবে পরিষদ ভবনে পৌঁছে তিনি সে কথা ভুলে গিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত একটি অপ্রিয় তথ্য বলতেই হয়। ছাত্র জমায়েত যখন বারবার পুলিশি বাধা অতিক্রম করার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছিল, তাদের সে চেষ্টা ছিল একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত। পরিচিত ছাত্র-যুবনেতাদের কেউ সেখানে নেতৃত্ব দিতে উপস্থিত ছিলেন না। এ সত্য পরে আবদুল মতিন স্বীকার করেছিলেন। গুলি চলার সংবাদ শুনে তাঁরা অকুস্থলে ছুটে আসেন। এ সময়টায় তাঁদের কয়েকজন মধুর ক্যান্টিনে বসে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। ছাত্র জমায়েতের করণীয় বিষয়টি তাঁদের মাথায় ছিল না।

ইতিমধ্যে গুরুতর যা কিছু ঘটার তা ঘটে গেছে। অর্থাৎ স্লোগান ও বাইরে যাওয়ার চেষ্টা বন্ধ করতে না পেরে, টিয়ারগ্যাস আর লাঠিচার্জ বিফলে যাচ্ছে দেখেই বোধ হয় পুলিশ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে সিদ্ধান্ত ছিল অমানবিক ও যুক্তিহীন। কারণ ছাত্রদের তরফ থেকে পুলিশের ওপর কোনো আক্রমণ চলেনি। তাই পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে-এমন যুক্তি ধোপে টেকে না।

তবে হ্যাঁ, পুলিশের দিকে কিছুসংখ্যক ছাত্রের ইটের টুকরা ছুড়ে মারা-সেটা যেমন এদিক থেকে হয়েছে, তেমনি পুলিশও পাল্টা সেগুলো হোস্টেলের দিকে ছুড়ে মেরেছে ছাত্রদের লক্ষ্য করে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এ কথা বলতে পারি। তাতে গুলি চালানোর পক্ষে যুক্তি তৈরি হয় না। পরবর্তী সময়ে এলিস কমিশন এ মিথ্যাকেই সত্য হিসেবে তুলে ধরেছিল নূরুল আমীন সরকারকে খুশি করতে। পরিণামে ভালো ইনাম পেয়েছিলেন শ্বেতাঙ্গ বিচারপতি এলিস।

ওই এলিস কমিশনেরই তথ্যমতে পুলিশ ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় বেলা ৩টা ২০ মিনিটে, যেমন হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েত ছাত্রদের লক্ষ্য করে, তেমনি রাস্তায়, খেলার মাঠের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে দাঁড়ানো ছাত্র-জনতার দিকে। আর তাতেই কয়েকটি মৃত্যু, কয়েকজনের শাহাদাতবরণ। সত্যি আমাদের কারো ধারণায় ছিল না যে পুলিশ গুলি ছুড়তে পারে। কারণ টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচালনা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তাহলে কেন গুলি? কারণ সম্ভবত একটাই। পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাদের অহমবোধ। 'কেন ওরা চুপ করছে না, কেন পিছু হটছে না'-এটাই বোধ হয় ছিল তাদের মনের কথা। কিন্তু উদ্দীপ্ত তারুণ্য তো সহজে পিছে হটে না, আদর্শ যখন তাদের মাথায় থাকে। আর তা যদি হয় মাতৃভাষার অধিকারের মতো বিষয়, তাহলে তো কথাই নেই। সে ক্ষেত্রে প্রাণ দিতেও কসুর করে না কিশোর বা তরুণরা। তেমনটিই ঘটেছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে এবং পরে। সেদিন প্রাণ দিয়ে ভাষার অধিকার রক্ষা করতে চেয়েছিল ছাত্র-জনতা। এখানেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মহত্ত্ব।

একুশের সেই কাল-দুপুরে প্রথম শহীদ মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র রফিকউদ্দিন আহমেদ। বাদামতলী 'কমার্শিয়াল আর্ট প্রেসের মালিকের জ্যেষ্ঠ সন্তান রফিক, আন্দোলন-সচেতন রফিকউদ্দিন। তাঁর মাথায় গুলি লাগে। বোঝা যায়, পুলিশ হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে গুলি চালিয়েছিল, ভয় দেখিয়ে ছাত্রদের নিরস্ত্র করতে নয়। তাও রাস্তা থেকে নয়, গুলি চালায় খোলা হোস্টেল গেটের সামান্য ভেতরে ঢুকে। তা না হলে প্রাঙ্গণের পশ্চিম প্রান্তে ২০ নম্বর ব্যারাকের সামনে দাঁড়ানো আবদুল জব্বার কিভাবে আহত হন। তাঁর তলপেটে গুলি লাগে। আমার দুই সহপাঠী রাব্বী ও সিরাজের সঙ্গে হাত লাগাই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।

অবশ্য আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হন গেটের ডানপাশে ১২ নম্বর ব্যারাকের বারান্দায়। ওই ব্যারাকের বাসিন্দা তাঁর বন্ধু মুর্শেদ নেওয়াজের সঙ্গে কথা বলে বারান্দায় এসে দাঁড়ানো অবস্থায় উরুতে গুলিবিদ্ধ হন। শেষোক্ত দুজন, আমার ধারণা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে প্রাণ হারান। প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিনকে হাসপাতালে নিয়ে যায় আমার অন্য দুই পাঠীসহ কয়েকজন ছাত্র। এভাবেই একুশের (১৯৫২) রক্তিম যাত্রা শুরু, যা অব্যাহত থাকে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারির মিছিলেও।

সেদিন (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে গায়েবানা জানাজা ও শোকসভার (ইমাদুল্লাহর সভাপতিত্বে) পর শুধু ছাত্ররাই নয়, শহর ঢাকার তারুণ্য ও যৌবন মিছিলে শামিল। ছাত্র আন্দোলন গণ-আন্দোলনে পরিণত। সেদিনও গুলি পুলিশ ও ইপিআর জওয়ানদের, সেদিনও মৃত্যু প্রতিবাদী মিছিলে। সফিউর, আউয়াল, ওহিউল্লাহ, সিরাজুদ্দিন প্রমুখ শহীদ। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মিছিলে নয়া স্লোগান 'শহীদ স্মৃতি অমর হোক।'

আর সে অমরত্ব এনে দিয়েছিল মেডিক্যাল হোস্টেলের রাজনীতিমনস্ক কিছুসংখ্যক ছাত্র ২৩ ফেব্রুয়ারি একরাতের শ্রমে ছোটখাটো একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে। সেটিই ছিল এক চমকপ্রদ ঘটনা। ওই স্লোগানই তাঁদের উদ্বুদ্ধ করে সকালে কয়েকজনের আলাপচারিতায়, বিশেষ কয়েকজনের তৎপরতায় এবং অনেকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নিষ্ঠায়। রাত ১০টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত সবাই ব্যস্ত কাজে, যেমন হাতে হাতে ইট বহনে, স্ট্রেচারে করে বালি আর সিমেন্ট বহনে।

গোলাম মাওলা, শরফুদ্দিন আহমদ, বদরুল আলম, সাঈদ হায়দার, আবুল হাশেম, ফজলে রাব্বী এমন গুচ্ছ গুচ্ছ নাম। একটি স্থাপত্য নির্মাণে যা কিছু কাজ, সবই করতে হয় এই ছাত্রদের। বন্ধু আলী আছগরের সঙ্গে যাই হোসনি দালান এলাকার পিয়ারু সর্দারের কাছে সিমেন্ট গুদামের চাবি আনতে। সরদার সাহেবের ইট-বালি-সিমেন্টে স্মৃতিস্তম্ভের কাজ সম্পন্ন। বলতে হয় একটি ব্যতিক্রমী সৃষ্টি সমাপন, যা পরে জাতীয় শহীদ মিনার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার তৈরির প্রেরণা। সে শহীদ মিনার শোক ও প্রতিবাদের স্থায়ী প্রতীক ও প্রেরণা।

পরদিন রবিবার, সরকারি ছুটির দিনে সূর্যের আলোয় ঝলমল করে ওঠা শহীদ মিনার ঢাকাবাসীর জন্য আনন্দিত বিস্ময় এবং নূরুল আমীন সরকারের জন্য আতঙ্ক। কারণ শহর ঢাকার মানুষ দিনভর শহীদ মিনারে ভিড় জমিয়েছে বিনম্র শ্রদ্ধায়, ক্ষুব্ধ প্রতিবাদে। আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, যার নকশাকার মেডিক্যাল ছাত্র বদরুল আলম। এ শহীদ মিনারের প্রেরণায় দেশময় শিক্ষায়তনে গড়ে ওঠে নানা আকারের মিনিয়েচার শহীদ মিনার, যা একই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে।

অগত্যা প্রচণ্ড দমননীতি নুরুল আমিন সরকারের, আন্দোলন দমন করতে। ব্যাপক গ্রেপ্তার। বাদ যান না শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-যুবনেতা-এমনকি এমএলএ, মায় সরকারদলীয়। চলে অপপ্রচার বেতার-ভাষণে এবং লাখ লাখ কপি ইশতেহার বিলি করে। সে ইশতেহার অবশ্য ছাপা হয় সরকারি প্রেসে। নৈতিকতার বিন্দুমাত্র উপস্থিতি ছিল না খোদ মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রীবর্গ ও আমলাদের মধ্যে। ছাত্রাবাসের প্রচারযন্ত্র (মাইক) জব্দ করা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা, ছাত্রদের হল-হোস্টেল ছাড়তে বাধ্য করা, নারায়ণগঞ্জে সরকারি ষড়যন্ত্রে পুলিশ হত্যা ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের ইতি। প্রদেশের অন্যত্র তখনো চলছে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, যা নিয়মমাফিক একসময় শেষ হয়।

জনসংশ্লিষ্ট ভাষা আন্দোলন দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে বাস্তবিকই এক বাঁকফেরা চরিত্র বদল ঘটায়, যা পরবর্তী রাজনীতির জন্য (ষাটের দশকে) তৈরি করে জাতীয় চেতনার এক ইতিবাচক অধ্যায়, যা পরিণতি পায় ঊনসত্তরের গণজাগরণে ও একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে। এখানেই একুশের মহত্ত্ব, একই সঙ্গে একুশে চেতনার অপূর্ণতা যে স্বাধীন ভাষিক জাতিরাষ্ট্রে রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও জাতীয়জীবনে এর প্রতিফলন নেই। সেখানে ঔপনিবেশিক ইংরেজির সর্বত্র বিরাজমান প্রাধান্য।

 



সাতদিনের সেরা