kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

[ মনোভূমি ]

প্রেম ধীরে মুছে যায়...

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



প্রেম ধীরে মুছে যায়...

রেলস্টেশনের পাশের ছোট্ট এক চায়ের দোকানে বেঞ্চের দুই পাশে পা ছড়িয়ে দিয়ে আমার মুখোমুখি বসে আছে সুমন, আমার বর। সন্ধ্যায় এই দোকানে চায়ের সঙ্গে আড্ডা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ইদানীং। কিন্তু হঠাৎ একটা ব্যাপার লক্ষ করে চুপ হয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের কথা।

বিজ্ঞাপন

গণজাগরণ মঞ্চের সেই রক্তে আগুন লাগা দিনগুলো আমার কাটছিল আফজালের সঙ্গে অজেয়, প্রবল প্রণয়ে। তিনি তখন আইসিডিডিআরে চাকরি করেন। অফিসের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময় আমাদের কাটে শাহবাগে, গণজাগরণ মঞ্চে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে, টিএসসিতে। উত্তাল রাজনীতি আর উন্মত্ত ভালোবাসা মিলেমিশে আমার তখন কী এক অদ্ভুত ঘোরলাগা সময় কাটছিল!

ধীরে ধীরে গরম পড়তে শুরু করে ঢাকায়। শীতের সেই ফুলশার্ট, হাতাকাটা সোয়েটার পরার দিন ফুরিয়ে আসে। আফজাল কিছুটা বোহেমিয়ান, উদাসীন গোছের মানুষ। কেতাদুরস্ত পোশাকে অফিসে যেতে তাঁর মন চাইত না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, টি-শার্ট পরে অফিসে গিয়ে প্রথা ভাঙার দলে নাম লেখাবেন। সেই উদ্দেশ্যে কয়েকটা নতুন টি-শার্ট কেনা হলো। সেগুলোর মধ্যে ‘Back to School’ লেখা ছাইরঙা একটা টি-শার্ট তাঁর বেশ পছন্দ হয়েছিল। দিনের পর দিন তিনি ওই একই টি-শার্ট পরে অফিসে যেতেন। এমনকি ছুটির দিনে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেও ওটাই পরে আসতেন। অফিস কিংবা আমি ছাড়া অন্য কোনো কাজে বের হলেও একাধিকবার ওই টি-শার্ট পরেই বেরিয়েছেন। এটা নিয়ে আমরা দুজন বেশ হাসাহাসি করতাম। তিনি বলেছিলেন, ‘এই টি-শার্টটা তোমার মতো। একে ভালো লাগার পর অন্য কিছু আর ভালো লাগে না আমার। ’

ওই ঘটনার প্রায় ৯ বছর পর আজকের সন্ধ্যায় সুমন সেই একই টি-শার্ট পরে আমার সামনে বসে চা খাচ্ছে। এটা যে আজকেই প্রথম পরেছে, তা নয়। সুমনের কলেজের তিন বন্ধু আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছিল সপ্তাহখানেক আগে। চার বন্ধু এক রকম টি-শার্ট পরবে বলে তারা ঢাকা থেকে এটা নিয়ে এসেছিল। সবাই একই রকম টি-শার্ট পরেছে। আমি তাদের ছবিও তুলে দিয়েছি। তারা চলে যাওয়ার পর সুমন ওই টি-শার্ট আরো কয়েকবার পরেছে। কিন্তু একবারও কেন জানি আমার মনে পড়েনি যে ওই টি-শার্ট আফজালের ছিল কিংবা ওই টি-শার্ট নিয়ে এত বিস্তৃত ঘটনা আছে।

চায়ের দোকানে ব্যাপারটা হুট করে মনে পড়ায় থমকে গিয়েছিলাম বেশ কিছুক্ষণের জন্য। যে আফজালকে ছাড়া একসময় নিজেকে মৃতবৎ ভাবতাম, কী অবলীলায় তাঁকে বেমালুম ভুলে গেছি! সুমনের পরনে ওই টি-শার্ট এত দিন দেখেও তাঁর কথা একবারের জন্যও মনে পড়েনি!

ভালোবাসাও ধীরে ধীরে মুছে যায়, ক্ষয়ে যায়, বিবর্ণ হয়ে যায়। নতুন এক ঝড় এসে আগের সব কিছুকে ম্লান করে দেয়। যাকে আজ জীবনের আরাধ্য মনে করছি, তাকেও হয়তো ভুলে যাব একদিন!

—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, লালমনিরহাট।



সাতদিনের সেরা