kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

[ কালের সাক্ষী ]

৫০০ বছরের মুকুট

এই মুকুটের সূর্য ডুবত না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূগোল, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও রাজনীতির বিরাট ইতিহাস। ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রয়াণে সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছে মুকুটটি। লিখেছেন রিদওয়ান আক্রাম

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৫০০ বছরের মুকুট

সেই পনেরো শতক থেকে এখনো সমাসীন। ‘দি ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউন’ নামের এই মুকুট যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তাই এর গুরুত্বও অনেক। একে সুদৃশ্য করার কৃতিত্ব দিতে হবে সপ্তম হেনরি অথবা তাঁর সন্তান অষ্টম হেনরিকে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমবারের মতো এই মুকুটের কথা জানা যায় ১৫২১ সালে। তখন থেকেই মুুকুটে নানা রকম রত্ন সংযোজন হতে থাকে। এই ধারা চলমান থাকে ১৫৩২ সালে, ১৫৫০ সালে এবং পরেও অনেক বছর। ১৬৩১ সালে ড্যানিয়েল মাইটেনের আঁকা ছবিতে রাজা প্রথম চার্লসকে সেই মুকুট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এতে দেখা যায় মুক্তা ঝলমল করছে। এর মেডেলিয়ানে খোদাই করা ছিল পাঁচটি পদ্ম ফুল, যেগুলো ছিল যিশুখ্রিস্ট, ভার্জিন মেরি ও সেন্ট জর্জের প্রতীক। এই মুকুটে সোনার পরিমাণ ছিল সাত পাউন্ড। ১৬৪৯ সালে রাজা প্রথম চার্লসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যুর পর মুকুটটি ধ্বংস করে ফেলা হয়। এতে থাকা মূল্যবান রত্নগুলো বিক্রি করে ফেলা হয়।

১৬৬০ সালে রাজতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের পর নতুন মুকুট তৈরি করেন রাজা প্রথম চার্লসের পুত্র দ্বিতীয় চার্লস। সেটিই চলছিল রানি ভিক্টোরিয়ার অভিষেকের আগ পর্যন্ত। তবে ১৮৩৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার অভিষেকের সময় নতুন আরেকটি মুকুট তৈরি করা হয়। এখনকার যে ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউনটি দেখা যায়, তা ১৯৩৭ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জের অভিষেকের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বানিয়েছিল গ্যারেড অ্যান্ড কোং। এটি রানি ভিক্টোরিয়ার মুকুটটির আদলেই তৈরি করা হয়। তবে আরো হালকা আর আরামদায়ক করে। এটিই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ নিজের অভিষেকের সময় ব্যবহার করেছিলেন। তবে সেটিতে খানিক পরিবর্তন এনেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এভাবে ওই মুকুটে মেয়েলি ভাব আনা হয়েছে। এটি করতে গিয়ে মুকুটটির উচ্চতা প্রায় এক ইঞ্চির মতো কমানো হয়েছে।

 

দি ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউন

সেই পনেরো শতক থেকে চালু হওয়া মুকুটটিতে বিভিন্ন সময়ে নানা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউনের আধুনিক সংস্করণ সেন্ট এডওয়ার্ডস ক্রাউনের অনুরূপ। তবে কিছুটা খাটো আর রত্নখচিত। এর চারদিকে চারটি ক্রসকে মূল ভিত্তি ধরে সেগুলোর ফাঁকে লিলি ফুল দিয়ে অলংকরণ করা হয়েছে। এসব একটি ফাঁকা ফ্রেমের মতো দাঁড়িয়ে যায়। সেই ফ্রেমের ভেতরে আছে সাদা রঙের পশমি কাপড় দিয়ে বর্ডার করা রক্তবর্ণের মখমল টুপি। মুকুটের কাঠামোটি সোনার তৈরি আর এই মুকুটের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অমূল্য রত্ন মুড়ে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে রুপা। অল্প হলেও প্লাটিনাম ধাতুও ব্যবহার করা হয়েছে।

এবার আসা যাক এই মুকুটে ব্যবহৃত বিভিন্ন রত্নের সংখ্যায়। এতে আছে দুই হাজার ৮৬৮টি হীরা, ২৭৩টি মুক্তা, ১৭টি নীলকান্তমণি, ১১টি পান্না, পাঁচটি রুবিসহ অনেক মূল্যবান রত্ন। তবে এই মুকুটে ব্যবহার করা উল্লেখযোগ্য রত্নের মধ্যে আছে কালিনান-টু, সেন্ট এডওয়ার্ডের নীলা ও ব্ল্যাক প্রিন্সেসের রবি। এসব নিয়েই এ মুকুটের ওজন ০.৯১ কেজি। এটির উচ্চতা ১২.৪ ইঞ্চি। যখন এটি ব্যবহার করা হয় না, তখন রাখা হয় ‘টাওয়ার অব লন্ডন’-এর জুয়েল হাউসে। প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই প্রাসাদ-দুর্গ যুক্তরাজ্যের টেমস নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত।

 

সেন্ট এডওয়ার্ডের নীলা

এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শেষ অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা এডওয়ার্ড দ্য কনফেসরের। নিজের অভিষেকের সময় প্রথমবারের মতো এই নীলাটি আংটিতে পরেছিলেন। সময়টি ১০৪২ সাল। পরে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড আর আয়ারল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস (রাজত্বকাল ১৬৪৯-১৬৫১ সাল) এটিকে কেটে আজকের রূপ দেন। ১৮৩৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া তাঁর রাজ্যাভিষেকের সময় পাথরটিকে মুকুটের ওপরের ক্রসের মধ্যে বসিয়ে দেন।

 

ব্ল্যাক প্রিন্সের রুবি

এই রত্ন প্রায় ১৭০ ক্যারেটের (৩৪ গ্রাম)। এটি বর্তমানে ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউনের সামনের দিকের ক্রসের মাঝে স্থাপন করা আছে। কালিনান-টু হীরকখণ্ডের ওপরে এটির স্থান। এটির মালিক ‘ব্ল্যাক প্রিন্স’-এর আসল নাম ‘এডওয়ার্ড অব উডস্টক’ (১৩৩০-১৩৭৬ সাল), যদিও ইনি রাজা হতে পারেননি। বাবা রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ডের মৃত্যুর এক বছর আগেই মারা যান। সতেরো শতকে এই রুবির দিকে নজর পড়ে রাজা প্রথম জেমসের। তিনি এটিকে ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউনে স্থান দেন। ১৮৩৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার অভিষেকের সময় নতুন একটি ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউন বানানো হয়। এতে ব্যবহার করা হয় মোট তিন হাজার ৯৩টি রত্ন। এর মধ্যে এটি বিশেষ।

 

কালিনান-টু

৩১৭ ক্যারেট ওজনের এই হীরকখণ্ডটি কাটা হয়েছে আয়তক্ষেত্রাকার কুশনের মতো করে। এটি বসানো হয়েছে মুকুটের বৃত্তাকার সামনের অংশে। কালিনান খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ১৯০৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিমিয়ার খনিতে। পরে ট্রান্সভাল সরকার এটি উপহার দেয় ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ড সেভেনকে। রাজা সেটিকে কয়েকটি খণ্ড করেছিলেন। সবচেয়ে বড়টি মানে কালিনান-ওয়ান পরিচিত স্টার অব আফ্রিকা নামে আর দ্বিতীয়টি বসানো হয় এই ইমপেরিয়াল স্টেট ক্রাউনে।

মুকুট পরা অবস্থায় কুইন এলিজাবেথ কুইন মাদার

অনেকের ধারণা, ব্রিটেনের রাজা বা রানির মুকুটে বিখ্যাত ‘কোহিনূর’ থাকে। আসলে এটি আছে সদ্যঃপ্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মা ‘কুইন এলিজাবেথ কুইন মাদার’-এর জন্য তৈরি করা মুকুটে।

 



সাতদিনের সেরা