kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস

আমিই না হয় উদাহরণ হব

গারো নৃগোষ্ঠীর মধ্যে প্রকৌশল বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক রিচি রেনেসাঁ দারু। এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করা গারোদের প্রথম ব্যক্তিও তিনি। এখন গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের আরলিংটনের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে। এই স্বপ্নযাত্রার গল্প শুনিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমিই না হয় উদাহরণ হব

রিচি রেনেসাঁ দারু। ছবি : সংগৃহীত

ময়মনসিংহের মেয়ে আমি। মা মুকুল দারু, বাবা অ্যান্থনী নকরেক। দুজনই চাকরিজীবী ছিলেন। ছোটবেলায় মান্দি ভাষায় কথা বলতাম।

বিজ্ঞাপন

বাংলা শিখেছি স্কুলে গিয়ে। প্রথম দিন স্কুলে গিয়ে আশপাশের সবাইকে কেমন অচেনা লাগছিল। কারণ তারা সবাই বাংলায় কথা বলছিল। আগামাথা কিছুই বুঝতাম না। বাংলা জানি না বলে অনেকের হাসির পাত্র হয়েছি। ফলে সব সময় চাইতাম, এমনভাবে ভাষাটা শিখব যেন খুব সুন্দর করে গুছিয়ে বলতে পারি।

গারোদের মধ্যে তখন বিজ্ঞান বিভাগে পড়া শিক্ষার্থী ছিল খুবই কম। আমার ভাই চেয়েছিল ডাক্তার হতে। তার দেখাদেখি আমিও বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। পরিচিতজনদের মধ্যে বিজ্ঞানে পড়ে এমন কেউ ছিল না। উচ্চতর গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞান বুঝতে পারছিলাম না বলে একদিন বাসায় ফিরে কান্নাকাটিও করেছি। কয়েক দিন পর দাদার এসএসসির ফল বেরোল। এ প্লাস পাননি। খুব খারাপ লাগল। তখনো আমাদের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা হয়নি। তাই বিভাগ পরিবর্তনের কথা ভাবছিলাম। দাদা অনেক বুঝিয়ে পরে বললেন, ‘জানি তুই আমার চেয়ে ভালো করবি। আমাদের স্বপ্ন তোর দ্বারা পূরণ হবে। ’ সেদিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, যত কষ্টই হোক, বিজ্ঞান বিভাগেই পড়ব। প্রকৌশলী হব। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকি। পরিশ্রম বৃথা যায়নি। ২০১০ সালে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১২ সালে হলি ক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছি। এসএসসি ও এইচএসসিতে এ প্লাস পেলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), চুয়েট এবং মিলিটারি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে (এমআইএসটি) সুযোগ পেয়েছিলাম। বুয়েটে স্থাপত্যে, ঢাবিতে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং চুয়েটে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। হলিউডের বিভিন্ন সিনেমা দেখে তত দিনে মনে মনে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার স্বপ্ন বুনছি। তা ছাড়া ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পর এমআইএসটিতে একটি ওরিয়েন্টেশন ক্লাস হলো। সেখান থেকে জানলাম, এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলে বাংলাদেশ বিমানেও প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে। তাই সাতপাঁচ না ভেবে এমআইএসটিতে ভর্তি হলাম। খবরটি শুনে অনেকে বাড়িতে এসেছিল আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে। আবার অনেকে বলত, ইঞ্জিনিয়ারিং মেয়েদের জন্য নয়। অনেকের ধারণা ছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া মানে মেকানিকস হওয়া, সিএনজি ঠিক করা। অবশ্য এ জন্য তাদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। কারণ গারোদের কোনো মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়েছে—এমন উদাহরণ ছিল না তাদের সামনে। নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে ঠিক করলাম, আমিই না হয় উদাহরণ হব। ক্যাম্পাসে সিনিয়ররাও দারুণ গাইড করেছেন। ক্যাম্পাসে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রায় সব সেমিনারে অংশ নিতে চেষ্টা করতাম। সেই সঙ্গে জিআরই, আইইএলটিএস এসবের প্রস্তুতি শুরু করলাম।

তখন তৃতীয় বর্ষে পড়ছিলাম। এ সময় হঠাৎ বাবার আলঝেইমার দেখা দিল। চাকরিটা চলে গেল। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে কিছুদিনের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের কোমরের হাড় ভাঙল। মা-বাবার চিকিৎসা খরচ, তিন ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ—সব মিলিয়ে দিশাহারা অবস্থা আমাদের। মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলাম। সেমিস্টার ড্রপ দেওয়ার মতো অবস্থা। এমআইএসটিতে কেউ এক সেমিস্টার ড্রপ দিলে পুরো ইয়ার আবার পড়া লাগে। একদিন মাকে বললাম, ‘মা, এমআইএসটিতে থাকব, নাকি এলাকার ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়ে কোনো একটা চাকরির চেষ্টা করব?’ বিছানায় শুয়ে শুয়ে মা বললেন, ‘জানি তুমি ভালো করছ, সামনে আরো ভালো করবে। অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা কোরো না। পড়াশোনা চালিয়ে যাও। ’ তখন পল মামা ও পুতুল আন্টি সহযোগিতা করেছিলেন। টিউশনির পাশাপাশি সব সময় সিজিপিএ ভালো রাখার চেষ্টা করলাম। এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দুটি মেজর বিষয় ছিল—এরোস্পেস ও অ্যাভিওনিকস। অ্যাভিওনিকসে তৃতীয় হলাম। ফাইনাল পরীক্ষার পর একদিন বিভাগের কো-অর্ডিনেটর জানালেন, সেরা ১০ জনকে ইন্টারভিউতে ডাকা হবে।  

গারোদের মধ্যে এর আগে কেউ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক হয়নি। ফলে এটি আমার জন্য দারুণ সুযোগ। তাই পরীক্ষায় নিজের সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কয়েক দিন পর জানলাম, আমি নির্বাচিত হয়েছি। ২০১৭ সালে নিজ বিভাগে যোগদান করলাম। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে পিএইচডি শুরু করলাম। আশফাক আদনান আমার পিএইচডি সুপারভাইজার। এখন ট্রমাটিক বেইন ইনজুরি নিয়ে গবেষণা করছি। যুদ্ধে বা বিভিন্ন শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে ফেরার পর আলঝেইমারসের মতো মস্তিষ্কের নানা রোগে ভোগা মানুষের সংখ্যা কম নেই এখানে। পাইলট বা যুদ্ধবিমানগুলো যাঁরা চালান, তাঁদের এ সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। এ সমস্যা কেন হচ্ছে, প্রতিকার কী, কী ধরনের হেলমেট বানালে তাঁদের জন্য

ভালো হবে—আমার গবেষণা মূলত এটি নিয়েই।



সাতদিনের সেরা