kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

রূপনাদের জন্য ছিলেন বীর সেন

কয়েক দিন পরেই অবসরে যাবেন বীর সেন চাকমা। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার মঘাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এখন আছেন উল্টাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। রূপনা, ঋতুপর্ণা, মনিকা, আনাই, আনুচিং মোগিনীসহ জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়ের উঠে আসার পেছনে অসামান্য অবদান আছে তাঁর। সেই গল্পই শুনিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রূপনাদের জন্য ছিলেন বীর সেন

২০১২ সাল, বীর সেন চাকমার কাঁধে ঋতুপর্ণা চাকমা

২০১০ সালে হয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’। সেবার ছেলেদের নিয়ে উপজেলায় রানার্স আপ হলাম। পরের বছর শুরু হলো ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ড কাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলো ১৭ সদস্যের ফুটবল টিম গঠনের।

বিজ্ঞাপন

অনেক কষ্টে ১৭ জন খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার, কর্মকর্তাসহ ২০ জনের মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় টিম দাঁড় করালাম। খেলা শুরু হলে দেখলাম, অনেকটা অগোছালো আমাদের মেয়েরা। কারণ একটাই—প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে সেবারই তাদের প্রথম অংশগ্রহণ। কিন্তু তত দিনে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, সুযোগ পেলে এই মেয়েরা ছেলেদের চেয়েও ভালো করবে। আমি কোনো চ্যালেঞ্জ নিলে সেটার শেষ দেখে ছাড়ি। মঘাছড়ি ফুটবল টিমটাকে দেশসেরা করতে চেয়েছিলাম। এখন মানুষ আনুচিং, আনাই, মনিকা, চাথুইমা, মাউচাই, নদী চাকমা, সিবলী তালুকদারকে চেনে। এরা তখন অন্য বিদ্যালয়ে পড়ত। ওদের আমার বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে নিলাম। টিমকে শক্তিশালী করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। এই খেলোয়াড়দের অনেকের বাড়ি ছিল স্কুল থেকে বেশ দূরে। ফলে তাদের থাকার ব্যবস্থাও করতে হয়েছিল। কাউকে কাউকে স্কুলের কাছে কারো বাসায় রেখেছিলাম।

যেমন—ঋতুপর্ণা চাকমার কথায় বলি। চার বোনের মধ্যে সে চতুর্থ। মেয়ে হয়ে জন্মানোয় অখুশি ছিলেন মা-বাবা। ছেলে হলো না কেন? মা বলে গরম পানি ঢেলে দিতে, বাবাও বলে দূরে নিয়ে কোথাও ফেলে দিয়ে আসতে—এই হলো অবস্থা। তখন তাঁদের বললাম, ‘আপনারা পালন না করলে আমিই তার দায়িত্ব নেব। ’ ভাগ্য ভালো তাঁরা আমার কথা ফেলেননি।

রূপনা চাকমার খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম ২০১১ সালে জেলা স্টেডিয়াম মাঠে। তখন ও ক্লাস থ্রিতে পড়ত রাঙামাটির নানিয়ারচরের ভুয়াদম গ্রামের স্কুলে। সেবার রূপনাদের টিম আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ওকে দেখে কোচ শান্তিমণির সঙ্গে আলাপ করলাম। সেও আমার সঙ্গে একমত হলো, এই মেয়েটির মধ্যে বারুদ আছে। রূপনার বাবা নেই। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিন্তু খুবই প্রতিভাবান। ২০১১ সালেই তার মাকে প্রস্তাব দিলাম, মেয়েটিকে আমার স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু কোনোভাবেই রাজি হলেন না। পরের বছরও চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। রূপনার প্রতিবেশী এক স্কুল শিক্ষিকা আমার দূর সম্পর্কের মাসি হন। উনাকে কাজে লাগালাম। ২০১৩ সালে মঘাছড়ি বিদ্যালয়ে ভর্তি করালাম। রাজখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নলিনী মোহন চাকমা রূপনার পড়ালেখা ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেন। শান্তিমণি চাকমা ও সুইহ্লামং মারমার (বাংলাদেশ আনসার টিমের কোচ) সংস্পর্শে থেকে যথাযথ অনুশীলন করে গড়ে উঠেছে সে।

পিইসির পর ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করলাম। কারণ সবাই একই স্কুলে পড়লে টিমটা সুসংগঠিত থাকে। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওদের সেখানে ভর্তি করিয়ে দিলাম। আমাদের স্কুল থেকে ঘাগড়া স্কুল প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। নিজের স্কুলে মাঠ নেই। প্রতিদিন বিকেলে মেয়েদের ঘাগড়ায় নিয়ে যেতাম। অনুশীলনের পর আবার নিয়ে আসতাম।

কিন্তু হাই স্কুলে ওদের দেখবে কে? খেলোয়াড়দের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো হোস্টেল ছিল না। তখন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। বিদ্যালয়ের অব্যবহৃত দুটি কক্ষে খেলোয়াড়দের থাকার অনুমতি দিলেন তাঁরা। সেখানেই আনুচিং, আনাই, মনিকা, সিবলী, সাথুইমা, মাউচাই, নদীরা থাকত। যাবতীয় ব্যয়ভার আমরা বহন করতাম। এটা দীর্ঘদিন ধরে করতে গিয়ে বেশ অসুবিধায় পড়েছিলাম। কুলিয়ে উঠতে না পেরে কত লোকের কাছেই না হাত পেতেছি। কেউ কেউ এমন ব্যবহার করেছেন, যেন মেয়েদের খেলোয়াড় বানাতে গিয়ে বিরাট অপরাধ করে ফেলেছি। অবশ্য বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, দেবাশীষ রায়, ত্রিদিবেশ চাকমা, ফিরোজ আহম্মেদ, চন্দ্রা রায়, প্রিয়াসারা হেনরিক্সনসহ অনেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন।

কখনো কখনো খরচ মেটানোর জন্য আমার তিলে তিলে জমানো প্রভিডেন্ট ফান্ড ভেঙেছি। টাকার অঙ্কে সেটা দুই লাখের কম হবে না। এসব করতে গিয়ে অনেকে কটু কথা শুনেছি। মুখ বুজে সব সয়েছি।

আজ এই আনন্দের ক্ষণে প্রিয়া বেগম নামে একটি মেয়ের কথা খুব মনে হচ্ছে। ঋতুপর্ণাদের চেয়ে ভালো খেলোয়াড় হতে পারত সে। কিন্তু কিছুদিন খেলার পর পরিবারের লোকজন মেয়েটিকে নিয়ে গেছে। বেশ কয়েকবার তাদের বাড়ি গিয়ে মা-বাবা-ভাইদের বুঝিয়েছি, কিন্তু তাঁরা রাজি হননি।

এখন মেয়েটির জন্য খুব আফসোস হয়!

 

 



সাতদিনের সেরা