kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০২২ । ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

অধ্যক্ষের বেতন ১৭৯ টাকা!

বরিশালের গৌরনদীর বাকাই গ্রামে ১২৯ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় হরিগোবিন্দ সংস্কৃত কলেজ। কলেজটি রক্ষা করতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি করে নিঃস্ব হওয়ার পথে অধ্যক্ষ নিখিল রায় চৌধুরী। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি, এখন তাঁর মাসিক বেতন ১৭৯ টাকা ৪৫ পয়সা! লিখেছেন মো. আহছান উল্লাহ

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অধ্যক্ষের বেতন ১৭৯ টাকা!

বাকাই হরিগোবিন্দ সংস্কৃত কলেজ ক্যাম্পাস ছবি : লেখক

বাকাই গ্রামে জন্ম পণ্ডিত হরিগোবিন্দ রায় চৌধুরীর। তিনি ১৩০০ বঙ্গাব্দে (১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ) নিজের এক একর ১০ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন বাকাই হরিগোবিন্দ সংস্কৃত কলেজ। উদ্দেশ্য, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যসেবা, নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া।

১৯৭১ সালে এলাকার হিন্দুদের বাড়িঘরের সঙ্গে কলেজের অবকাঠামো পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদাররা।

বিজ্ঞাপন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার যাত্রা শুরু করে কলেজটি। ২০০১ সালে ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ থেকে তিনতলা একটি ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হয়। এখন সেখানেই চলছে শিক্ষাসহ দাপ্তরিক কাজ। কলেজটি শত বছর পার করেও এমপিওভুক্ত হয়নি।

 

কী পড়ানো হয়

সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয় কলেজটি। কলেজে এখন কাব্য, ব্যাকরণ, আয়ুর্বেদ শাস্ত্র, পুরাণ, পুরোহিত্য, স্মৃতি শাস্ত্রসহ ছয়টি বিষয়ে তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স পড়ানো হয়। প্রতিবছর ২০০ থেকে ৩০০ শিক্ষার্থী এই কলেজ থেকে সনদ অর্জন করেন।   এখন ৩০৭ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন। বর্তমানে কলেজটিতে অধ্যক্ষসহ তিনজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী আছেন। প্রতিবছর এপ্রিল মাসে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় এবং ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। নানা প্রতিকূলতার কারণে নিয়মিত ক্লাস করানো যায় না বলে বছরে মোট ১২০টি ক্লাস হয়।

সনদধারীরা দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। সনদ অর্জন করার পর শিক্ষার্থীদের নামের আগে সম্মানসূচক আচার্য, পণ্ডিত, শাস্ত্রবিদ যোগ হলেও প্রতিষ্ঠানের কথা মনে রাখেন না কেউ।

এই চাকরি ভালো লাগে না

কলেজ শিক্ষকদের অমানবিক জীবনযাপনের বিষয়টি বেশির ভাগ লোকের অজানা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কলেজের অধ্যক্ষের মাসিক বেতন ১৭৯ টাকা ৪৫ পয়সা। সরকারি-বেসরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। কলেজ ক্যাম্পাসে রয়েছে একটি মাধ্যমিক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের আর্থিক সচ্ছলতা আর সংস্কৃত কলেজে কর্মরতদের আর্থিক অবস্থার বিপরীত চিত্র চরম বৈষম্য প্রকাশ করে।

সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও বাকাই নিরাঞ্জন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক পার্থ সারথী হালদার বলেন, ১৯৭৭ সালে বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা ১১৫ টাকা বেতন পেতেন, সংস্কৃত কলেজের শিক্ষকরাও তখন একই হারে বেতন পেতেন। কালের পরিক্রমায় বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বহুগুণ বাড়লেও এই কলেজের শিক্ষকদের ভাগ্যের কোনো বদল হয়নি। পৃথিবীর কোনো দেশে শিক্ষকদের ১৭৯ টাকা বেতন নেই। এই কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাঁচ দফা দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছেন। সংস্কৃত, পালি টোল, চতুষ্পঠি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনস্কেল ও মাসিক ভাতা বৃদ্ধির জন্য ২০১৪, ২০১৭ ও ২০২০ সালে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। হরিগোবিন্দ সংস্কৃত কলেজের সহকারী শিক্ষক চন্দন বসু আক্ষেপ করে বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছাড়াও একটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন খরচ থাকে। অথচ কোনো বরাদ্দই নেই। এই খরচের চাপ একটা সময় শিক্ষকদের কাঁধেই পড়ে। ’ অফিস সহকারী অজয় রায় বলেন, ‘কেমন চাকরি করি বলতে পারি না। রাগ করে অনেক সময় চলে যাই, স্যাররা আবার বুঝিয়ে ডেকে নিয়ে আসেন। বেতন ছাড়া চাকরি আর ভালো লাগে না। ’ কলেজের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আমি এই কলেজ থেকেই ২০১৩ সালে কাব্যতীর্থ অধ্যয়ন করে একটি মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় কর্মরত আছি। কলেজটি সরকারীকরণের দাবি জানাই। ’

 

কলেজটির জন্য লড়ছেন নিখিল

১৯৮৮ সালে বাকাই হরিগোবিন্দ সংস্কৃত কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন পণ্ডিত নিখিল রায় চৌধুরী। তিনি হরিগোবিন্দ রায় চৌধুরীর নাতি। কলেজটি সচল রাখা যেন তাঁর নেশা। অধ্যক্ষের ছেলে বিপ্লব রায় চৌধুরী বলেন, ‘পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া স্মৃতি ধরে রাখতে কলেজটির দেনা ও অচলাবস্থা নিরসন করতে গিয়ে বাবা বিভিন্ন সময় তিন বিঘার বেশি জমি বিক্রি করেছেন। এই কলেজ রক্ষা করতে অনেক টাকা ধারদেনা করেছেন। এ নিয়ে মা-বাবার মধ্যে প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হয়। ’ বেতন-ভাতা যা-ই পান না কেন, আমৃত্যু এই পেশা আঁকড়ে থাকবেন বলে জানালেন নিখিল রায় চৌধুরী। কারণ ‘এটা আমার পূর্বপুরুষের স্মৃতি, আমাদের ঐতিহ্য। ’



সাতদিনের সেরা