kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

৫০ বছর ধরে আগলে রেখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি’

সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশে হঠাৎ এক ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার কয়েকটি গ্রাম। খবর পেয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে যান ফুলবাড়িয়ার শ্রীপুরে। হেঁটে হেঁটে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন করেন। এ সময় অসহায় মানুষকে কাছে টেনে নেন বঙ্গবন্ধু। তাঁদের মধ্যে মধ্যপাড়া গ্রামের জসিম উদ্দিন মুন্সি একজন। তাঁর ঘরের চালে এখনো আছে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ঢেউটিন। লিখেছেন মো. আব্দুল হালিম

১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৫০ বছর ধরে আগলে রেখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি’

জসিম উদ্দিনের ঘরের চালে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ঢেউটিন

১৯৭২ সালের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ। শনিবার। শিবগঞ্জ হাটের দিন। সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে বাড়িঘরে ফিরছিল মানুষ।

বিজ্ঞাপন

ঠিক সেই সময় শ্রীপুর গ্রামে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়। কয়েক মিনিটের মধ্যে তছনছ হয়ে যায় পুটিজানা ইউনিয়নের কালারচর গ্রাম, বাকতা ইউনিয়নের শ্রীপুর, তালতলা, বাকতা দক্ষিণপাড়া, কালনাজানি গ্রামসহ কালদহ ইউনিয়নের একাংশ। শত শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়। মারা যায় অন্তত পাঁচজন। খবর শুনে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৩ এপ্রিল সোমবার ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে ছুটে আসেন ফুলবাড়িয়ায়।

ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে হেলিকপ্টারে চড়ে ফুলবাড়িয়া বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন বঙ্গবন্ধু। সেখান থেকে তৎকালীন ময়মনসিংহের ডেপুটি কমিশনার খসরুজ্জামান চৌধুরীর জিপগাড়িতে করে যান বাকতা ইউনিয়নের তালতলা গ্রামে। সেখান থেকে হেঁটে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম ঘুরে দেখেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এমপিএ মো. মোসলেম উদ্দিনসহ অনেকে।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও  সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যখন ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে আসেন, তখন সঙ্গে ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হেঁটে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামটি ঘুরে দেখেন। ’

গ্রামটিতে প্রায় ৪৫ মিনিট অবস্থান করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর ফুলবাড়িয়া আসার খবরে চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে তাঁকে একনজর দেখার জন্য। ‘জয় বাংলা ও মুজিব ভাই’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শ্রীপুর গ্রাম।

 

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন

১৯৭২ সালের ৬ এপ্রিল। বঙ্গবন্ধুর ফুলবাড়িয়া পরিদর্শনের ঘটনা নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পালের লেখা ‘বঙ্গবন্ধু ও ময়মনসিংহ’ বইয়ের ২৩ নম্বর পাতায় বঙ্গবন্ধুর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের একটি ছবি রয়েছে। ক্যাপশন লেখা রয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গত সোমবার ময়মনসিংহে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করিতেছেন, শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলামও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ’ বইটিতে ইত্তেফাক পত্রিকার বরাতে আরো লেখা রয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (রবিবার) এক বিবৃতিতে ময়মনসিংহ জেলার টর্নেডোর কবলে জীবনহানির জন্য শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনসাধারণের প্রতি সরকার সম্ভাব্য সকল প্রকার সাহায্য ও রিলিফের ব্যবস্থা করিবে। বঙ্গবন্ধু বলেন, শনিবার বিকালে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার টর্নেডোর ছোবলে এতগুলি জীবনের অকাল পরিসমাপ্তিতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহকে আমি আন্তরিক সমবেদনা জানাইতেছি। ’

 

আজও আগলে রেখেছেন

ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে শ্রীপুরে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন করেন বঙ্গবন্ধু। এ সময় অসহায় মানুষকে কাছে টেনে নেন। তাঁদের মধ্যে শ্রীপুর মধ্যপাড়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব জসিম উদ্দিন মুন্সি একজন। ঘূর্ণিঝড়ে অন্যদের মতো তাঁর বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ১২টি ঢেউটিন ও ২৩০ টাকা পেয়েছিলেন তিনি। পরে সেই টিনের ছাউনি দিয়ে আবার ঘর তুলেছিলেন জসিম।

এখন সেই ঢেউটিনগুলো মরচে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। মুছে গেছে ট্রেড মার্কও। হালকা বৃষ্টিতেই পানি পড়ে। টিনের ফুটো দিয়ে আকাশ দেখা যায়। কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি’ হিসেবে এখনো সেগুলো আছে জসিমের ঘরের চালে। ঘরটিতে এখনো বসবাস করেন তিনি। চাইলেই ঘরে নতুন ঢেউটিন লাগাতে পারতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ঢেউটিনগুলো বদলাতে চাননি জসিম।

 

জসিম উদ্দিন মুন্সি বললেন

১৯৭২ সালে ২০-২১ বছরের যুবক ছিলাম। ঘূর্ণিঝড় হয়ে গেছে মনে হয় ১৫ দিন হবে। বঙ্গবন্ধু শ্রীপুর আসবেন, আমরা কেউ আগে জানতাম না। সকাল অনুমানিক ১১টা। একটি জিপগাড়ি থেকে বাকতা তালতলা বাজারে নামেন বঙ্গবন্ধু। বিশাল দেহের মানুষ। সাদা পাঞ্জাবির ওপর কালো রঙের মুজিব কোট ছিল তাঁর পরনে। কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মিলালাম। তিনি পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। ভিড়ের কারণে কথা বলতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ও ঢেউটিন অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন। আমার মতো যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত তাঁরা প্রায় সবাই বঙ্গবন্ধুর দেওয়া টিন ও ২৩০ টাকা পেয়েছেন। ঢেউটিনগুলো নষ্ট হয়ে গেলেও এখনো বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছি। গ্রামটিতে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই শেখের বেটির কাছে। কেউ যদি জমি না দেয়, বিনা মূল্যে ১০ শতাংশ জমি দেব।

 

গ্রামবাসীর দাবি

বাকতা শ্রীপুর লালমাটির যে সড়কটি দিয়ে বঙ্গবন্ধু হেঁটে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখেছেন সেই সড়কটি এখনো কাঁচা। একটু বৃষ্টি হলেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত সড়কটি পাকা না হওয়ায় গ্রামবাসীর আক্ষেপের শেষ নেই। গ্রামবাসীর দাবি, সড়কটি দ্রুত পাকা করে ‘বঙ্গবন্ধু সড়ক’ হিসেবে নামকরণ করা হোক।



সাতদিনের সেরা