kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

[ দিনগুলি মোর ]

মায়া কুটির

৫ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মায়া কুটির

শিল্পী : সমর মজুমদার

১৯৯৭ সাল। পেনশন বাবদ নগদ চার লাখ টাকা হাতে পেয়েও বাবা তেমন কিছু করলেন না—না জমিজিরাত, না ফিক্সড ডিপোজিট, না সুদি কারবার। শুধু আমাদের জন্য একটা বাড়ি বানালেন; টিনের ছাউনি আর নকশা করা বাঁশের বেড়া দিয়ে বানালেন একটা উদ্যানঘেরা ঘর।

বাড়িটার চারপাশে জবাফুল আর কলাবতীর দেয়াল।

বিজ্ঞাপন

দেয়ালের বাইরে একেক সময় একেক রকম ছবি, বিস্তীর্ণ কাশবন, হাওয়ায় দুলছে পুঁইশাকের বাড়ন্ত লতা, কচি ধানের চারায় চারায় অদ্ভুত চঞ্চলতা আর কত বিচিত্র ধরনের ঘাসফুল, যেন একটা সবুজ মখমলের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে পুরো গ্রামে। কিছুটা দূরে দূরে সবুজ ঢিবির মতো কয়েকটি বাড়ি, যত দূর চোখ যায় নরম সবুজের স্নিগ্ধতা, এই তো আমাদের গ্রাম!

নতুন ঘর বানানো হয়ে গেলে বাবা বললেন, ‘এই ঘরের নাম দিলাম মায়া কুটির। ’ ভাবলাম, বাবা হয়তো আম্মাকে ভালোবেসে এই নাম দিয়েছেন। কেননা, তত দিনে আম্মা তাঁর মোমেনা বেগম নামটি হারিয়ে ফেলে ‘মায়ার মা’ হয়ে গেছেন।

বাবা আমাকে এক টুকরো প্লেনশিট, পটের রং আর ‘ময়দা গাছের’ একটা তুলি এনে দিলেন। আমি সুন্দর করে লাল রং দিয়ে লিখলাম ‘মায়া কুটির’। বাবা কাঠের চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে নেমপ্লেটটি ঘরের সামনের দরজার ওপর ঝুলিয়ে দিলেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাবা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বাবার স্নেহের পুরনো পুকুরে শোকের মাতম তুলে আচমকা সাঁতরে ওঠে ১৯৭০-এর গোর্কিতে তলিয়ে যাওয়া আমারই তিন ভাই-বোন মায়া, ছায়া আর আলমগীর।

প্রতিবেশী, এমনকি আত্মীয়-স্বজনও অনেকেই অবাক হলেন। ইয়ার্কি-মশকরাও করলেন কেউ কেউ, মানুষ শখ করে পাকা দালানের নাম রাখে, আর আমাদের আলিম মাস্টার তাঁর টিনের ঘরের নাম রাখছেন মায়া কুটির! কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন... হে... হে...।

রাস্তার দুই পাশে পাহাড়ের বাচ্চার মতো আরো কিছু বাড়ি ছিল। পাকা বাড়িও যে একেবারে ছিল না, তা নয়। কিন্তু আমাদের বাড়িটার একটা আলাদা ঐশ্বর্য ছিল, ছিল মন কেমন করা সৌন্দর্য। এক ছিমছাম ‘নিরালা নীড়’,  নিকানো উঠান, পুকুরে নির্মল স্বচ্ছ জল, বরফকুচির মতো সাদা জামরুলে ঠেসে থাকা দোচালা রসুই ঘর; বাতাসের হালকা দুলুনিতেই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়া জাম, জামরুল, বরই; ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে কাছে ডাকা ডাসা ডাসা পেয়ারার নুয়ে পড়া ডাল; ডালে ডালে ঘরবাঁধা টুনটুনির গান; আর সোনালু ফুলের হলদে আভার এমন আহ্বানে যে দূরের অনাত্মীয়রাও অনায়াসে চিনে যায়—ওই তো মায়া কুটির!

পুরো বাড়িটি এমন পরিচ্ছন্ন ছিল যে কোনো মেহমান এলে মুগ্ধ হতেন। বাতাসে একটা পাতা ঝরে পড়লেও আমরা তা কুড়িয়ে নিতাম। ঘরের সামনের উঠানজুড়ে নানা জাতের সুবাসি ফুল আর নয়নাভিরাম পাতাবাহার। দক্ষিণের বাগিচায় ঝাউগাছের ফিসফিসানি। পেছন দিকে পুকুর; পুকুরের পারে পারে খেজুর, মাদার আর বরই গাছের আত্মীয়তা; পাটিপাতা বন আর ঘাঘরার অন্ধকারে নাকি সুতানলি সাপের বাস! লম্বা উঠানের এক কোণে বিশাল সবজির মাচা, সবুজ লতাপাতার মধ্যে ঝুলে আছে লাউ, শসা, চিচিঙ্গা। পাশের লাগোয়া ক্ষেতে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লালশাক, পালংশাক, মুলা, গাজরসহ নানা ধরনের রবিশস্য। এসব কাজে বাবার সার্বক্ষণিক সঙ্গী আমি আর আমার বোনেরা, যারা অনেক অথচ অভিযোগহীন।

আমরা বেড়ে উঠেছি নিঃশব্দ পরিশ্রমে। বাবা ছিলেন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু অত্যাচারিতের প্রতি কোমল-কাতর-দরাজদিল। আম্মা ছিলেন প্রতিবেশী প্রায় সব অভাবী নারীর আশ্রয়। কার হাঁড়িতে রান্না হয়নি, আম্মা মুখ দেখেই বলে দিতে পারতেন। হাত ধরে খাবার ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে বলতেন, ‘তিতা পাটশাক ভাজি করছি, সঙ্গে ভুনা মুগডাল; চারটা খেয়ে যা। ’ আমার ভাইয়েরা ছিল ভালোবাসার আধার, বোনেরা ছিল পানির মতো  প্রয়োজনে বরফ, প্রয়োজনে বাষ্প। ৯ ভাই-বোনের বিশাল এক পরিবারের আনন্দ-আবাস ছিল এই ‘মায়া কুটির’।

দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। কত কী যে ক্ষয়ে গেছে, মুছে গেছে, চলে গেছে চিরতরে! তবু ভাবি, এই তিয়াস লাগা দুপুরে মায়া কুটিরের সেই পুরনো চৌকাঠে বসে এক মগ ডাবের পানি যদি খেতে পারতাম! সব কিছু উথলে ওঠা স্বপ্নের মতো মনে হয় আজ, দূরত্ব আর ব্যস্ততার মধ্যেও যে স্বপ্নের রেশ রয়ে যায়। আহ! মায়া কুটির, আমাদের হাজীপুর গ্রাম, সুবর্ণচর, স্বপ্নের মতো সুন্দর! ‘আর কি হে হবে দেখা যত দিন যাবে!’

কাইছুন নেছা, চিটাগাং রোড, সিদ্ধিরগঞ্জ

 

লেখা পাঠাতে মেইল করুন : [email protected] ডাকযোগে : বিভাগীয় সম্পাদক, অবসরে, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯।



সাতদিনের সেরা