kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

মা-ছেলে একসঙ্গে পিএইচডি করব

শৈশবেই মা-বাবাকে হারিয়ে ঠাঁই হয়েছিল অনাথ আশ্রমে। সেখান থেকে পড়াশোনা শেষে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নার্সিং। ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, প্রথম শ্রেণির চাকরিজীবী হিসেবে অবসরে যাবেন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের আরেফা হোসেনের। ৬২ বছর বয়সে শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে স্নাতকোত্তরের সনদ নিয়েছেন তিনি। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৫ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মা-ছেলে একসঙ্গে পিএইচডি করব

সমাবর্তনের দিন আরেফা হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

আরেফার কাছে শৈশব মানে শুধুই বিয়োগের গল্প। চার বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। বয়স যখন আট, তখন চিরদিনের জন্য ছেড়ে গেলেন বাবাও! পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। থাকতেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায়।

বিজ্ঞাপন

আরেফার অভিভাবক বলতে তখন কেবল বড় বোন। অল্প বয়সে সেই বোনটিরও বিয়ে হয়ে যায়। পরে বাকি তিন বোনসহ আরেফার ঠাঁই হয় নাটোরের একটি অনাথ আশ্রমে। শুরু হয় জীবনের কঠিন সংগ্রাম। ভর্তি হন স্থানীয় মিশনারি স্কুলে। সেখান থেকেই ১৯৭৬ সালে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হলেন রাজশাহীর খ্রিস্টিয়ান মিশন হাসপাতালে, ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারিতে। পাস করলেন ১৯৮১ সালে। ১৯৮২ সালের ৬ জুন নার্স হিসেবে যোগদান করলেন ঠাকুরগাঁওয়ের মহকুমা হাসপাতালে (এখনকার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল)। ১৯৮৪ সালে বিয়ে হয় আরেফার। বছরখানেকের মাথায় কোল আলো করে আসে পুত্রসন্তান। স্বামী, সন্তান, চাকরি—সব মিলিয়ে ভালোই চলছিল আরেফার সংসার। কিন্তু মনে তাঁর সুপ্ত বাসনা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন নার্সিংয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আছে। আছে শিক্ষা ছুটির ব্যবস্থাও। পরে এ নিয়ে স্বামীর সঙ্গে আলাপ করলে তিনিও উৎসাহ দিলেন। ১৯৯৬ সাল। আরেফার বড় ছেলে আশিক তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ছেলেকে স্বামীর কাছে রেখে ঢাকায় চলে এলেন আরেফা। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মহাখালীর সেবা মহাবিদ্যালয়ে। দুই বছর ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করেছেন। বললেন, স্বামী সব সময় উৎসাহ জুগিয়েছেন। বলেছেন, ‘সুযোগ যেহেতু আছে বিএসসিটা করে ফেলো। ’ ১৯৯৮ সালে সেবা মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন আরেফা। তবে সংসার, কর্মক্ষেত্রের চাপ—সব মিলিয়ে সেইবার আর বেশিদূর এগোতে পারেননি। ফিরে এলেন ঠাকুরগাঁওয়ে। কিন্তু মন চাইছিল মাস্টার্সটা শেষ করতে। এরই মধ্যে তাঁর ছোট ছেলের জন্ম হয়। বড় ছেলেটাও তত দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছেন। ছোট ছেলেটা একটু বড় হলে মাস্টার্স সম্পন্ন করার চিন্তা করলেন। তত দিনে বয়স তাঁর ষাটের কোটায়। এই বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ঠিক হবে কি না, লোকে কী বলবে—এসব নিয়ে মনের মধ্যে এক ধরনের দোলাচল ছিল। ‘লোকে কী বলবে—তা না ভেবে তোমার মন কী বলে সেটা শোনো। ’ স্বামীর এমন অনুপ্রেরণায় সিদ্ধান্ত নিলেন আবারও পড়াশোনা শুরু করবেন। পরে ভর্তি হলেন অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাবলিক হেলথ বিষয়ে। বললেন, ‘চিন্তা করলাম যদি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারি, তাহলে মনে শান্তি লাগবে। প্রমোশনের ক্ষেত্রেও এটা কাজে দেবে। এসব ভেবেই আবার ভর্তি হলাম। ’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যালেঞ্জ উতরানো সহজ ছিল না। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৪০০ কিলোমিটার। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি শুক্রবার ক্লাস হতো। কর্মস্থল থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রওনা দিতেন আরেফা। রাতভর বাসে থেকে শুক্রবার সকালে নামতেন গাবতলীতে। সেখান থেকে উত্তরার অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটিতে। দিনভর ক্লাস শেষে আবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে পঞ্চগড়গামী বাসে চেপে বসতেন। পাড়ি দিতে হতো সেই সাড়ে ৪০০ কিলোমিটার পথ। শনিবার ভোরে নামতেন ঠাকুরগাঁওয়ে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সকালে যেতেন অফিসে। দুটো বছর এভাবেই কেটেছে। বললেন, ‘দূরের পথ। লম্বা সময় লাগে। সারা রাত জার্নি করে সকালে পৌঁছতাম, ক্লাস করে আবার রাতের জার্নি শেষে বাড়িতে পৌঁছতাম। পরদিন অফিসও করতে হতো। বাসেই ঘুমাতাম। জ্যামে আটকে থাকলে অনেক সময় ক্লাসে পৌঁছতে দেরি হতো। কোনো কোনো সময় ক্লান্তি লাগত। কিন্তু ক্লাসে ঢুকলে মন ভালো হয়ে যেত। ’ বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানের বয়সীদেরও সহপাঠী হিসেবে পেয়েছেন। এত দূর থেকে আসেন শুনে তাঁরা বেশ অবাক হতেন। বলতেন, ‘পড়াশোনার জন্য আপনি এত কষ্ট করছেন!’ শিক্ষকদের কেউ কেউ বলতেন, ‘আপনি আমার মায়ের মতো। এই বয়সে পড়তে আসছেন। আমরা আপনাকে সাধ্যমতো হেল্প করব। ’

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সমাবর্তন। সেখানে ৬২ বছর বয়সী আরেফার হাতে সনদ তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি। সনদ পেয়ে ভীষণ গর্বিত আরেফা। ২০১৯ সালে এক দুর্ঘটনায় আহত হয় আরেফার ছোট ছেলে আদিব। খবরটা সহ্য করতে পারেননি তাঁর স্বামী হামীম হোসেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান ওপারে। তাই শুধু একটাই আফসোস আরেফার, ‘উনি (হামীম হোসেন) সমাবর্তনটা দেখে যেতে পারলেন না!’

যা হোক, সিনিয়র স্টাফ নার্স থেকে বিএসসি পাসের পর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হয়েছিলেন আরেফা। মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদায় সেবা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। হোক না তা মাস ছয়েকের জন্য। তা-ও তো অবসরের আগে স্বপ্ন মুঠোয় ধরা দিয়েছে। ফলে দারুণ আনন্দিত আরেফা। বললেন, ‘সহকর্মীদের প্রায় সবাই সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবেই অবসরে গেছেন। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। সেটা পূরণ হয়েছে দেখে খুশি লাগছে। ’

২০১৯ সালে অবসরে যান আরেফা। এখন ঠাকুরগাঁওয়ে গোল্ডেন লাইফ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর এই নারীর সংসার এখন দুই ছেলে নিয়ে। বড় ছেলে আশিক একটি গণমাধ্যমে চাকরি করছেন। ছোট ছেলে আদিব হোসেন পড়ছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে।

অনেকেই বলেছিলেন, শেষ বয়সে আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দেবেন। এখন আর পড়াশোনার কী দরকার। কিন্তু আরেফা সেসবে কান দেননি। ‘ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না’—স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণীকে অন্তরে ধারণ করেন আরেফা। বললেন, ‘লক্ষ্য স্থির করে চেষ্টা চালিয়ে গেলে বয়সের বাধা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায়। ’ মাস্টার্স তো করলেন। এবার? এমন প্রশ্নের জবাব হাসতে হাসতেই দিলেন আরেফা—‘ছোট ছেলেটা কয়েক দিন ধরেই বলছে, আম্মু, তুমি পিএইচডি করো। ’ বললাম, ‘তুমি যখন পিএইচডি করবা, তখন আমি পিএইচডিতে ভর্তি হবো। মা-ছেলে আবার একসঙ্গে পড়াশোনা করব। ’



সাতদিনের সেরা