kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

হরিণটি ধরতে মাত্র ২২ সেকেন্ড লাগল

বন্য প্রাণীর জন্য আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সংরক্ষিত এলাকা কেনিয়ার মাসাই মারা। কিছুদিন আগে সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন রেজাউল বাহার ও শারমীন শাহরিয়াত দম্পতি। রেজাউল বাহারের মুখেই শোনা যাক সেই গল্প

২৮ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হরিণটি ধরতে মাত্র ২২ সেকেন্ড লাগল

শিকারের অপেক্ষায় থাকা সেই চিতা। ছবি : লেখক

মাসাই মারা ন্যাশনাল রিজার্ভ ফরেস্টের আয়তন প্রায় এক হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার। এখানকার আদিবাসীরা মাসাই নামে পরিচিত। বন্য প্রাণী রক্ষায় তাদের সরে যেতে হয়েছে রিজার্ভ ফরেস্টের বাইরে। এখানে যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ।

বিজ্ঞাপন

মাঝেমধ্যে কিছু উঁচু জায়গা, দূরে দূরে বড় কিছু গাছ। তবে এর সংখ্যা বেশি নয়। কারণ হাতি গাছ উপড়ে ফেলে। জিরাফ গাছের পাতা খেয়ে গাছের আকৃতি তৈরি করে ফেলে ছাতার মতো।

বেশ আগে এ অঞ্চলে খেলাচ্ছলে পশ্চিমারা প্রাণী শিকার করত। তাদের কাছে এটি বিগ ফাইভ গেম ড্রাইভ নামে পরিচিত ছিল। সিংহ, লেপার্ড, হাতি, গণ্ডার আর বন মহিষ—মূলত এই পাঁচটি প্রাণী শিকার করত তারা।

এখন প্রায় ৯০টির বেশি বন্য প্রাণী আছে মাসাই আর সেরেঙ্গেটিতে। মাসাই আর সেরেঙ্গেটি মূলত বিস্তীর্ণ ভূমি। কেনিয়ার অংশটুকু মাসাই মারা, তানজানিয়ার অংশ সেরেঙ্গেটি। সেরেঙ্গেটি মানে সীমাহীন বিস্তীর্ণ ভূমি। সেরেঙ্গেটি মাসাই মারার ২০ গুণ বড়। পৃথিবীতে অনেক বন্য প্রাণী এখন বিলুপ্তির পথে। চিতা এদের একটি। মারা-সেরেঙ্গেটির ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারে এখন চিতা আছে ৩০০টি। এদের শিকার করতে দেখা লটারি জেতার মতোই ভাগ্যের ব্যাপার। এমন বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়েছি আমরা।

মাসাই মারা নদীর পাশে স্যাংচুয়ারি ওলনানা লজ থেকে সেদিন খুব সকালে বের হয়েছি। গাড়ির স্টিয়ারিং নেলসনের হাতে। সে একই সঙ্গে আমাদের ড্রাইভার এবং ট্যুর গাইড। সঙ্গে বাংলো থেকে দেওয়া দুপুরের খাবার। ইচ্ছা আছে, কোনো একটা ফাঁকা জায়গায় খেয়ে নেব। যা হোক, এখানে গাড়িচালকদের পরস্পরের মধ্যে রেডিও কমিউনিকেশনের ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ নেলসনের কাছে সংকেত এলো—চিতা বাঘ দেখা গেছে। চিতা সাধারণত এই দুই প্রাণীর দেখা পাওয়া মুশকিল। লুকিয়ে থাকে। বের হয় শুধু খাবারের সন্ধানে।

মাসাই মারায় ঘাসগুলো দুই থেকে চার ফুট উঁচু। গাড়ি দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। অনেকক্ষণ পর একটি চিতার সন্ধান পাওয়া গেল। চিতাটি ধীরে ধীরে এগোচ্ছে খোলা দিগন্তের দিকে। এই দেখা যায়, এই হারায় অবস্থা। এসব প্রাণীর ব্যাপারে স্থানীয় বাসিন্দারা দারুণ ওয়াকিফহাল। নেলসন জানাল, এটি ফিমেল চিতা। বাচ্চাদের কোথাও লুকিয়ে রেখে এখন শিকারে বের হয়েছে সে।

এক মাসাই মারা তরুণী। ছবি : লেখক

দূর থেকে চিতার পিছু নিতে নিতে অনেকটা সময় পার হয়েছে। হঠাৎ দেখলাম চিতাটি অদৃশ্য হয়ে গেছে! আমরাও সরে গেলাম অন্যদিকে। কিছুক্ষণ পর খবর এলো—চিতা আবার বের হয়েছে। আবারও তার পিছু নিলাম। উঁচু ঘাসের সীমানা ছেড়ে এখন সে ধীরে ধীরে খোলা প্রান্তরের দিকে যাচ্ছে। আফ্রিকার এই তৃণভূমিতে অসংখ্য হরিণ। চিতাটি দূর থেকে হরিণ দেখছে, আমরাও। খোলা দিগন্ত, উঁচু ঘাস, মাঝেমধ্যে উইপোকার ঢিবি। কিছুটা এগিয়ে চিতাটি একটি ঢিবির ওপরে উঠে বসে চারপাশটা দেখল। দুরবিনে দেখলাম, প্রায় মাইলখানেক দূরে কিছু হরিণ। চিতা এখন থেকে তার লক্ষ্য ঠিক করে নেবে, বেছে নেবে কোন হরিণটির পেছনে সে ছুটবে। চিতার পেছনে আছি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে। সব কিছু ঘটছে ধীরগতিতে। ৫০০ মিলিমিটার ক্যামেরার লেন্স ধরে রাখতে রাখতে হাত ব্যথা করছিল। দুর্ভাগ্য, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই মুহূর্তে চিতা বুলেটের বেগে দৌড়াতে শুরু করল। ১০ সেকেন্ডের মতো। তারপর থামল। মনে হলো চিতার হিসাবে গড়বড় হয়ে গেছে। দূর থেকে চিতাকে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেছে হরিণের দল।

এক মাসাই মারাদের উত্সবে শারমীন শাহরিয়াত।     ছবি : লেখক

দুপুর পার হয়েছে। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। চিতাটি আবার শিকারে যাবে কি না বলা মুশকিল। চারদিক এখন হরিণশূন্য। চিতাটি ধীরে এগোচ্ছে। নেলসনকে বললাম—বাদ দাও। চলো ফিরে যাই, খেতে হবে। সে একটু ধৈর্য ধরতে বলল। দুরবিন নিয়ে সে এদিক-ওদিক দেখল। জানাল, চিতা যে পথে এগোচ্ছে সেই বরাবর প্রায় মাইল দুয়েক দূরে কিছু হরিণ দেখা যাচ্ছে। ভাবছি, দূর! চলে যাওয়া দরকার। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে এক মিনিটের মাথায় কত অ্যাকশন দেখা যায়। আর এখানে প্রায় ঘণ্টা তিনেক হতে চলল। মনে মনে বিরক্ত হলাম। নেলসন কি বুঝতে পারছে না আমরা ক্লান্ত। বিকেল ৩টা পেরিয়ে যাচ্ছে। যা হোক, ক্যামেরা আবার হাতে নিলাম। চিতা এখন আমাদের মাইলখানেক সামনে। মাসাই মারায় কিছু নিয়ম আছে। প্রাণী শিকারে থাকলে তার পিছু নেওয়া যাবে না। শিকার ধরে ফেললে তার সামনে গাড়ি নিয়ে হাজির হওয়া যাবে। ফলে আমরা একেবারে কাছাকাছি যেতে পারব না। যা হোক, এবার বহুদূরে কিছু হরিণ দেখা যাচ্ছে। আমার হাতে ক্যামেরা, নেলসনের হাতে দুরবিন। সে আমাদের অনেকক্ষণ ধরে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে দূরে হরিণগুলোর মধ্যে একটি অল্প বয়সী হরিণ আছে। চিতাটি তাকেই টার্গেট করবে। চিতা আর হরিণের দূরত্ব তখনো প্রায় মাইলখানেক।

মাসাই মারার ঝলমলে রোদে সকাল থেকে ঘুরছি। কী সুন্দর অভয়ারণ্য। চারদিকে বন্য পশুপাখি। যে যার জায়গায় খাচ্ছে, বিশ্রাম নিচ্ছে। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। ছবির মতো সুন্দর প্রকৃতি। কিন্তু ক্যামেরার লেন্সে দেখলাম, প্রকৃতির নিয়ম যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। প্রচণ্ড ভয়ে ছুটছে হরিণগুলো। চিতাটি যেন ছুটছে আরো জোরে। শিকার ধরতেই হবে। সে কী ভয়ংকর গতি। মাত্র ২২ সেকেন্ডে ধরে ফেলেছে তার শিকার! মুহূর্তের মধ্যে নেলসন গাড়ি স্টার্ট দিল। মনে হলো তৃণভূমির ওপর দিয়ে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে। চিতার পাশে এসে গাড়ি থামল। দেখলাম, হরিণটি তখনো জীবিত, কান দুটি নড়ছে। গলার পাশে কামড়ে ধরে আছে চিতা। মাটিতে শুয়ে আছে দুটি প্রাণী। ক্লান্ত। বুক-পেট বেলুনের মতো ফুলে বড় হচ্ছে আবার ছোট হচ্ছে। এতক্ষণ শিকার দেখার উত্তেজনায় ছিলাম। এবার হরিণটির জন্য খুব মায়া হলো।



সাতদিনের সেরা