kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

ভাণ্ডারে তাসুকের অমূল্য রতন

পুরনো সংবাদপত্র, বই, সাময়িকী, ডাকটিকিট ও মুদ্রার অনেক কিছুই আছে তাঁর সংগ্রহে। পাশাপাশি রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার ছবি ও সংশ্লিষ্ট ইতিহাস। লিখেছেন শামীম খান

২৮ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাণ্ডারে তাসুকের অমূল্য রতন

মাগুরা শহরের হাসপাতালপাড়ার বাসিন্দা কাজী তাসুকুজ্জামান। পেশায় পল্লী চিকিৎসক। জন্ম ১৯৬১ সালে। দাদা কাজী আব্দুল হক ছিলেন ব্যবসায়ী।

বিজ্ঞাপন

তবে তাঁর শখ ছিল বই, সংবাদপত্র, ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থানের ছবি ও মুদ্রা সংগ্রহের। দাদার এই শখ একসময় পেয়ে বসে তাসুককে। স্কুল বয়সেই সংবাদপত্র, পুরনো বই, ডাকটিকিট, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংগ্রহ শুরু করেন তাসুক। ১৯৭০ সাল থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই শখ এখন রূপ দিয়েছে বিশাল এক সংগ্রহশালার। যেকোনো পুরনো তথ্য প্রয়োজন হলেই মাগুরার মানুষ আসে তাঁর কাছে।

 

তাসুকের সংগ্রহশালা

সংগ্রহশালার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের সব ধরনের দৈনিক, সাপ্তাহিক ও অন্যান্য পত্রিকার বিশাল স্তূপ। মাগুরা থেকে প্রকাশিত স্থানীয় প্রথম সংবাদপত্র তারকব্রহ্ম শিকদার সম্পাদিত সাপ্তাহিক আনন্দ রয়েছে তাঁর সংগ্রহশালায়। রয়েছে দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেহাদ, দৈনিক পাকিস্তানসহ সময়ের সাক্ষী নানা পত্রিকা। সংখ্যায় কত জানেন না তাসুক। ওজনে ২০০ মণের বেশি বলে দাবি তাঁর। নিজ বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে স্তূপাকারে সংরক্ষিত আছে এসব সংবাদপত্র। বই আছে পাঁচ হাজারের বেশি। বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও ডাকটিকিটও হাজার পাঁচেক। মাগুরার পুরনো সব প্রতিষ্ঠান, বর্তমানের ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থাপনার ছবি আছে হাজার দশেকের মতো। এসব সংগ্রহের কাজে সব সময় সাহায্য করে স্ত্রী-সন্তানরা। এসব ইতিহাস-ঐত্যিহের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ অভিযানে তাঁকে যেতে হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশসহ ভারতের নানা স্থানে। সংগ্রহের কাজে তাসুকুজ্জামান পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অন্তত আট বিঘা জমি বিক্রি করেছেন, যার বর্তমান মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। পাশাপাশি দাদা কাজী আব্দুল হক, বড় চাচা, কাজী জনাব আলী, কাজী আকবর হোসেন, মা আকলিমা খাতুন, আরেক চাচা কাজী মোশারফ হোসেনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সহযোগিতা পেয়েছেন সমানভাবে।

 

তাসুকের সংগ্রহ অভিযান

তাসুকুজ্জামান জানান, ১৯২০ সালে সরকারিভাবে নিবন্ধিত মাগুরার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা আনন্দের একটি সংখ্যা সংগ্রহ করতে তাঁকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়েছিল। এটি প্রকাশিত হতো ভগনানন্দ চক্রবর্তী নামের এক ব্যক্তির প্রেস থেকে। ১৯৮৬ সালে দিনাজপুরে গিয়ে এই প্রেসের এক কর্মচারীর কাছ থেকে এটির একটি সংখ্যা সংগ্রহ করেছেন তিনি। মাগুরা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রয়াত সাংবাদিক দীপক রায় চৌধুরী সম্পাদিত বাংলার ডাক নামে অন্য একটি স্থানীয় পত্রিকা সংগ্রহ করতে খরচ হয়েছে সমপরিমাণ টাকা। মাগুরার ভূষণা রাজ্যের রাজা সীতারাম রায়কে নিয়ে লেখা বইয়ের একটি সংখ্যা সংগ্রহ করতে ১৯৮৭ সালে তাসুকুজ্জামান ভারতের কলকাতা সাহিত্য পরিষদে যান। তখন তিনি যোগাযোগ করেন কবি প্রীতিশ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। উদ্দেশ্য কলকাতার থিয়েটার হল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সংগ্রহ করা। প্রীতিশ ভট্টাচার্যের বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার তারাউজিয়াল গ্রামে। তাঁর কাছ থেকে তাসুকুজ্জামান জানতে পারেন, এই থিয়েটার হলে সুশীল চ্যাটার্জি নামে মাগুরার এক নাট্য ব্যক্তিত্ব নবাব সিরাজউদ্দৌলা চরিত্রে অভিনয় করতেন। ১৯৭২ সালে সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশ’ নামের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্মারকগ্রন্থ সংগ্রহ করতে তাঁকে বিভিন্ন জেলা ঘুরতে হয়েছে। পরে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ময়মনসিংহ থেকে এটি তিনি সংগ্রহ করেন।

 

ছবির নেশা

তাসুকের নেশা হচ্ছে নিজের ক্যামেরায় ছবি তোলা। দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের অন্তত ১০ হাজার ছবি তুলেছেন। মাগুরা শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলা ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ছবি তাঁর সংগ্রহে আছে। আছে আশপাশের জেলার নানা নিদর্শনের ছবি, আছে পুরনো সব স্থাপনার ছবি। এসব ছবি ও ইতিহাস নিয়ে তিনি একাধিক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন।

 

তাসুক চান

নিজ বাড়িতে বাবা কাজী আকবর হোসেনের নামে একটি স্মৃতি পাঠাগার স্থাপনের কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি দাদা কাজী আব্দুল হকের নামে একটি আর্কাইভ স্থাপনের কাজ চলছে, যেখানে শোভা পাবে সাত হাজার মূল্যবান বই, ২০ হাজার সংবাদপত্র ও সাময়িকী, বিভিন্ন সময়ের মুদ্রাসহ বিভিন্ন গবেষণাসামগ্রী। দাদা, বাবা, চাচাসহ অনুপ্রেরকদের অনেকে বেঁচে না থাকলেও তাঁদের উদ্দীপনাকে পুঁজি করে মা আকলিমা খাতুনের আর্থিক সহায়তায় এই স্মৃতি পাঠাগার ও আর্কাইভ স্থাপনে তিনি অনেকটাই এগিয়েছেন, আর দু-এক বছরের মধ্যে যা শতভাগ সফলতার মুখ দেখবে।



সাতদিনের সেরা