kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

মানুষগুলো হাঁটছে আবার

পেশায় তিনি ব্যাংকার। তবে এই পরিচয়ের বাইরেও আশরাফুল আলম হান্নানের আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি একজন সংগঠক। ‘স্বপ্ন নিয়ে’ নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এ পর্যন্ত ৫২ জনকে বিনা মূল্যে কৃত্রিম পা সংযোজনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে সংগঠনটি। লিখেছেন আল সানি

২৮ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানুষগুলো হাঁটছে আবার

২৪ মে ঢাকার শ্যামলীতে ১৭ জন মানুষের কৃত্রিম পা সংযোজন করে ‘স্বপ্ন নিয়ে’। ছবি : সংগৃহীত

২০১৬ সালে লক্ষ্মীপুরের রামগতি বি.বি.কে পাইলট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম পুনর্মিলনী হয়। অনুষ্ঠানের সংগঠকদের একজন ছিলেন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র আশরাফুল। দেখলেন পুনর্মিলনী সফল করতে প্রত্যেকে আনন্দের সঙ্গে কাজ করছে। খুব পুরনো স্কুল হওয়ার কারণে সবার ভেতর একটি আলাদা উদ্দীপনা ছিল।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের কাজে প্রত্যেক মানুষ উৎসাহ দেয়, এগিয়ে আসে। ব্যাপারটি তখন থেকেই আশরাফুলের মনে গেঁথে যায়। স্বেচ্ছাসেবামূলক একটি সংগঠনের ব্যাপারে তখন থেকেই পরিকল্পনা শুরু করেন। বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ চাইলে তারাও তাঁকে উৎসাহ দেয়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে যাত্রা শুরু করে ‘স্বপ্ন নিয়ে’। ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে করেছিলেন সংগঠনের উদ্বোধন। প্রাথমিকভাবে ‘স্বপ্ন নিয়ে’র লক্ষ্য ছিল মানুষের অপূরণীয় বাসনাগুলো নিয়ে কাজ করার। কোনো স্কুলে শহীদ মিনার নেই, শহীদ মিনার তাদের একটি চাওয়া বা স্বপ্ন। কারোর শরীরের অঙ্গহানি ঘটেছে, অঙ্গটি থাকলে তার স্বপ্নটি পূরণ হবে। এই ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যকে সামনে রাখার জন্যই সংগঠনটির নাম হয়েছিল ‘স্বপ্ন নিয়ে’। এই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়েই এখন পর্যন্ত ৫২ জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির দেহে কৃত্রিম পা সংযোজন করেছে সংগঠনটি। এ কাজে তাদের সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে ইজি লাইফ ফর বাংলাদেশ নামক সংস্থা। এটি মূলত কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কাজ করে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিউটি বেগম ও পরিচালক মনিরুল ইসলাম সব সময় উৎসাহ দেন আশরাফুলদের। একেকটি কৃত্রিম পা সংযোজনে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়।

ইজি লাইফ ফর বাংলাদেশের কল্যাণে কখনো বিনা মূল্যে, কখনো বা স্বল্প খরচে অসহায় মানুষের কৃত্রিম পা সংযোজনের ব্যবস্থা করেন আশরাফুল। সর্বশেষ গত ২৪ মে ঢাকার শ্যামলীতে ১৭ জন মানুষের কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়। শুধু পা সংযোজনই নয়, কৃত্রিম পায়ে কিভাবে চলতে হবে, মানে এর ব্যবহারবিধি বিষয়ে এই মানুষগুলোকে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। ‘মানুষগুলো র্দীঘদিন ক্রাচ, লাঠি কিংবা বাঁশের সাহায্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলত। তবে কৃত্রিম পা পাওয়ার পর তাদের দেখলে মনে হয় তারা যেন সত্যিকারের পা পেয়েছে। মানুষগুলো ভালোভাবে হেঁটে চলাফেরা করতে পারছে, এটা দারুণ আনন্দের ব্যাপার। পা না থাকার অনেকে অসহায়ভাবে বাড়িতে বসে থাকত, ধারদেনা করে চলত। এখন পা পেয়ে শুধু সেই মানুষগুলোর জীবন বদলে গেছে তা নয়, তাদের পরিবারের চেহারাও বদলে গেছে। ’ বললেন আশরাফুল আলম।

সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের কাছে কৃত্রিম পা সংযোজন করতে আসা বেশির ভাগই মোটরসাইকেল বা বিভিন্ন যানবাহনে দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছে। পা হারানোর পর মানবেতর জীবন যাপন করছিল তারা। তবে কৃত্রিম পা লাগানোর পর আবার অনেকেই পুরনো পেশায় ফিরে গেছে, অনেকে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। নোয়াখালী সদরের বাসিন্দা সালাম উদ্দিনও তাদের একজন। কাজ করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। গত বছর অক্টোবরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পা হারান। পরে দীর্ঘদিন কাজে অনুপস্থিত থাকার কারণে চাকরিটাও চলে যায়। আর্থিকভাবেও অসচ্ছল হয়ে পড়েন। খোঁজ পেয়ে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ তাঁকে কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করে দেয়। তিনি এখন অনেকটা সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের মতো হাঁটাচলা করতে পারছেন। আবার নতুন করে চাকরির চেষ্টাও করছেন। বললেন, ‘পা হারানোর পর চাকরিটাও হারালাম। জীবন নিয়ে খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। আশরাফুল ভাইদের কারণে এখন আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখছি। ’ ভোলার কলেজছাত্র হৃদয় ইসলাম পা হারিয়েছিলেন কুমিল্লায়, এক ট্রাক দুর্ঘটনায়। দীর্ঘদিন বাড়িতে বসে থাকার পর চাচার মাধ্যমে খোঁজ পান আশরাফুল আলমের। কৃত্রিম পা সংযোজনের পর এখন নিয়মিত যাচ্ছেন কলেজে। তিনি বললেন, ‘ভেবেছিলাম আর পড়াশোনা হবে না। ক্রাচে ভর দিয়েই জীবন পার করতে হবে। কৃত্রিম পা সংযোজনের পর এখন অনেকটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই হাঁটাচলা করতে পারছি। ’

আশরাফুল আলম জানালেন, মাঝেমধ্যে ঢাকার বাইরে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পা হারানো মানুষটির যাতায়াত খরচ, পা সংযোজনের আগের ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ চলাকালে ঢাকায় তার থাকা-খাওয়া—সব ব্যবস্থা করে ‘স্বপ্ন নিয়ে’। পা সংযোজনকারী বেশির ভাগ মানুষ সংগঠনটির খোঁজ পেয়েছে পরিচিত মানুষজনের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেও অনেকে আশরাফুলকে মোবাইলে খুদে বার্তা দিয়ে জানতে চায় তার পা কি ঠিক হবে কি না। খোঁজখবর নেওয়ার পর পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকার শ্যামলীতে আছে সংগঠনটির স্বপ্ন নিয়ে নিবাস। চিকিৎসার জন্য আসা প্রত্যেকের থাকার ব্যবস্থা করা হয় এখানে। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় ইজি লাইফ ফর বাংলাদেশে। সেখানের ডাক্তাররা পায়ের আকার, বহন করার ক্ষমতা ইত্যাদি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেন কিভাবে কোন পদ্ধতিতে পা লাগানো হবে। ‘আমরা চাই পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষগুলো অচল না হয়ে যায়, তারা যেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একবার শাহিনূর নামের একটি মেয়ে এসেছিল আমাদের কাছে। পা হারানোর কারণে তার বিয়ে হচ্ছিল না। এখানে কৃত্রিম পা সংযোজনের কিছুদিনের মধ্যেই খবর পেলাম—সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। মানুষের জীবনের এই পরিবর্তনগুলো আমাদের উৎসাহিত করে। ’ বললেন আশরাফুল আলম।

শুধু কৃত্রিম পা সংযোজনই নয়, করোনাকালে সংগঠনটি ফ্রি অক্সিজেন, মাস্ক, পিপিইসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করেছে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে। হুইলচেয়ার প্রদান, গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মাঝে কম্বল বিতরণ, সেলুনে বুকশেল্ফ প্রতিষ্ঠা, টিউবওয়েল প্রদানও করেছে। গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, বৃত্তি, রক্তদানের ব্যবস্থাও করছে সংগঠনটি। আশরাফুল আলম নিজেও ২১ বারের মতো রক্ত দিয়েছেন। শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং সংগঠনের সদস্যদের চাঁদায় চলে এসব কার্যক্রম। এখন সারা দেশে প্রায় এক হাজার ২০০ জন ভলান্টিয়ার কাজ করছেন। আশরাফুল আলম বললেন, ‘আমাদের লক্ষ্য অনেক বড়। সামনে সেবার পরিধি আরো বাড়াতে চাই। ’



সাতদিনের সেরা