kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

টাকা নেননি আলম মাঝি

এই দুর্যোগে পর্যটকদের নিরাপদে কূলে পৌঁছে দিয়েছেন। বিপর্যস্ত মানুষকেও পৌঁছে দিয়েছেন বিনা পয়সায়। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখলেন, নিজের সব কিছু ভেসে গেছে। তবু হাল ছাড়েননি। গতকাল পর্যন্ত নিজের নৌকায় আশ্রয় ও খাবার দিয়েছেন ৫৪ জনকে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের অসমসাহসী আলম মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২১ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টাকা নেননি আলম মাঝি

অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টার পর আলম মাঝির সংযোগ পেলাম। ওপাশ থেকে ‘হ্যালো’ বলেই খুকখুক করে কাশতে শুরু করলেন তিনি। আশপাশ থেকে নারী ও শিশুদের চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

‘অনেকের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে? আপনি কি এখন কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে?’

—‘না রে ভাই।

বিজ্ঞাপন

নৌকায়। নৌকাটাউ এখন আমরার ঘরবাড়ি, আশ্রয়কেন্দ্র। ’

—আপনার নৌকায় এখন কতজন আছে?

—৪৯ জন। সবউ (সব) গ্রামের মানুষ। জানটা ছাড়া আমরার আর কিচ্ছু নাই। বানর (বন্যা) জলে সব ভাসিয়া গেছেই।

বোঝা গেল এই কয়েক দিন মানুষটার ওপর বেশ ধকল গেছে।

 

মানুষটা অভিজ্ঞ

হাওরে জলের সঙ্গে মিতালি তাঁর প্রায় ৩৫ বছর ধরে। আগে অন্যের নৌকা চালাতেন। এখন নিজের একটি নৌকা আছে। নাম সাম্পান। বর্ষা মৌসুমে পর্যটকদের নিয়ে হাওরের বুকে ভেসে বেড়ান। দিনরাত নৌকায় কাটে। সাম্পানে ৪০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। সেদিনও (১৬ জুন) সুনামগঞ্জ লঞ্চঘাটে একদল পর্যটক নামিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আরেক দলের জন্য। তিন মাস আগেই বায়না করে রাখা ঢাকার পর্যটকরা যথাসময়ে নৌকায় এল। মোট ২৮ জন। তাদের নিয়ে প্রথমে গেলেন টেকেরঘাট। সুনামগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে টেকেরঘাট প্রায় ৫০ কিলোমিটারের পথ। সেখানেই নৌকায় রাত কাটিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে শিমুলবাগানের দিকে রওনা করেন। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর ঢলের কবলে পড়লেন। আলম মাঝি অভিজ্ঞ মানুষ। বুঝলেন পাহাড়ি ঢল শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই এমন হয়। ফলে ঘাবড়ালেন না। ঢেউয়ে নৌকা ভীষণ দুলছিল দেখে পর্যটকরা ভীষণ ভয় পেয়েছিল। আলম মাঝি তাদের বললেন, আল্লাহ ভরসা।

ঝড়ঝাপটা লইয়াই কারবার

সময় যত গড়াচ্ছিল, জোয়ারের পানি তত বাড়ছিল। সঙ্গে প্রচণ্ড বাতাস। নৌকা আর সামনে এগোয় না। প্রকৃতির সঙ্গে না পেরে একসময় নৌকা ঘোরালেন। বাধ্য হয়ে ধরলেন সুনামগঞ্জের পথ। বিধিবাম। আলম মাঝির ভাষায়, ‘চোখের পলকর মাঝে এক থাকি দেড় আত (হাত) পানি বাড়ি (বেড়ে) গেছে। পানির সে কী তোড়। ’ সুনামগঞ্জ ফেরার পথে লালপুর রাবার ড্যাম ব্রিজের নিচ দিয়ে যেতে হয়। ব্রিজের কাছাকাছি এসেই দেখেন, পানি এত বেড়েছে যে লালপুর ব্রিজের নিচ দিয়ে যেতে গেলে নৌকা আটকে যাবে। ফলে ভিন্নপথ ধরলেন। এভাবে নদীতে ভেসে ভেসে বেলা গড়িয়ে গেল। সন্ধ্যার দিকে সুনামগঞ্জ শহরের কাছে রাধানগর ব্রিজের কাছে নৌকা নোঙর করলেন। পর্যটকরা যেন এতক্ষণে হালে পানি পেল। ‘যাত্রীরা ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি ইতা ঝড়ঝাপটা ডরাই না। আমার লাখান (মতো) নৌকা ছালাই। কারণ আমার তো ঝড়ঝাফটা লইয়াই কারবার,’ বললেন আলম মাঝি। পর্যটকদের রাধানগর ব্রিজের কাছে নামিয়ে দিলেন। এখান থেকে সড়কপথে সুনামগঞ্জ যাওয়া সহজ। সাম্পানসহ তখন রাধানগর ব্রিজের কাছে ছয়টি নৌকা নোঙর করা।

 

আমরা এখন কোথায় যাব?

যা হোক, পর্যটকদের নামিয়ে দিয়ে নৌকার মেঝেসহ সব কিছু ঠিকঠাক করছিলেন। ভাবলেন রাতটা রাধানগরেই কাটিয়ে দেবেন। ঘণ্টাখানেক পর দেখলেন, সেই পর্যটকরা আবার ফিরে আসছে। তারা বলল, ‘ভাই, রাস্তায় অনেক পানি। চারপাশে সব কিছু ডুবে আছে, আমরা এই রাতে যাব কোথায়?’ ‘কী আর করার। তাহলে রাইতটা নৌকাত কাটাইলাউগা। খিচুড়ি বয়াচ্ছি। সকালে যেলান অউক আপনারারে সুনামগঞ্জ টাউনত পৌঁছাইয়া দিমু,’ পর্যটকদের আশ্বস্ত করলেন আলম মাঝি।

রাতে সবাই মিলে খিচুড়ি খেলেন। তাদের পাশে নোঙর করা নৌকার যাত্রীদের খাবার ছিল না। সংখ্যায় তারা ১০ থেকে ১২ জন হবে। তাদেরও খিচুড়ি দিলেন। শুক্রবার (১৭ জুন) সকালেও খিচুড়ি খাইয়ে পর্যটকদের সুরমা ব্রিজের ধারে নামিয়ে দিলেন।

 

বিপদের দিনে টাকা লাগবে না

ব্রিজে তখনো পানি ওঠেনি। কিন্তু পানি না উঠলেও এখানে যেন মানুষের ঢল নেমেছে। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক। বাড়ি ফেরার আকুতি সবার। কিন্তু মানুষের তুলনায় নৌকার সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। কিন্তু এই দুর্যোগে নৌকা নিয়ে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না মাঝিরা। ব্রিজের ওপর থেকে একজন আলম মাঝিকে বললেন, ‘ভাই, আমারে তাহিরপুরে নামিয়ে দেন। লগে ২০ হাজার টাকা আছে। সব দিমু। ’ আলম মাঝি বললেন, ‘বাবা রে, ট্যাখা বড় কথা না, মানুষ বিপদে পড়ছে। সবরে নিতে অইব। ’ সেই ব্যক্তিসহ আরো ৪৯ জনকে নিয়ে তাহিরপুরে রওনা দিলেন অসমসাহসী আলম মাঝি। নামার পথে যাত্রীদের কেউ ৫০০, কেউ দুই হাজার, কেউ বা পাঁচ হাজার করে টাকা সাধলেন। কিন্তু আলম মাঝি কারো কাছ থেকে টাকা নেননি। বললেন, ‘বিপদের দিনো ট্যাখা লাগোত নায়। পরিবারের কাছে গিয়া দোয়া কইরেনযে। ’

 

আব্বু, আমি এখানে

তাহিরপুরের বাদাঘাটের সূর্যেরগাঁওয়ে আলম মাঝির বাড়ি। যাত্রীদের নামিয়ে দুপুর ১২টার দিকে বাড়ি ফিরলেন। চারপাশ পানিতে থই থই করছে। ঘরের ভেতর কোমরপানি। ধান-চাল থেকে শুরু করে ঘরে কিছুই নেই। কাঁথা-বালিশ সব পানিতে ভাসছে। বউ-বাচ্চা ঘরে নেই। প্রতিবেশীরাও নেই। কাউকে না পেয়ে অজানা আশঙ্কায় অন্তর কেঁপে উঠল আলম মাঝির। এদিক-সেদিক খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন। তাঁর গগনবিদারী চিৎকার শুনেই হয়তো ছোট ছেলেটাও চিৎকার করে উঠল, ‘আব্বু, আমি এখানে। ’ দূরে তাকিয়ে দেখেন একটি নৌকায় অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে গিয়ে ছোট ছেলেটিকে বুকে চেপে ধরে চোখের জল আর ধরে রাখতে পারলেন না আলম মাঝিও। ‘মিঠু ভাইওর নৌকাত আমার বউ-সন্তানরা। বউটা হাউমাউ করে কান্দিয়া বলছিল, কনকনে ঠাণ্ডায় রাত ৩টা পর্যন্ত পানিত খাড়াইয়া আছলাম। ’ পরে এক প্রতিবেশীর সহায়তায় এই নৌকায় ঠাঁই নিয়েছেন তাঁরা। স্ত্রী-সন্তানকে নিজের নৌকায় তুললেন। একে একে আরো ৫৪ জন নারী-পুরুষকে নিজের নৌকায় ঠাঁই দিলেন।

 

গলা দিয়া ভাত নামে না

কিন্তু এত মানুষের খাবার তো নৌকায় নেই। সেদিন বিকেলে তাহিরপুর বাজারে গেলেন। বাজারে তখনো পানি। দু-একটি দোকান খোলা ছিল। সেখান থেকে দুই বস্তা চাল, চিড়া, মুড়ি, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি কিনলেন। এখনো সেসবে চলছে। সবাই মিলে নৌকায়ই দিনরাত কাটাচ্ছেন।

আলম মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, আজ কী খেয়েছেন?

বললেন, ‘ভাই, চারিদিকে মানুষের হাহাকার। একবার এ বিলাপ করে তউ (তো) আরেকবার ও। কে কাকে সান্ত্বনা দিব। মাইনসের এত কষ্টের মাঝে গলা দিয়া ভাত নামেনি কইন?’



সাতদিনের সেরা