kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ আগস্ট ২০২২ । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১২ মহররম ১৪৪৪

ওরা কাজ করে নীরবে

২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৩টি পরিবারকে ঘর, ১৫ জনকে দোকান, ৭৬টি টিউবওয়েল, ৩৫টি ইজি বাইক, ২০টি হুইলচেয়ার ও ৩৫টি সেলাই মেশিন দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইলেন্ট হ্যান্ড সাপোর্ট। তাদের কাজ নিয়ে লিখেছেন রায়হান রাশেদ

১৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ওরা কাজ করে নীরবে

শরীফ মুহাম্মদ-তাহমিনা আহমেদ দম্পতি

২০১৮ সাল থেকে যাত্রা শুরু করেছে সাইলেন্ট হ্যান্ড সাপোর্ট। শুরুতে অসহায় শিশুদের খাবার, বিধবা নারীর ভরণ-পোষণ ও সেলাই মেশিন দিত এরা। এখন সেবার পরিধি বেড়েছে। প্রতি শুক্রবারে পথশিশুদের খাবার দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অসহায় ও এতিম বাচ্চাদের পড়াশোনা এবং খরচের দায়িত্ব নিচ্ছে। সংগঠনটির উদ্যোক্তা শরীফ মুহাম্মদ-তাহমিনা আহমেদ দম্পতি। তাঁরা অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী। তাহমিনা গাজীপুরের মেয়ে।  

প্রথমে নিজের এলাকায় কাজ শুরু করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া থেকে টাকা পাঠিয়ে আত্মীয়দের মাধ্যমে কাজ করাতেন। সেসব ফেসবুকে শেয়ার করতেন। সেই সূত্রেই নাহিদ আহমেদের সঙ্গে পরিচয়। সাতক্ষীরার নাহিদ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তখন থেকে দেশে সাইলেন্টের কাজের দেখভাল করেন নাহিদ। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন রফিক, আদনান ও মঞ্জুরুল ইসলাম। আর অস্ট্রেলিয়া থেকে তাঁদের দিকনির্দেশনা দেন তাহমিনা ও শরীফ। এরই মধ্যে সমাজসেবা মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধনও নিয়েছে সংগঠনটি। এখন ঢাকায় কাজ করছেন ২০ জন। ঢাকার বাইরে ৩৫ জন।

সংগঠনের সদস্যরা প্রথমে নিজেরা চাঁদা দেওয়া ছাড়াও ফেসবুকে অভাবী মানুষের বিস্তারিত তুলে ধরে পোস্ট দিতে থাকেন। অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সেই টাকা দিয়ে অসহায় মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার অবলম্বন তৈরি করে দেন। আয়-ব্যয়ের হিসাবও দেন ফেসবুকে। নাহিদ বললেন, ‘কাজের স্বচ্ছতার জন্য খরচাপাতি ফেসবুকে পোস্ট করি। ’

 

ওরা এখন আর ভিক্ষা করে না

শরীয়তপুরের শাকিল প্রতিবন্ধী। ভিটেবাড়ি নেই। মা ঢাকায় ভিক্ষা করতেন। ভিক্ষা করার সময় তাঁকে শাহজাহানপুরে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখতেন। সারা দিন এভাবেই যেত শাকিলের। খবর পেয়ে সাইলেন্ট হ্যান্ড সাপোর্টের সদস্যরা শাকিলের গল্প ফেসবুকে শেয়ার করেন। তাঁর জন্য জমা হয় ছয় লাখ টাকা। শরীয়তপুরের ডিসির মাধ্যমে জায়গারও ব্যবস্থা হয়। আর উত্তোলনকৃত টাকায় সেখানকার পালঙ থানার দক্ষিণ কেবলনগরে ২৮ শতক সরকারি জমিতে বাড়ি করে দেওয়া হয়। তা ছাড়া শাকিলের বৃদ্ধ মায়ের নামে ব্যাংকে এক লাখের ওপরে টাকা রাখা হয়। ‘হেরা আমার পায়ের তলে মাটি ঠেকাইছে। ইটের ঘর, টয়লেট, কল কইরা দিছে। টেকা দিছে। ’ বললেন শাকিলের মা।

শাকিলের মতো নেত্রকোনার জাকির হোসেনও বুদ্ধি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী। বৃদ্ধ মা জাকিরের কোমরে রশি বেঁধে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে বেড়াতেন। পরে জাকিরদের ঘর নির্মাণ করে দেয় সাইলেন্ট। জাকিরের মায়ের হাতে নগদ অর্থ ও দুটি ছাগল দেয়। জাকিরের মা এখন আর ভিক্ষা করেন না। এভাবে সংগঠনটি এ পর্যন্ত ১৩টি পরিবারকে ঘর দিয়েছে।

 

পা নেই, ইজি বাইক চালাবেন?

২০১৯ সালে মেডিক্যাল ক্যাম্প করতে সংগঠনের সদস্যরা গোপালগঞ্জ গিয়েছিলেন। সেখানকার বাসিন্দা বিনি বেগম। স্বামীহারা এই নারী চার কন্যার জননী। রাস্তায় মাটি কাটার কাজ করতেন। সাইলেন্টের সদস্যরা বিনি বেগমকে একটি দোকান করে দেন। ফ্রিজও কিনে দেন। মেয়েদের স্কুলেও ভর্তি করিয়ে দেন।

‘চার মাইয়া রাইখ্যা স্বামী মারা যায়। তহন আমি রাস্তায়, মাইনষের বাড়িত কাম কইরা খাইতাম। ওনারা আমারে দোকানের মাল-সামানা কিন্না দিছে। মেয়েদের পড়ালেখার খরচও দিছে। আমি অহন আগের চেয়ে ভালা আছি’, বললেন বিনি বেগম। ২০২০ সালের শীতে কম্বল বিতরণ করতে নীলফামারীর আরাজিদুয়ায় যান সংগঠনের সদস্যরা। সেখানেই দেখা হয় হুইলচেয়ারে বসা তরুণ জাকির হোসেনের সঙ্গে। ড্রেজারে মাটি কাটার কাজ করতেন তিনি। এক দুর্ঘটনায় মেশিনের নিচে পড়ে দুই পা হারান। বাবা মারা গেছে অনেক আগেই। মা বিয়ে করে চলে গেছেন। নানার সঙ্গে থাকেন জাকির। সেই থেকে হুইলচেয়ারই সঙ্গী তাঁর। পরে সংগঠনটি নতুন একটি হুইলচেয়ার ছাড়াও দেড় লাখ টাকা খরচে একটি দোকান করে দেয় জাকিরকে। এ রকম ১৫ জনকে দোকান করে দিয়েছে সাইলেন্ট। জাকিরের মতোই এক দুর্ঘটনায় পা হারান নরসিংদীর উসমান আলী।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির বিপদে পুরো পরিবার ভেঙে পড়ে। উসমান আলী বললেন, ‘ইজি বাইক দিলে আমি সংসার চালাতে পারব। ’ সাইলেন্টের কর্মীরা বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আপনার পা নেই, ইজি বাইক চালাবেন কী করে। ’ বললেন, ‘ফ্যাক্টরিতে কথা বলে ইজি বাইকের পায়ের ব্রেকটা হাতে করে দিতে হবে। পরে সেই ধরনের একটি ইজি বাইক কিনে দেওয়া হয় উসমান আলীকে। খরচ হয়েছিল এক লাখ ২০ হাজার টাকা। সেটা ২০১৯ সালের কথা। সাইলেন্টের সংগঠক নাহিদ বলেন, ‘এমন ৩৫ জনকে ইজি বাইক কিনে দিয়েছি আমরা। ’

 

ঝুমঝুমি স্কুলে যায়

এখন ৩১ জন শিক্ষার্থীর পড়ালেখা থেকে শুরু করে পোশাক-আশাকের খরচ দিচ্ছে সংগঠনটি। তাদের একজন ঝুমঝুমি। বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদীতে। রান্নাঘরে সমবয়সী এক মেয়ের সঙ্গে খেলতে গিয়ে চুলার আগুনে ঝুমঝুমির গা পুড়ে যায়। পরে সাইলেন্টের সহায়তায় শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা চলে ঝুমঝুমির। সব মিলিয়ে খরচ হয় তিন লাখ টাকার মতো।

মেয়েটি এখন আবার স্কুলে যায়। ঝুমঝুমির মা নাসিমা বেগম বললেন, ‘নাহিদরা খুব ভালা মানুষ। তাঁদের জন্যই আমার মেয়ে ভালা আছে। ’ সাইলেন্টের উদ্যোক্তা তাহমিনা বলেন, ‘অসহায় মানুষদের ঘিরেই আমার পৃথিবী। তাঁদের জন্য কিছু করতে পারার স্বপ্ন, আমার দুঃখ-কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। সামনে সেবার পরিধি আরো বাড়াতে চাই। ’



সাতদিনের সেরা