kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

আমাদের পেশাদার বক্সার

সম্প্রতি হয়ে গেল দেশের প্রথম পেশাদার বক্সিংয়ের আয়োজন। নেপালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে তাতে ৬১ কেজি ওজন শ্রেণিতে বিজয়ী হয়েছেন সুরো কৃষ্ণ চাকমা। তাঁর পেশাদার বক্সার হয়ে ওঠার গল্প বলছেন নাবীল অনুসূর্য

২৪ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমাদের পেশাদার বক্সার

‘দি আল্টিমেট গ্লোরি’তে জয়ের পর সুরো কৃষ্ণ চাকমা ছবি : সংগৃহীত

২০০৬ সাল। রাঙামাটিতে বসেছে বিকেএসপির ট্রায়াল। সুরোদের বাড়িও রাঙামাটি। জুরাছড়ি উপজেলায়।

বিজ্ঞাপন

ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ভীষণ ডানপিটে। সারা দিন মেতে থাকতেন খেলাধুলা নিয়ে। কাজেই নাম লেখালেন তাতে। ফুটবলে। উচ্চতা কম হওয়ায় বাদ পড়ে যান। কিন্তু হাল ছাড়েননি। ‘খেলাধুলার পাশাপাশি আমি কুংফু-কারাতের সিনেমা খুব ভালোবাসতাম। প্রিয় নায়ক ছিলেন ব্রুস লি। তাই ভাবলাম, বক্সিংয়েও ট্রায়াল দিয়ে দেখি’, বলেন সুরো। তাতে সফলও হন। তবে সেটা জানতে অপেক্ষায় থাকতে হয় বছরখানেক। ডাক আসে পরের বছর। বিকেএসপিতে ভর্তি হন সপ্তম শ্রেণিতে। শুরু হয় মুষ্টিযোদ্ধা হওয়ার পথে যাত্রা।

মাধ্যমিকের পর উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডিও পার হন বিকেএসপি থেকেই। কলেজে থাকতে অংশ নেন ইন্টারমিডিয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে। বিজয়ী হন ৬১ কেজি ওজন শ্রেণিতে। এরপর আসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রশ্ন। ‘আমার সব সময় লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার; এমনকি অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাও দিইনি’, বলেন সুরো। সুযোগও পেয়ে যান। ২০১৩-১৪ সেশনে। ভর্তি হন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে। কারণটা বলেন নিজেই, ‘আগে থেকেই জানতাম এই বিভাগের শিক্ষকরা খেলাধুলার ব্যাপারে খুবই উৎসাহী; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রায় পুরোটাই আমি ন্যাশনাল ক্যাম্পে ছিলাম। বাংলাদেশ অপেশাদার বক্সিং ফেডারেশনের অধীনে। কখনো তিন মাসের ক্যাম্প, কখনো ছয় মাসের। প্রায় সেমিস্টারেই ক্লাস করা হতো না। শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতাম। এ নিয়ে বিভাগে কখনোই সমস্যায় পড়তে হয়নি। ’

এরই মধ্যে আসে সুযোগ। পেশাদার বক্সিংয়ের জগতে পা রাখার। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে আসেন আলী জ্যাকো। পারিবারিক সূত্রে বাংলাদেশি হলেও তাঁর জন্ম লন্ডনে। ছিলেন পেশাদার কিকবক্সার। কিকবক্সিংয়ে তিনিই প্রথম এশীয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। অবশ্য সংগত কারণেই ক্রীড়াঙ্গনে ব্রিটিশ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

‘তিনি উদ্যোগ নেন দেশের সেরা বক্সারদের লন্ডনে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার। তাঁদের পেশাদার বক্সিংয়ের সঙ্গে পরিচিত করানোর। সে জন্য সারা দেশ থেকে সেরা পাঁচজনকে বাছাই করা হয়। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন বিকেএসপির, দুজন সেনাবাহিনীর, আর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’, বলেন সুরো। কিন্তু বেঁকে বসে ফেডারেশন। তাদের বাধায় যেতে পারেননি অন্যরা। সুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় বাধা দিতে পারেনি ফেডারেশন। আলী জ্যাকোর সঙ্গে যোগাযোগ করে চলে যান লন্ডনে।

সেই অভিজ্ঞতা বক্সিং সম্পর্কে তাঁর ধারণাই বদলে দেয়। সুরো বলেন, ‘লন্ডনে প্রশিক্ষণটা ছিল ছয় মাসের। ওই সময়ে নিজের চোখে দেখলাম আন্তর্জাতিক বক্সিং। পেশাদার বক্সারদের জীবনযাপন কেমন, খেলা কেমন হয়, কিভাবে হয়—সব দেখলাম। খেলোয়াড় হিসেবে আমার সম্ভাবনা কতটুকু, একজন পেশাদার বক্সার কত দূর যেতে পারেন—সেসব জানতে পারলাম। ’

দেশে ফেরার পর তিক্ত অভিজ্ঞতাটাও হয়ে যায়। নিষেধ না শোনায় ফেডারেশন তাঁকে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। তাই বলে একেবারে হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি সুরো। ২০১৮ সালে ভারতে দুটি পেশাদার বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। বরাবরের মতোই ৬১ কেজি ওজন শ্রেণিতে। এখন পর্যন্ত সব প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিয়েছেন এ বিভাগেই। ওদিকে ওই বছরের শেষেই সরে যায় ফেডারেশনের বাধা। নির্বাচনে জিতে দায়িত্ব নেয় নতুন কমিটি। তারা আগ্রহ ভরে ডেকে নেয় সুরোকে। তিনিও একবাক্যে রাজি হয়ে যান। ‘কারণ দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে সম্মানজনক আর কিছু নেই। যেকোনো মঞ্চে নিজের দেশের পতাকা তুলে ধরতে পারা ভীষণ গৌরবের’, সুরো স্বীকার করেন অকপটে।

এর আগে ২০১৩ সালে অষ্টম বাংলাদেশ গেমসে অংশ নিয়ে সোনা জিতেছিলেন সুরো। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে পরের আসরটি হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। করোনার থাবায় পিছিয়ে যায় বছরখানেক। ২০২১ সালে নবম বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসেও ধরে রাখেন সোনা। ২০২২ সালে বিজয়ী হন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে। এরই মধ্যে বসে দেশের প্রথম পেশাদার বক্সিংয়ের আসর। অবশ্য বছর দুয়েক ধরেই চলছিল সেই চেষ্টা। এর আগে বিকেএসপিতে ভারতীয় বক্সারদের নিয়ে একটি আয়োজনও হয়েছিল। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে তা পায়নি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবে এবার পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বক্সিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) আয়োজন করেছে ‘সাউথ এশিয়ান প্রফেশনাল বক্সিং ফাইট নাইট—দি আল্টিমেট গ্লোরি’। ১৯ মে হয়ে গেল রাজধানীর মিরপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে। সেখানে নেপালের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মহেন্দ্র বাহাদুর চাঁদের মুখোমুখি হন সুরো। কেমন শক্ত প্রতিপক্ষ তিনি তা বললেন সুরো নিজেই, ‘শুধু নেপালের চ্যাম্পিয়নই নন, তিনি এক মাস আগেই হারিয়ে এসেছেন ভারতীয় বক্সারদের। ’ সেই মহেন্দ্রকেই হারিয়ে দিয়েছেন সুরো। এবার সবাই তাই চোখ মেলে দেখছেন সুরোকে। আর সুরো তাকাচ্ছেন আরো বড় সাফল্যের দিকে।

তবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অন্য একটা ব্যাপারে। বলেন, ‘নিজের পাশাপাশি আমি কাজ করতে চাই দেশের বক্সিং নিয়ে। নতুন যাঁরা এই খেলায় আসছেন, তাঁদের দিতে চাই আরো ভালো ধারণা—কিভাবে এই খেলাকে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়, পা রাখা যায় পেশাদারি অঙ্গনে। শুধু বক্সিংই নয়, পেশা হিসেবে নেওয়া যেতে পারে যেকোনো খেলাকেই। দরকার দৃঢ় অধ্যবসায়। তাহলেই ধরা দেবে সাফল্য।



সাতদিনের সেরা