kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

[ সুপ্রভাত বাংলাদেশ ]

যশোরের ‘রস কাকা’

কনকনে শীত উপেক্ষা করে উঠে পড়েন খেজুরগাছে। ৫০টি গাছ থেকে রস নামিয়ে তা বিলিয়ে দেন গ্রামের মানুষের মধ্যে। কাজী ফারুক হোসেন কাজটি করছেন চার বছর ধরে। এলাকার শিশু-কিশোদের প্রিয় এই ‘রস কাকা’কে নিয়ে লিখেছেন ফিরোজ গাজী

২৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



যশোরের ‘রস কাকা’

ফারুকের বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়ার বহরমপুরে। বয়স ৫৯ বছর। শিক্ষকতা করেন খলশী আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ে। কিন্তু শীতকালে প্রতিদিন ভোরে খেজুরগাছে উঠে রস সংগ্রহ করেন।

বিজ্ঞাপন

গ্রামের মানুষের মাঝে সেই রস বিলিয়ে দেন। এর জন্য কারো কাছ থেকে পয়সা নেন না। এমনকি রস সংগ্রহ করার ভাঁড়সহ (মাটির পাত্র) অন্যান্য উপকরণও কেনেন নিজের টাকায়। বাদুড় বা অন্যান্য প্রাণীর হাত থেকে নিরাপদ রাখতে রসের হাঁড়ির ওপর জাল লাগানোর ব্যবস্থাও করেন। যশোরের যশ খেজুরের রস—নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে অভিনব এই উদ্যোগ তাঁর। দুই ছেলে নাজমুস সাকিব ও মাহবুব হেলাল এবং মেয়ে উম্মে হাবিবা তাঁর এই কাজের সহযোগী।

ফারুকের খেজুরগাছ ১৫টি। বহরমপুরে অনেক খেজুরগাছ পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে। প্রতিবছর শীতে এ রকম ৫০-৬০টি খেজুরগাছ কাটেন ফারুক। এবারও ৫০টি খেজুরগাছ কেটেছেন।

 

সরেজমিন

এক ভোরে ফারুকের বাড়িতে গেলাম। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি বাড়ি ছেড়েছেন। একটু পরেই দেখলাম সাইকেলের পেছনে ভাঁড়ভর্তি রস এনে উঠানে রাখছেন। আমাদের দেখে হাসিমুখে বসার অনুরোধ জানিয়ে বললেন, ‘আরো কিছু গাছ থেকে রস আনা বাকি। ’ সাইকেলের পেছনে কয়েকটি খালি ভাঁড় ঝুলিয়ে বের হলেন রস সংগ্রহে। আমরাও তাঁর সঙ্গে চললাম। একটু পরেই একটা গাছে ওঠার পর ফারুকের চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক। বললেন, ‘এই গাছে রস ভালোই হয়েছে। ভাঁড় প্রায় ভরে গেছে। ’ এভাবে গ্রামের বিভিন্ন জায়গার ১২টি গাছ থেকে রস নামালেন। পরে আবার ছুটলেন বাড়ির পথে।

 

আসুন, রস খেয়ে যান

রস ছাঁকা শেষ হতেই ফারুকের ছেলে হেলাল হ্যান্ড মাইক হাতে বের হলেন। আশপাশের মানুষকে আমন্ত্রণ জানাতেই এই ব্যবস্থা। বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হেলাল বলতে শুরু করলেন, ‘যারা রস খাবে, তাড়াতাড়ি গ্লাস-মগ নিয়ে চলে আসো। ’ কয়েক মিনিটের মধ্যেই আশপাশের বাড়ি থেকে হৈচৈ করে আসতে থাকল শিশুরা। কারো হাতে গ্লাস, কারো হাতে মগ, কারো হাতে ছোট ঘটি কিংবা জগ। একদল শিশু জড়ো হলো ফারুকের উঠানে। ফারুক একেকজনের হাত থেকে গ্লাস-মগ নিয়ে সেগুলো পূর্ণ করে দিতে থাকলেন খেজুর রসে। তবে শিশুদের সামলানো কি সহজ কথা! কে কার আগে রস নেবে তা নিয়ে হুড়াহুড়ি লেগে গেল। ‘ওদের এই আনন্দটাই তো আসল’, বললেন ফারুক।

 

গ্রামবাসীরা বললেন

ছেলেকে কোলে নিয়ে রস পান করতে এসেছেন সাবিনা খাতুন। বললেন, ‘রস কাকার জন্যি বাচ্চারা রস খাতি পারে। এর জন্যি তিনি কোনো টাকা-পয়সা নেন না। ’ বহরমপুর বাজারের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানও এসেছিলেন। বললেন, ‘এই বাজারের কোনো লোক বলতি পারবে না সে ফারুক সাহেবের রস খায়নি। তিনি রস পাইড়ে আইনে ওয়ান টাইম গ্লাসে করে বাজারের মানুষরে খাওয়ান। ’ দোহাকুলা ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য শাহিনা পারভিন বলেন, ‘এলাকার মানুষের গোরস্থানের জন্য নিজের জমি দান করেছেন। রাস্তার পাশে প্রায় আট হাজার তালের চারাও রোপণ করেছেন ফারুক হোসেন। ’

 

কেন করেন

এ প্রশ্নের জবাবে ফারুক হোসেন বললেন, ‘কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি, গ্রামে খেজুরগাছ কমে গেছে। আবার যেগুলো আছে সেগুলো কাটার মতো দক্ষ গাছি খুব কম। ফলে রসের দামও অনেক বেড়ে গেছে। সবাই কিনে খেতে পারে না। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতেই আমার এই প্রচেষ্টা। যত দিন সুস্থ থাকব কাজটি করে যাব। ’



সাতদিনের সেরা