kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

অ্যান্টার্কটিকায় এক বাঙালি দম্পতি

রেজাউল-শারমীন দম্পতি এ পর্যন্ত ৮৩টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। সর্বশেষ গেছেন অ্যান্টার্কটিকায়। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে রোমাঞ্চকর সেই ভ্রমণকাহিনি শুনিয়েছেন রেজাউল বাহার

২৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অ্যান্টার্কটিকায় এক বাঙালি দম্পতি

অ্যান্টার্কটিকায় রেজাউল ও শারমীন

পৃথিবীর শেষ প্রান্ত দক্ষিণ মেরুতে অ্যান্টার্কটিকার অবস্থান। গড় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে—মাইনাস ৬০ থেকে মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাটি বলে এখানে কিছু নেই। আছে পাথরের ওপর বরফের স্তর।

বিজ্ঞাপন

এই অঞ্চলে বরফের গড় উচ্চতা সাত হাজার ফুট। এখানে ভ্রমণও বেশ ব্যয়বহুল। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

 

যাত্রা শুরু করলাম

চিলির শেষ প্রান্ত থেকে আমাদের সমুদ্রযাত্রা শুরু। পৃথিবীর সর্বদক্ষিণে সিলভার-সি এক্সপেডিশন জাহাজে আমরা। তিন রাত ধরে সমুদ্র পাড়ি দিতে। সমুদ্রের সেই অংশের নাম ড্রেক প্যাসেজ। সব নাবিকই জানেন ভয়ংকর এই প্যাসেজের কথা। অনেকেই অ্যান্টার্কটিকা যেতে চান না শুধু এই ড্রেক প্যাসেজ পাড়ি দেওয়ার ভয়ে। সব ধরনের প্রস্তুতি আর সি-সিকনেস মেডিকেশন নেওয়ার পরও শারমীন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। রাতভর উত্তাল সমুদ্রে জাহাজের ওঠানামা, মাঝে মাঝে মনে হয়েছে—ডুবে যাবে না তো, এখানে না এলেই হয়তো ভালো হতো। অবশ্য তৃতীয় রাতে সমুদ্র শান্ত ছিল।

 

শুভ সকাল

প্রতিদিন সকালে জাহাজের সেন্ট্রাল অ্যানাউন্সমেন্টে এক্সপেডিশন টিম থেকে একটা বার্তা আসে—‘শুভ সকাল’। এরপর জাহাজের অবস্থান জানিয়ে দেয় তারা। এরই মধ্যে আমরা অ্যান্টার্কটিকার পেনিনসুলায় পৌঁছে গেছি। সামনে শেটল্যান্ড। শারমীনের তখনো ঘুম ভাঙেনি। পর্দা সরিয়ে কাচের দরজা খুললাম। চোখের সামনে সাদা বরফের শব্দহীন জগৎ!

 

প্রথম দিন

প্রতিদিন তাপমাত্রা, বাতাসের গতিবেগ, সমুদ্রের ঢেউ, আর মূল ভূখণ্ডে বরফের অবস্থা—এসব দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জাহাজ থেকে ভ্রমণকারীদের বের হওয়ার সুযোগ আছে কি না। প্রথমে এক্সপেডিশন টিম ৮ থেকে ১০টি জোডিয়াক (পাওয়ারচালিত বোট) নিয়ে বিভিন্ন দিকে বের হয় উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের জন্য। এর পরই সিদ্ধান্ত আসে সেদিন ভ্রমণকারীদের ভূখণ্ডে পা ফেলা হবে কি না। প্রথম দিন সকালে জাহাজ ছেড়ে নামা হলো না। কারণ আবহাওয়া প্রতিকূল।

 

প্রাণিকুলকে বিরক্ত করা যাবে না

ভ্রমণকারীদের জাহাজেই নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শীতবস্ত্র, ওয়াটারপ্রুফ বুট, ব্যাকপ্যাক বা অন্য যা কিছু নিয়েই নামা হোক না কেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করা হয়। জাহাজে ওঠানামার সময় কেমিক্যাল ব্যবহার করে পায়ের বুট ধুয়ে নিতে হয়। পানি দিয়ে পরিষ্কারের জন্যও থাকে আলাদা স্টেশন। মোদ্দাকথা, এখানে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যান্টার্কটিকা ট্যুর অপারেটরসের (আইএএটিও) নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। নিয়মাবলির তালিকা অনেক লম্বা। যেমন—কোনো জাহাজ থেকে একই সঙ্গে একই স্থানে ১০০ জনের বেশি নামতে পারবে না। একই সঙ্গে একই স্থানে দুটি জাহাজ যাবে না। এখানকার প্রাণিকুলকে বিরক্ত না করতেই এত আয়োজন।

 

যাত্রীর চেয়ে ক্রু বেশি

আমাদের জাহাজটা যেন ভাসমান পাঁচতারা হোটেল। যাত্রী ১৮০, ক্রু ২১৯ জন। মানে ভ্রমণকারীর চেয়ে ক্রু বেশি! দ্বিতীয় দিন বিকেলে গেলাম ডিসেপশন আইল্যান্ডে। এটা মূলত একটা আগ্নেয়গিরি। ছোট ছোট বোটে চড়ে আমরা নেমে এলাম তীরে। কালো কালো ছোট পাথরে ঘেরা সৈকত। আগ্নেয়গিরি থেকে এখনো বাষ্প আর গ্যাস বের হচ্ছে। এখানটায় তাপমাত্রা শূন্যের কিছুটা ওপরে। অদ্ভুত ব্যাপার, এখানে মানুষের ফেলে যাওয়া তেলের বড় বড় ট্যাংক, কিছু ভাঙা স্থাপনা আছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, অনেক আগে শিকারিরা তিমি মাছ শিকার করে তেল নিয়ে যেত। ১৯৭০ সালে এই আগ্নেয়গিরিতে শেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়।

এন্টারপ্রাইজ আইল্যান্ডে ১৯১৫ সালে ডুবে যাওয়া সেই জাহাজ। ছবি : রেজাউল বাহার

 

জাহাজটা অর্ধেক ডুবে আছে

সাত দিন ছিলাম। মূল ভূখণ্ডে নেমেছি কয়েকবার। আশপাশের দ্বীপেও গেছি। সংগত কারণেই জাহাজ নোঙর করা হয় মাঝসমুদ্রে। ছোট ছোট বোটে করে আমাদের তীরে নেওয়া হতো। এই বোটে যাওয়াটাও এক চ্যালেঞ্জ। সমুদ্রের ঢেউয়ের পাশাপাশি আছে ভেসে থাকা বরফখণ্ড। হাড়-কাঁপানো শীতল বাতাস। গায়ে চার লেয়ারের শীত পোশাক। হাতে গ্লাভস। পায়ে বুট। তা সত্ত্বেও বোটে জড়সড় হয়ে বসে থাকতে হতো। একেকটা বোটে সাত-আটজন।

একবার গেলাম এন্টারপ্রাইজ আইল্যান্ড। চারদিকে অসংখ্য আইসবার্গ। মাঝে মাঝে কিছু পাখি উড়ে যায়। তাদের শব্দ স্পষ্ট ভেসে আসে কানে। একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠল শত বছর আগের ডুবে যাওয়া এক জাহাজ। অনেকটা তীরের কাছাকাছি। অর্ধেক ডুবে আছে। জাহাজটা ছিল তিমির তেল তৈরির কারখানার। তখন অনেক বড় জাহাজ নিয়ে আসা হতো এখানে। সব কিছু প্রসেস করে তেল নিয়ে যাওয়া হতো। ১৯১৫ সালের একদিন। সারা মৌসুমের শিকার শেষে আনন্দে মেতেছিলেন জাহাজের ক্রুরা। অসতর্কতায় পড়ে যায় ল্যাম্প। ডেকের নিচে হাজারো গ্যালন তিমির তেল। ব্যস, সব শেষ।

অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে বড় আইসবার্গের দৈর্ঘ্য চার হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার। এ রকম আইসবার্গগুলো বিজ্ঞানীরা নিয়মিত মনিটর করে থাকেন। কারণ এগুলো গলে গেলে পৃথিবীর অনেকটা ডুবে যাবে।

 

এরা কারা?

আমরা তীরে আসার আগেই এক্সপেডিশন টিম এসে এখানে ছোট ছোট লাল পতাকা দিয়ে কত দূর যাওয়া যাবে তার সীমারেখা টেনে দেয়। মানে ভ্রমণকারীদের বিচরণের জায়গা সীমিত। খালি চোখে মনে হবে সামনে মসৃণ পথ। কিন্তু সীমারেখার বাইরে পা দিলে হাঁটু থেকে কোমর অবধি বরফে ঢেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

অ্যান্টার্কটিকায় পেঙ্গুইনদের রাজত্ব। দেখলাম পেঙ্গুইনরা ডিমে তা দিচ্ছে। কিছু জায়গায় ছোট বাচ্চাও আছে। পেঙ্গুইনরা কৌতূহলী প্রাণী। এরা মাঝে মাঝে কাছে এসে দেখে লাল পোশাকের এই অপরিচিত প্রাণীগুলো কারা।

 

যে দৃশ্য ভোলার নয়

কায়াকিং ব্যাপারটা তেমন জটিল নয়, ভয় হলো জায়গা নিয়ে। পৃথিবীর কোনো অংশের আবহাওয়া বা সমুদ্রের সঙ্গে অ্যান্টার্কটিকার আবহাওয়াকে মেলানো বোকামি। ডুবলে ঠাণ্ডায় নির্ঘাত মরণ। কায়াকিংয়ের জন্য আলাদা স্যুট পরে নামতে হয়। আমরা কায়াকিং করলাম অরনি-হার্বরে (ঙজঘঊ ঐঅজইঙজ)। পানিতে ভেসে থাকা বরফখণ্ড সামলে চলা, মাথার ওপর অ্যালবাট্রস পাখির আনাগোনা, সাদা বরফে সিল মাছের রোদ পোহানো—এমন দৃশ্য ভোলার নয়।

 

ঝাঁপ দিয়েছি জলে

অ্যান্টার্কটিকায় সবচেয়ে সাহসের কাজ পোলার প্লাঞ্জ বা শীতল সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া। আগে ইউটিউবে দেখেছি। কিন্তু বড় হয়েছি বাংলাদেশে। তা ছাড়া এখন বয়স হয়েছে। এর পরও মনের জোরে ভরসা রাখলাম। অন্য সব কিছুর মতো এ ব্যাপারেও জাহাজে ট্রেনিং ছিল। কাগজপত্রে সই করতে হতো—কিছু হলে নিজের দায়। জাহাজে থাকা চিকিৎসকেরও অনুমতি লাগে। খালি গায়ে ঝাঁপ দিতে হবে। পরনে হাফ প্যান্ট এই যা। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। একদিন সকালে জাহাজ নোঙর করল পোর্টাল পয়েন্টে। একসময় জাহাজের ডেকের দরজা ধরে বেরিয়ে পড়লাম। ঝাঁপও দিলাম। তবে পানিতে ৩০-৩৫ সেকেন্ডের বেশি থাকতে পারিনি। মনে হচ্ছিল চামড়ার প্রতিটি বিন্দুতে কেউ সুই দিয়ে খোঁচা মেরে গেছে। আমার বয়সে আর কোনো বাংলাদেশি অ্যান্টার্কটিকার শীতল সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছেন বলে জানা নেই।



সাতদিনের সেরা