kalerkantho

বুধবার ।  ১৮ মে ২০২২ । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩  

বিশাল বাংলা

৭৩ বছর বয়সেও খেজুরগাছে

তাঁর বয়সী অনেকে ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। আর হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের গাছি মো. আব্দুল্লাহ কোমরে দড়ি বেঁধে তরতর করে উঠে যান খেজুরগাছে। নামেন হাঁড়িভর্তি রস নিয়ে। লিখেছেন শাহ ফখরুজ্জামান

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



৭৩ বছর বয়সেও খেজুরগাছে

আব্দুল্লাহর বয়স এখন ৭৩। সমবয়সী অনেকেই পরপারে চলে গেছেন। যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেকে শয্যাশায়ী। কিন্তু এই বয়সেও আব্দুল্লাহ খেজুরগাছে উঠে গাছকে রসের জন্য তৈরি করেন।

বিজ্ঞাপন

কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে মাটির হাঁড়ি নিয়ে গাছে ওঠেন। কুয়াশামাখা ভোরে রসভর্তি হাঁড়ি নামান গাছ থেকে। কাজটি করছেন ৫২ বছর ধরে। আব্দুল্লাহর বাড়ি চুনারুঘাট উপজেলার নরপতি গ্রামে। ওই এলাকায় খেজুরগাছ অনেক। তাঁর বাড়িতেও ছিল তিনটি। ছোটবেলায় প্রতিবেশী হানিফ উল্লাহর কাছ থেকে শেখেন কিভাবে খেজুরগাছ কেটে রস সংগ্রহ করতে হয়। প্রথমে বাড়ির গাছগুলো কেটেছিলেন। পরে প্রতিবেশীদের। একসময় এটাই তাঁর পেশা হয়ে যায়। খুব সূক্ষভাবে গাছ কাটতে পারেন। এলাকায় আলাদা কদর আছে তাঁর।

 

যেভাবে খেজুরগাছ তৈরি করেন

খেজুরগাছের বয়স ৯ বছর হলেই সেটি রস সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত হয়। একেকটি গাছ থেকে ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত রস আহরণ করা যায়। এ জন্য বিশেষ কায়দায় গাছ কাটতে হয়। কোমরে রশি বেঁধে ছুরি, দড়ি আর থলি নিয়ে গাছে ওঠে পড়েন আব্দুল্লাহ। প্রথমে ছুরির সাহায্যে কাণ্ড থেকে পাঁচটি পাতার ঠিক নিচে গাছের নরম অংশ কাটেন। কাটা অংশ অনেকটা ইংরেজি ‘ভি’ আকৃতির হয়। তা চাঁছার পর রস পড়ার টিন বা বাঁশের নল ব্যবহার করেন। পরে রশি দিয়ে একটি হাঁড়ি বেঁধে দেন। পাঁচ পাতার নিচে যদি রস না আসে, তাহলে আরেকটি ডাল কেটে চার পাতার নিচে যান। সেখানেও রস না এলে তিন পাতার নিচে চেষ্টা করেন। তবে সেখানেও রস না পেলে আর চেষ্টা করা উচিত নয় বলে জানালেন আব্দুল্লাহ। কারণ দুই পাতার নিচে রস আহরণের চেষ্টা করলে গাছ মারা যাবে। অগ্রহায়ণ মাসেই শুরু হয় গাছ তৈরির কাজ। পৌষ থেকে ফাল্গুন মাসের শেষ পর্যন্ত চলে রস আহরণ। বাদুড় ও পাখির হাত থেকে রক্ষার জন্য হাঁড়ির ওপর চটের বস্তা ও বরইগাছের ডাল দিয়ে রস আড়াল করে রাখেন।

 

অনেক গল্প জমা আছে

আব্দুল্লাহ যখন রস সংগ্রহের কাজ শুরু করেন, তখন রসের কেজি ছিল মাত্র চার আনা। বর্তমানে এক কেজি রস বিক্রি হয় ৬০ থেকে ১০০ টাকায়।   বাড়ির কাছে রাস্তার পাশে কয়েক দশক আগে একটি খেজুরগাছ লাগিয়েছিলেন। টানা ৩০ বছর সেই গাছ থেকে রস পেয়েছেন। সম্প্রতি গাছটি মরে গেছে। শায়েস্তাগঞ্জ বাজারের পশ্চিম দিকে আব্দুল কুদ্দুছ নামের এক ব্যক্তির বাড়ির উঠানে তিনি একটি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন। সেই গাছে রাতের বেলা পাঁচ-ছয় কেজি রস নামাতেন। আবার সকালবেলা ১৭-১৮ কেজি রসও পাওয়া যেত। অনেক সময় রস হাঁড়ি উপড়ে পড়ে যেত। এখন রসের চাহিদা বেড়েছে, জোগান কমেছে। বর্তমানে দৈনিক ২৫-৩০ কেজি রস আহরণ করতে পারেন। সূক্ষ কায়দায় খেজুরগাছ কাটতে পারেন বলে শীতের শুরুতে গাছ তৈরির জন্য অনেক জায়গা থেকেই ডাক পড়ে তাঁর। রসের জন্য একেকটি খেজুরগাছ কাটলে ৫০০ টাকা করে পান। শুধু নিজে কাটেননি, অনেককে তিনি এই কাজও শিখিয়েছেন।

 

আমার রসে ভেজাল নেই

আব্দুল্লাহ বললেন, ‘মানুষ আমাকে ভালোবাসে আমার রসে কোনো ভেজাল নেই বলে। ’ এই বয়সে গাছে উঠতে ক্লান্তি লাগে না? এমন প্রশ্নের জবাবে এক গাল হেসে আব্দুল্লাহ বললেন, ‘এই কাজে ভালো ব্যায়াম হয় বলে শরীরও থাকে ভালো। ’



সাতদিনের সেরা