kalerkantho

বুধবার ।  ১৮ মে ২০২২ । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩  

কড়াদের প্রথম ‘তারা’

তাঁর আগে কড়া নৃগোষ্ঠীর কেউ মাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি। আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কথা লাপোল কড়ার। এর মাধ্যমে কড়া নৃগোষ্ঠীর প্রথম কেউ উচ্চশিক্ষার গণ্ডিতে প্রবেশ করবেন। তবে এ পর্যন্ত আসতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার এই তরুণকে। সেই গল্প শুনেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কড়াদের প্রথম ‘তারা’

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

বুঝতে শেখার পর থেকেই দেখতাম, মা-বাবা দুজনেই ভোরে কাজে চলে যাচ্ছেন। ফিরছেন সন্ধ্যায়। কিন্তু সংসারে অভাব ঘুচত না। মাছ-মাংস তো দূরের কথা, তিন বেলা পেটপুরে ভাত খাব সেই অবস্থাও ছিল না।

বিজ্ঞাপন

এমনও দিন গেছে, সকালে কাজে যাওয়ার সময় বাবা বাজারের থলে নিয়ে গেছেন, সন্ধ্যায় সেই খালি থলে নিয়েই ফিরেছেন। কারণ মজুরি পাননি। অনেক দিনই রান্নার চাল থাকত না। সন্ধ্যায় চুলায় পানি বসিয়ে মা বলতেন, ‘ভাত বসাইছি। তোর বাবা এলে খাস। ’ কিন্তু বাবা আসতে আসতে আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। সেইবার দু-তিন দিন ধরে চাল ছিল না। বাবা একজনের কাছ থেকে ২০০ টাকা ধার নিয়ে চাল কিনে আনলেন। পরিশোধের জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিলেন লোকটা। কিন্তু বাবা শোধ করতে পারেননি। সপ্তাহখানেক পরে এক রাতে বাড়ি এলেন লোকটা। মা গরু পালতেন। লোকটা সেই গরু নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন!

 

কাল কী খাব?

তখন নবম শ্রেণিতে পড়তাম। এক দিন হার্ট অ্যাটাকে বাবা মারা গেলেন। তখন থেকে আমাদের কষ্টের সীমা রইল না। আমরা তিন ভাই-বোন। বোনটা ছোট। বড় দাদা শারীরিক প্রতিবন্ধী। মা ছাড়া রোজগারের মতো কেউ নেই। তখন থেকে আমিও নিয়মিত মায়ের সঙ্গে কাজে যেতাম। বোনটাও স্কুলে যায়। সে-ও মায়ের সঙ্গে অনেক সময় মাঠে কাজ করতে যায়, যাতে ভালো কাপড় কিনতে পারে। মাঠে কাজ করতে করতে দেখতাম সহপাঠীরা স্কুলে যাচ্ছে। নিয়মিত স্কুলে যেতে খুব মন চাইত। কিন্তু কাল কী খাব এই চিন্তায় যাওয়া হতো না। বই পড়ে অনেক সময় ঠিকঠাক সব বুঝতামও না। গাইড কেনার মতো টাকা নাই। কারো কাছে গিয়ে যে বুঝে নেব সেই সুযোগও নাই।

 

এটা শুধু আমার গল্প নয়

সব সময় কাজও থাকত না। ফলে তিন বেলা ভাত খাওয়া হতো না। মায়ের সঙ্গে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান খুঁজতে যেতাম কোদাল, খুন্তি আর বস্তা নিয়ে। আমার জন্য মা চাল ভাজা নিয়ে যেতেন। দিনভর ধান কুড়িয়ে সন্ধ্যায় ফিরতাম। আমাদের একটা ঢেঁকি ছিল। কুড়িয়ে আনা ধান ধুয়ে, পরিষ্কার করে ঢেঁকিতে ভানতেন মা। সেই চালে রান্না করা ভাত মজা করে খেতাম। বর্ষায় ডোবায় মাছ ধরতে যেতাম। কোনো কোনো দিন পরিমাণে বেশি কিংবা একটু বড় মাছ পেলে আনন্দের সীমা থাকত না। কিন্তু সেই মাছ আমাদের পাতে উঠত না। কারণ মাছ বিক্রির টাকায় তেল, নুন কেনা হতো। একবার একটা শোল মাছ পেয়েছিলাম দেড় কেজির মতো ওজন। কী যে আনন্দ লেগেছিল সেদিন। কিন্তু মাছটা বিক্রি করে সেই টাকায় চাল কিনেছিলেন মা।    

শুধু আমাদের না, পাড়ার অনেকেরই এ রকম হতো। চাল না থাকলে কালিয়াগঞ্জ জঙ্গলে যেতাম আলু খুঁজতে। মাটির নিচের এই আলু বেশ মোটা, বড়, সুন্দর। খেতেও সুস্বাদু। এটা খেলে ভাতের খিদে দূর হয়ে যেত। আমাদের দুঃসময়ে ভরসা ছিল এই আলু। পাশাপাশি ঝিনুক-শামুকও খেতাম। কিন্তু আমাদের ওই দিকে তেমন বিল নেই বলে খুব বেশি পাওয়া যেত না।

 

সবাই যেন উঠে আসে

তবু চাইতাম সবাই যেন পড়ালেখা করে। ক্লাস সেভেনে থাকতেই বারান্দায় পাড়ার শিশুদের পড়াতাম। পাড়ার একটা ছেলে একবার নাইনে পড়ার সময় সব ছেড়েছুড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল। কয়েক মাস পর বাড়ি ফিরলে তাকে অনেক বুঝিয়েছি। আবার পড়তে রাজি হয়েছে। আমি নিজে গিয়ে তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এসেছি। এখন তৃতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে এমন ১৭টি বাচ্চা আছে পাড়ায়। বাড়িতে থাকলে তাদের পড়াই।

 

আমাকে মাফ করে দেন

হালজায় উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তাম। এসএসসি পরীক্ষার আগে স্কুলে কিছু বড় ভাইয়ের কাছে প্রাইভেট পড়লাম মাস তিনেক। মাস শেষে টাকা চাইলে ভাইয়াদের আলাদা করে ডেকে বলতাম—টাকা তো দিতে পারব না। আমাকে মাফ করে দেন। এরই মধ্যে এসএসসির ফরম ফিলাপের সময় চলে এলো। হাতে টাকা নেই। মজুরি দিয়ে সেই টাকা জোগাড় করেছিলাম। এসবের মধ্যেই এসএসসি পাস করলাম। ভর্তি হলাম বোর্ড হাট কলেজে।

 

হয়তো আর পারব না

মায়ের কষ্ট দেখে চোখের জল বাধ মানত না। কয়েকবার ভেবেছিলাম, লেখাপড়া ছেড়ে স্থায়ীভাবে একটা কাজে যুক্ত হয়ে পরিবারের অভাব দূর করব। কিন্তু মায়ের সঙ্গে আলাপে বুঝলাম, তাতে আমার আর মায়ের স্বপ্ন—দুটোই মাটিতে মিশে যাবে। তাই কষ্ট করে হলেও লেখাপড়া করতে থাকি। কিন্তু দ্বাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর আর পারছিলাম না। ভেবেছিলাম, এইচএসসির পর হয়তো পড়াশোনায় ইতি টানতে হবে।

 

তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে

এইচএসসি পরীক্ষার বেশ কিছুদিন আগে রাজীব নূর (লেখক-সাংবাদিক) স্যারের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর মুখেই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনি। তিনি বললেন, ‘তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। ’ তখনো আসলে বুঝতাম না বিশ্ববিদ্যালয় কী জিনিস। কিন্তু ভয়ে উনাকে আর জিজ্ঞেস করিনি। যাহোক, পরিচয়ের পর থেকে আমার প্রাইভেট, ফরম ফিলাপ—সব খরচই বহন করেছেন তিনি। জিপিএ ৩.৫৮ পেয়ে এইচএসসি পাস করলাম। এই ফাঁকে বলে রাখি, আমার আগে আমাদের সম্প্রদায়ের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ছিলেন কৃষ্ণ কড়া। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে সঙ্গে নিতেন কৃষ্ণ মামা। বলতেন, ‘তোমাকে আমার চেয়ে বেশি পড়তে হবে। ’

 

মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে থাকতাম

এইচএসসি পাসের পর এক দিন রূপম স্যারকে (মোস্তাফিজুর রহমান রূপম) ফোন দিলাম। রাজীব স্যার বলেছিলেন ফোন করতে। রূপম স্যারের কথামতো দিনাজপুর সদরে ভাবনা উন্নয়ন কেন্দ্রে এলাম। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক তিনি। তাঁদের মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটা কক্ষে থাকতাম। রোগীদের জন্য যা রান্না হতো সেটাই খেতাম। হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভাই এসে আমাকে পড়াতেন। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিলাম।

 

অবশেষে ভর্তিযুদ্ধে

চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অপেক্ষমাণ তালিকায় আছি। আগে থেকেই নাট্যকলায় ভর্তির জন্য নিজেকে তৈরি করেছিলাম। এ ক্ষেত্রে বেশ সাহায্য করেছেন মাদল ব্যান্ডের হরেন দা (হরেন সিং)। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাবহারিক পরীক্ষা দিতে গেলাম ৭ জানুয়ারি। আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে আর মাদল নিয়ে গিয়েছিলাম। স্যাররা আমার গান শুনলেন, অভিনয় দেখে হাততালি দিলেন। ফল প্রকাশের পর জানলাম, ব্যাবহারিক পরীক্ষায়

১০০-তে ৯০ পেয়ে ১৫তম হয়েছি।

 

লড়াই শেষ হয়নি

কড়া সম্প্রদায়ের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু খুব করে চাই, আমি যেন শেষ ব্যক্তি না হই।

পাড়ার সব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাদ পাবে—এখন এটাই আমার স্বপ্ন। এ জন্য যা করা লাগে করব।



সাতদিনের সেরা