kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বজলু আবার হাঁটতে পারবেন

মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিকলবন্দি ছিলেন বজলুর রহমান। এখন বন্ধুদের সহায়তায় সেই দশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। সবার আশা, আবার আগের মতো হাঁটতে পারবেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্র। লিখেছেন মোখলেছুর রহমান মনির

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বজলু আবার হাঁটতে পারবেন

নিজের বাড়িতে বজলু ছবি : লেখক

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের টুংরাপাড়া গ্রামে জন্ম বজলুরের। ১৯৮৮-৮৯ সেশনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৯৪ সাল। বজলু তখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। হঠাৎ একদিন প্রলাপ বকতে শুরু করলেন। জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতেন। পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে বেশ কিছুদিন চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরের বছরই ছাত্রাবস্থায় বিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন। এর কয়েক মাস পর বজলুর অবস্থা ফের খারাপ হতে থাকে। একের পর এক ডাক্তার বদলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। এভাবে পাঁচ-ছয় বছর চলার পর বজলুকে ফেলে চলে যান তাঁর স্ত্রী।

 

শিকলবন্দি জীবন

এক পর্যায়ে বজলুর পায়ে শিকল পরায় পরিবার। একটি কক্ষের মেঝেতে পোঁতা রডের সঙ্গে দেড় ফুট লম্বা শিকল বাঁধা হয় তাঁর পায়ে। উলঙ্গ শরীরে কাপড় জড়িয়ে বসে থাকতেন। স্বাভাবিকভাবে শোয়ার সুযোগও ছিল না। ঘরের মধ্যেই মলমূত্র ত্যাগ করতেন। অযত্ন, অবহেলা আর অপুষ্টিতে শরীরে বাসা বেঁধেছিল বিভিন্ন রোগ। কিছু জানতে চাইলে প্রলাপ বকতেন। এক পর্যায়ে পুরোপুরি স্মৃতিভ্রষ্ট হলেন। শিকলবন্দি অবস্থায়ই চলত তাঁর আহার, মলমূত্র ত্যাগ। পরিবারের লোকজন প্রতিদিনই ধুয়েমুছে পরিষ্কার করতেন। এভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েক বছর।

 

হাত বাড়াল বন্ধুরা

২০১৯ সালে বজলুরের শিকলবন্দি জীবন নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি তাঁর সহপাঠীদের নজরে আসে। পরে তাঁর বন্ধুরা বজলুর রহমানকে দেখতে যান। তাঁরা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করান বজলুকে। ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। এ বছরের মার্চে পরিবারের লোকজন তাঁকে বাড়ি নিয়ে যায়। এখন ডাক্তারের পরামর্শে বাড়িতেই চলছে তাঁর চিকিৎসা।

 

একদিন বজলুর বাড়িতে

টিনশেড ঘর। মাদুর বিছানো চৌকির ওপর শার্ট আর ট্রাউজার পরে চাদর গায়ে বসে আছেন বজলুর। তাঁর জন্য ঘরের ভেতরেই বানানো হয়েছে টয়লেট। ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিতেই তিনি সালামের উত্তর দিয়ে তাঁর পাশে বসতে বললেন। এক পর্যায়ে তাঁর ছোট ভাই হারুন অর রশিদ হুইলচেয়ার নিয়ে আসেন। তিনি দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে সেই চেয়ারে গিয়ে বসেন। হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আগে এক বেলা খাবার দিলে সারা দিন কিছু খেতে চাইতেন না। খাবারের থালা ছুড়ে মারতেন। এখন ক্ষুধা লাগলে খাবার চেয়ে নেন। আমরা যা বলি অবুঝ শিশুর মতো তাই করেন। দাঁড়াতে না পারলেও এখন আমার ভাই আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ। এ জন্য ভাইয়ের বন্ধুদের কাছে আমরা ঋণী।’ বজলুলের সহপাঠী বিএডিসির উপপরিচালক মো. নাজিম উদ্দিন শেখ বলেন, ‘বাকৃবিতে বজলু সোহরাওয়ার্দী হলে আর আমি শামছুল হক হলে থাকতাম। লেখাপড়ায় ভালো ছিল। অনর্গল ইংরেজি বলতে পারত।’ আরেক বন্ধু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. শাহ কামাল খান বলেন, ‘সে এখন ঘনিষ্ঠদের চিনতে পারে। টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন হলে বলে। এটা সত্যিই আশাব্যঞ্জক।’ মানসিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হলেও বজলুর এখনো হাঁটতে পারেন না। চিকিৎসকের পরামর্শে পায়ের ব্যায়াম অব্যাহত আছে। অচিরেই তাঁকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হবে বলে জানালেন ড. শাহ কামাল।



সাতদিনের সেরা