kalerkantho

রবিবার । ৯ মাঘ ১৪২৮। ২৩ জানুয়ারি ২০২২। ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

[ শখের তোলা ]

শচীন পন্টিং গেইল ধোনি—সব এক বাসায়

জসীম উদ্দিনের বাসাটাই যেন একটা শোরুম। প্রায় পাঁচ হাজার জার্সি আছে তাঁর সংগ্রহে। দেখতে গিয়েছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শচীন পন্টিং গেইল ধোনি—সব এক বাসায়

খেলোয়াড়দের অটোগ্রাফসহ বাংলাদেশ দলের শততম টেস্ট ম্যাচের জার্সি হাতে জসীম। ছবি : লুত্ফর রহমান

মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে দুই রুমের বাসা। দেয়ালে দেয়ালে হ্যাঙ্গারে ঝোলানো জার্সি। ঘরের আলমারির ভেতরে তো বটেই, আলমারির ওপরে, বিছানার নিচেও ব্যাগভর্তি জার্সি। জসীম জানালেন, ১৯৯৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দলের সব জার্সি আছে তাঁর সংগ্রহে।

বিজ্ঞাপন

আছে অনেক বিদেশি খেলোয়াড়ের জার্সিও। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা পাঁচ হাজারের কম নয়!

আসলে হতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটার। ছোটবেলা থেকেই খেলা দেখতেন টিভিতে। বাড়িতে বন্ধুদের সঙ্গে কাঠের তক্তা দিয়ে ব্যাট বানিয়ে খেলতেন। ১৯৯৬ সালে খবর পেলেন পাকিস্তান দল বাংলাদেশে আসছে খেলতে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে জসীমও ঢাকায় চলে এলেন। ২০ টাকা দিয়ে কালোবাজার থেকে টিকিট কিনে খেলা দেখেছিলেন সেবার। কিছুদিন পরে তিনি নিজেও নাম লেখান সাধারণ বীমা ক্রিকেট ক্লাবে। অনুশীলন করতে গিয়ে আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, খালেদ মাহমুদ সুজনদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সখ্য গড়ে ওঠে আম্পায়ারদের সঙ্গেও। কিন্তু ম্যাচে খেলার জন্য ব্যাট, প্যাড, জুতা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই কিনতে হয় খেলোয়াড়দের। একসময় আর্থিক টানাপড়েনের কারণে ক্রিকেটার হওয়ার লক্ষ্যে ইস্তফা দেন। বললেন, ‘ক্রিকেটার হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। পারিনি। তাই ক্রিকেটের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছি। নিয়মিত মাঠে যেতে যেতে একটা সময় খেলোয়াড়-আম্পায়ারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায়। জার্সি সংগ্রহের শুরু এভাবেই। ’ প্রথম জার্সি পেয়েছিলেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার আকরাম খানের কাছ থেকে। একদিন অনুশীলন শেষে ফেরার পথে আকরাম খানের কাছে জার্সি চেয়ে বসলেন। অটোগ্রাফসহ সেবার জার্সিটা দিয়েছিলেন আকরাম খান। বিদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে তাঁর সংগ্রহ করা প্রথম জার্সি পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরামের। এক আম্পায়ারের মাধ্যমে পেয়েছিলেন সেটা। বললেন, তখন আম্পায়ার ছিলেন আসাদ রউফ। তাঁকে বলেছিলাম, ‘আমি ওয়াসিম আকরামের ফ্যান। তাঁর জার্সি পেলে খুব ভালো হতো। ’ পরদিন সকালে দেখলেন সেই আম্পায়ার জার্সি নিয়ে এসেছেন জসীমের জন্য।

১৯৯৮ সালে উইলস ইন্টারন্যাশনাল কাপ খেলতে ঢাকায় এসেছিল ভারতীয় ক্রিকেট দল। সেবার ইন্টার স্পোর্টসের এক ভাইয়ের মাধ্যমে তখনকার ভারতীয় দলের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির জার্সি সংগ্রহ করেছিলেন। ম্যাচের আগের দিন জসীমকে শেরাটন হোটেলের লবিতে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই ভাই। গাঙ্গুলিকে বললেন, ‘ইওর বিগ ফ্যান। তোমার একটা জার্সি চায়। ’ গাঙ্গুলি বললেন, ‘ম্যাচ কি বাত (ম্যাচের পরে)। ’ ওয়ানডেতে বাংলাদেশ তাদের প্রথম জয় পায় কেনিয়ার বিপক্ষে, ১৯৯৮ সালে। সেই ম্যাচের নান্নু এবং আকরামের জার্সি আছে। স্টিভেন ফ্লেমিং, হানসি ক্রনিয়ে, মুত্তিয়া মুরালিধরন, মাইকেল ক্লার্ক, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, শচীন টেন্ডুলকার, মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি, কেভিন পিটারসেন, ক্রিস গেইল থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত অনেক খেলোয়াড়ের জার্সি আছে তাঁর কাছে। শুধু খেলোয়াড় নয়, রড টাকারের মতো বিখ্যাত আম্পায়ারের জার্সিও আছে।  

বাংলাদেশ দল নিজেদের প্রথম টেস্ট খেলেছিল ২০০০ সালে, ভারতের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে খেলা বাংলাদেশের সব খেলোয়াড়ের অটোগ্রাফসহ একটি জার্সি আছে। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যতগুলো বিশ্বকাপ খেলেছে সবকটির জার্সি আছে। বললেন, ‘মুশফিকুর রহিম কিংবা মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদের মতো অনেক ক্রিকেটারই জানেন আমি জার্সি সংগ্রহ করি। ফলে বিদেশে কোনো ম্যাচ খেলতে গেলে তাঁদের বলে রাখি। তাঁরা আমার জন্য জার্সি নিয়ে আসেন। মুশফিক ভাই এবারের টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপের জার্সিও এনেছেন। ’ শখের বশেই কাজটা করেন। আর্থিক কারণে খেলা দেখতে বিদেশে যাওয়া হয় না। কিন্তু দেশের মাটিতে খেলা হলে গ্যালারিতে গিয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন। মাঠে এত যাতায়াতের কারণে দেশের প্রায় সব খেলোয়াড়ই তাঁকে চেনেন। সেই সূত্রে ক্রিকেটাররা তাঁকে সহায়তাও করেন। বললেন, ‘অলক কাপালি, মুশফিকুর রহিম, জাভেদ ওমর, এনামুল হক জুনিয়র, মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদসহ অনেকেই আমাকে ক্রিকেট স্মারক সংগ্রহে সহায়তা করেছেন। ’

এই বিশাল সংগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণও কষ্টের কাজ। পরিষ্কার রাখা, যত্নআত্তি করার নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। বললেন, ‘প্রথম দিকে বউ এসব কাজে বিরক্ত হতো। এখন সে-ও সাহায্য করে। কিন্তু ঢাকায় এত জিনিস রাখার জায়গা কোথায়? তাই কিছু রেখে এসেছিলেন গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু কপাল মন্দ। সেখানে কিছু জার্সি চুরি হয়ে যায়। এক বস্তা জার্সি ইঁদুরে খেয়ে ফেলে, যেখানে ছিল ওয়াসিম আকরাম, অ্যালিস্টার কুকের জার্সি। ’ বলতে বলতে জল চলে আসে জসীমের চোখে। জার্সি ছাড়াও ২০০-এর মতো ক্রিকেট বল, গ্লাভস, স্টাম্প ও ব্যাট আছে সংগ্রহে। সেগুলো দিয়ে সামনে একটা জাদুঘর করার ইচ্ছা আছে এই সংগ্রাহকের।



সাতদিনের সেরা